এই কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, বেশ কিছু বন্ধুবৃত্ত আছে আমার। ছোট ছোট সার্কেলে, চার/পাঁচজনের। এদের নিয়েই আমার চারইয়ারী বন্ধুর দল। সবমিলিয়ে সংখ্যায় নেহাৎ কম নয়। তাদের সাথে পানভোজন তো হয়ই। সেটা কার না জানা। সবাই যে পানাসক্ত, এমনটিও নয়। তবে পান এইসব আড্ডার অনুপান মাত্র। যেমন কালোয়াতি গানের সাথে তবলার সঙ্গত। ঠিক তাই। এসব আড্ডায় বেশ উচ্চাঙ্গের আলোচনা হয় তার মধ্যে কেউ যদি গ্লাসে দুএকচুমুক দেয়, তাতে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়?
গৌতম আমার পাড়ার বন্ধুবৃত্তের তেমনই এক বন্ধু। টাইমস আর স্টেটসম্যানে বহুদিন সাংবাদিকতা করেছে। অবসরপরবর্তী জীবনেও এমিটিতে পড়িয়েছে বছর দশেক। বেশ পড়াশোনা আছে। ওর সাথে আড্ডা জমাতে গেলে, নিজেরও কিছু রেস্ত থাকা চাই, না হলে আড্ডার সুখ কোথায়? নেহাৎ কপালগুণে, গ্রীক সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটা বই ভাষানুবাদের কাজ করেছিলাম। তাই আলোচনা হয়েছিল বেশ ভালো।
সেদিন পার্কে আমি আর গৌতমই ছিলাম, আর বিশেষ কেউ আসেনি। কথা শুরু হলো, গ্রীক সভ্যতা আর সংস্কৃতি নিয়ে। ভাগ্যিস চেনা সাব্জেক্ট, তাই আড্ডা জমে উঠলো। ইতিহাস তো আমার বিষয় নয়, যা কিছু টুকটাক পড়াশোনা, তাও ফিজিক্স নিয়ে।
তবে ইতিহাস আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে। মায়া সভ্যতা, ইজিপ্টের ইতিহাস আর প্রাচীন গ্রীস। তাদের সভ্যতা, শৌর্য,, সাহিত্য, নাটক, রাজনীতি। কি ফ্যাসসিনিটং যে লাগে। গ্রীসে তো পাহাড়, পর্বত অনেক, যাতাযত খুব সহজ নয়। তাই গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট সিটি স্টেটস। পাহাড়ে ঘেরা এক একটা সভ্যতা, জ্ঞানচর্চার তীর্থভূমি। এথেন্স, স্পার্টা, থিবস এক একটা তীর্থক্ষেত্র বিশেষ।
সক্রেটিস ছিলেন এথেন্সের এক প্রাজ্ঞ জ্ঞানী পুরুষ। তিনি প্রাচীন এথেন্সের বাজারে ( আগোরা), জিমন্যাসিয়ামে আড্ডা মেরে সময় কাটাতেন। তাকে ঘিরে থাকতো ছেলে, ছোকড়া আর জিজ্ঞাসু মানুষের দল। তিনি দর্শন নিয়ে তার অনুগামীদের দলের সাথে আলোচনা করতেন। তাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলতেন। সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন প্রকৃত সুখ আসে সৎ গুণের বিকাশ এবং আত্মউন্নতির প্রকৃত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তিনি প্রায়শই প্রশ্ন তুলতেন এথেনীয় সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি এবং মূল্যবোধ নিয়ে। তার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুবসমাজকে কলুষিত করার অভিযোগ আনে শাসক সমাজ। তার বিচার চলে দীর্ঘদিন। তার পক্ষে বিপক্ষে নানা সওয়াল হয়। তাকে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় অথবা এথেন্স থেকে নির্বাসন নচেৎ হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ। তিনি হেলমককে বেছে নেন। তার মৃত্যুতে এথেন্সের এক বিরাট যুগের অবসান হয়।
সক্রেটিস নিজে কিছু লিখে যাননি, পরবর্তী কালে তার শিষ্য প্লেটো, তার শিক্ষা, দর্শন নিয়ে লিখে গেছেন।
প্রাচীন গ্রীস ইতিহাস চর্চারও পথিকৃৎ। ইতিহাস চর্চার শুরু হয় হেরোডোটাস ও থুসিডিসিসের মাধ্যমে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ বছর আগে। থুসিডিসিস মনে করতেন ইতিহাসকে হতে হবে নিরপেক্ষ,যুক্তিনিষ্ঠ ও নীতিনিরপেক্ষ।
প্রাচীন গ্রীসের নাটকচর্চা এক অসাধারণ উচ্চতায় উঠেছিল। কমেডি ও ট্রাজেডি। কমেডিতে ছিল হাসির আড়ালে এক গভীর বার্তা সারা সমাজের প্রতি। এরিস্টোফেনিস ছিলেন গ্রীক কমেডির সম্রাট। তার এক বিখ্যাত নাটক, Lysistrata. এই নাটকে গ্রীক নারীরা সিদ্ধান্ত নেয়, যতক্ষন না পুরুষরা যুদ্ধ বন্ধ করছে, তারা যৌনসম্পর্ক করবে না।
ব্যঙ্গ: যুদ্ধপ্রীতি বনাম মুক্তিবোধ।
আর একটি নাটকে তিনি সক্রেটিসকে ব্যঙ্গ করে, দর্শন ও শিক্ষার কৃত্তিমতাকেও প্রশ্ন করেন।
প্রাচীন গ্রীসের ট্রাজেডি ছিল নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম।
গৌতমের সাথে আড্ডা আপাতত এখানেই শেষ। পরেরদিন নিশ্চয় আরো হবে। গ্রীস সম্মন্ধে যে এখনো অনেক কিছুই বলা বাকী রইল।