Friday, 13 February 2026

হলং



কাল ছিল আমাদের ডুয়ার্স সফরের দ্বিতীয় দিন। এর আগে জলপাইগুড়িতে কোনদিন রাত্রিবাস করিনি। এবারও সে অপূর্ণতাও পূর্ণ হয়ে গেল। কারণ এবার নিউজলপাইগুড়ি থেকে আমাদের যাত্রার ট্রেন খুব সকালে। রাত্রিবাস জরুরী ছিল। স্টেশনের কাছেই হোটেল। ঝকঝকে  হোটেল। ননী কোন অপূর্ণতা রাখে নি। ওই রাত্রে তরুণ যখন চিতল মাছের পেটি খোঁজে, তখন বুঝে নিন, আথিতেয়তা কোন পর্য্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। 

সে সব যাই হোক, ওই সকালে সবাই স্নান সেরে আলুর পরোটা প্যাকেট নিয়ে উঠলুম ট্যুরিস্ট স্পেশাল ভিস্তাডোমে। চারিদিকে কাঁচ ঘেরা ট্রেন। ভিস্তাডোম। ভারী সুন্দর।  ছবি দিয়েছি কয়েকটা দেখবেন। বেশ লাগে এসব ট্রেনে সফর করতে। ট্রেন লাইনের দুপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে। সেই নিশ্চিন্তপুরের অপু, দুর্গারও ভালো লাগতো।  আমরা যারা এই যুগের, কেউ কেউ যারা আজো অপু রয়ে গেছি, তারাও আজো জানালার ধারে বসে এই ডুয়ার্সের নদী পাহাড় অরণ্য আজও অবাক বিস্ময়ে দেখেই চলে। অপুরা চিরকালই পৃথিবীতে রয়ে যায়। একসময় এই ভিস্তাডোম সফর শেষ হল। ট্রেন যেন তাজগী ঘোড়ার সওয়ার করে নিমেষে পৌঁছে দিল, মাদারীহাট স্টেশনে৷ মাদারীহাট, হলংএ ঢোকার সিংহদ্বারই বলা যায়।এবার তিনদনের মৌরসীপাট্টা আমাদের এই হলং ইকো রিসোর্টেই। কটেজ টাইপের বাড়ী। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।  আমাদের গুলতানি মারার আদর্শ জায়গা। তবে আমাদের কটেজের মালিক বিশ্বনাথদা৷ বিশ্বনাথবাবুর পরিচয় যদি এককথায় দিতেই হয়৷ তবে তার পরিচয় প্রেমিক আর বিপ্লবী।  বিপ্লব করতে করতে প্রেম। বিপ্লবের সর্বনাশ। প্রেমের জয়। আর কেই বা না চায় প্রেমের জয়, বলুন? আমিও তাই। আপনিও নিশ্চয় দলছাড়া হতে চাইবেন না৷ 


এক সময়ের নকশাল। সেই স্কুলের দশম ক্লাস থেকেই, গলায় ইন্টারন্যাশনাল, আর রবীন্দ্রনাথের, 'ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, মোদের বাঁধন ততই টুটবে" গলায় নিয়ে মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প। সেসব ছিল একদিন। তবে বিপ্লবের বারুঁদে ভেজাল ছিল। বেশীওপরে উঠতে পারেনি। কমদামি হাওয়াইয়ের মতো পপাতধরণীতলে হতে সময় লাগেনি মোটেই। আর প্রেমও তো ছিল অনেক। মঞ্জু,ডলি, মলি, জ্যোতিকণার দল। সবাই কিন্তু রুপসী কন্যা। প্রেমটা একতরফাই ছিল৷ মুখফুটে বলা হয়নিকো আর৷ বিপ্লব, প্রেম সবই শেষ।  এবার ফিরে আসুন জলদাপাড়ায়। শিং বেঁকানো গন্ডারের আড্ডায়৷ এখানে প্রেমের প্রবেশ নিষেধ।  বেশী ট্যাঁফোঁ করলে, গণ্ডারের গুতোয় এফোঁড ওফোঁড় হয়ে যাবার শঙ্কা৷ 

আপাতত প্রেমে ইতি দিয়ে চলুন, জঙ্গলে যাই। বন্যেরা বনে সুন্দরের খোঁজে। 


হলং রিসার্ভ ফরেস্ট৷ ১৮ জনের দল৷ মহিলাও বেশ কয়েকজন আছেন। ক্যাচোর ম্যাচর চলছেই সারাক্ষণ।  এদের নিয়েই জঙ্গলে।  হলংএ ননীর সাথে আগেও এসেছি। সেবার কপালে এক ভারী গরীব ধরণের গণ্ডার ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। তবে এবার ননীর কপাল একেবারে তুঙ্গে বৃহস্পতি।  জন্তু জানোয়ার আর পাখী, ময়ুরের মেলা। একটা দুটো নয়৷ দলে দলে আর পালে পালে৷ আর ময়ুরেরা  তো সারাক্ষণ পেখম মেলে আমাদের মনোরঞ্জন করেই চলল। বিশালাকায় হাতীর দল, ষণ্ডামার্কা সব শিং বেঁকানো শম্বরের দল, দৈতাকায় সব বাইসন বা গৌড়, যাই বলুন। দারুণ জমজমাট এক জাঙ্গল সাফারি হলো। 


কিন্তু আসল আড্ডা তো হবে ভর সন্ধ্যে বেলায়। হাম তুম আর ব্যাগপাইপার। ও কিছু নয়। একটু ক্যাটালিটিক এজেন্ট মাত্র৷ দু এক পেগ পেটে পড়লেই সব এক একজন আঁতেল মার্কা হয়ে ওঠেন। আর এই আড্ডাটার জন্যেই আমরা বারবার ফিরে আসি ননীগোপালের দলে। দুতিনঘন্টা নিমেষে কেটে যায়। ফরাসী বিপ্লব, নাজিম হিকমত, চে গুয়েভারা, সত্যজিত, সুনীল শক্তি আরো সব নামী অনামী হস্তীদের চুলচেরা বিশ্লেষণে৷ দারুণ জমজমাট আড্ডা। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললেও আড্ডা থামতে চায় না৷ দুপেগ তিনপেগের পড়ে আবার শুরু হয় অনুরোধের আসর। অনারের খেলা তখন৷ এ খেলা ননীর তৈরি আমরা তখন একে অন্যকে সম্মান জানায়,  খাদা দিয়ে নয় পেগ দিয়ে। এ খেলাও একসময়ে থেমে যায়। খালাসীটোলার আলোও  নিভে যায়। 

"তখন থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন। "

অথবা

।" ভ্রুপল্লবে যদি ডাক দিয়ে থাক, 

চন্দনবনে দেখা হতে পারে।"

আপনারাও আসুন। 

আজ আমরা বনে নয়, সবাই মিলে যাব চন্দনের বনে।

Monday, 2 February 2026

কোপাই

 শান্তিনিকেতনে এসে কোপাইয়ের সাথে দেখা না করে চলে যাব, এমনটি হয় নাকি? কোপাই পুর্বজন্মের প্রেমিকার মতো। বর্তমানের গভীরে এ যেন চিরন্তন।  


শীতের কোপাই শীর্ণা কিন্তু আলো ঝলমলে রুপসী।  উচ্ছল হয়তো নয়, কিন্তু শান্ত, গভীর। এতে অবগাহনে জন্মজন্মান্তর যেন পেরিয়ে আসা যায়। আজ এসেছি সেই কোপাইয়ের কাছে। কোপাইয়ের গভীরে হাত ছোঁয়ালাম, সারা শরীরমন জুড়ে যেন উৎসবমুখর হয়ে এলো। ঠিক চিনেছে আমাকে। 

 "জনম জনম হাম রুপ নিহারুলু, নয়ন না তিরপিত ভেল।"

Sunday, 1 February 2026





















আজ বিষ্ণুপুর যাবার পথে বনলতা রিসোর্টে দুপুরের খাওয়া সারলুম।বনলতা রিসোর্ট একটা অসাধারণ ছুটি কাটাবার জায়গা। চমৎকার কটেজ, রুম,  হাতী, ঘোড়া, পুকুরের মাছ, গাইয়ের দুধ কি নেই? মাছ ধরার ব্যবস্থা,  সব সব ব্যবস্থাই আছে। এদের রিসোর্টে  বারও আছে। দেখে তো আমি চমৎকৃত।  ননীকে অনেকবার বলেছিলাম। বন্ধুসঙ্গে গুষ্টিসুখে দিন কাটাবার এক উৎকৃষ্ট জায়গা। গা করেনি। ওর যত ঝোঁক উত্তরেই। কপালগুণে, আজ দেখা হয়ে গেল।খানাও হলো। দারুণ একখানা লাঞ্চ। তবে বারে পা গলানো আজ বারণ। কারণ আজ আমার অকারন এর দিন। এক হোলিপ্লেসে আছি। সেখানে মদ্যপান?  নৈব্য নৈব্য চ।


তাহলে শুনুন আজ কি কি খেলুম। খাবো খাবো করি। কিন্তু খাবারের গপ্প শুনেই দিলখুস হয়ে যায়। দুইয়ের বদলে তিনপদ হয়ে গেলেই আর ভেতরে যেতে চায়না। তবে আজ সব খেয়েছি। এদের একটা বেসিক থালি আছে। তার মূল্য মাত্র ১০০/। যাচাই অর্থাৎ আপনি যতবার রিফিলিং চাইবেন করে যাবে। কথাটি কইবে না। আজ ছিল উচ্ছে ভাজা, দুধসুক্তো (অসাধারণ),  আলুপোস্ত লা জবাব জাস্ট আমি যেমনটি চাই, সোনা মুগের ডাল, পরমান্ন, আর চাটনি টমেটোর। এর সাথে আমরা নিয়েছিলাম কাতলা কালিয়া। ব্যস। এতেই আই ঢাই অবস্থা। এরপর জয়পুরের জঙ্গল পেরিয়ে বিষ্ণুপুর।  এর আগে বিষ্ণুপুর বহুবার এসেছি। তখন আসতাম বিষ্ণুপুর সিল্ক আর তসর নিতে। ব্যাওসার কাজে। আমার না তেনার। সে যাই হোক, মন্দির তখনও দেখেছি, আজও দেখলাম। মন্দিরগুলো সংরক্ষণ খুব উঁচুদরের। মন্দিরের ছবি দিলাম অনেকগুলো।সবার নাম মনে নেই। যে কটা পারলাম, নাম দিয়ে দিলাম। 

আর কি আবার ফিরে সেই জয়রামবাটি তেই।  ফেরার পথে সেই বনলতার একফুটি ল্যাংচা আর পাটিসাপটা, সেও একফুটের কম নয়। খেতে পারিনি।  নিয়ে এসেছি।

আজ আপাতত এই। শেষে ভেবে দেখলাম এই তীর্থদর্শন সফল করার ফল তবে কি? শুধুই ভোগের বর্ণনা? কভি নেহি? রঙ দে মোহে গেরুয়া। তাই একটা গেরুয়া টুপি কিনে নিয়ে পরলাম। কিন্তু বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।  কুন্তলার প্রবল আপত্তিতে আর পাবলিক প্যাঁকের ভয়ে মাঝামাঝি একটা না গেরুয়া না হলদে এক টুপিতে কম্প্রোমাইজ করলাম। সেই যে ঠাকুরের কি একটা গান আছে না, 

"ঘরে যারা যাবার , তারা কখন গেছে ঘরপানে,

পারে যারা যাবার গেছে পারে,

ঘরেও নহে, পারেও নহে যে জন আছে মাঝখানে,

সন্ধ্যেবেলা কে ডেকে নেয় তারে।"

আমি সেই মাঝের জন। আমার ঠাকুর সেই রবি ঠাকুরই।