আমার ছোটবেলা
জীবনের যে পর্যায়ে পড়ে আছি, সেটা শুধুই স্মৃতি রোমন্থনের সময়। এখন অবশ্য আগের মতো নয়। এই সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমার মতো যাদের বয়স বেড়ে গেছে, তারাও যথেষ্ট স্মার্ট আর সক্রিয়ও। ঘোরাফেরা, বন্ধুবান্ধবী কোন ব্যাপারেই তারা আগেকার দিনের বুড়োদের মতন আনস্মার্ট নয়। তবুও আসে একটা সময়, যখন ফেলে আসা দিনগুলো কড়া নেড়ে নেড়ে জানান দিয়ে যায়। আমরাও ছিলাম তোমার জীবনের শুরুর দিনগুলোতে।
আসলে আমি মানুষ হিসেবে খুব সেনসুয়াল। তাই পুরনো দিনের যাপন আজও আমার মনে নাড়া দিয়ে যায়।
আমার শহর,আমার মা, আমার বাবা, আমার ভাই-বোনেরা, বন্ধুরা। ফেলে আসা ছোটবেলার বন্ধুদের কথা স্পষ্ট মনের পর্দাই ভেসে ওঠে। একেবারেই জীবন্ত যেন কালকের দেখা ঘটনা। হাত বাড়ালেই যেন ছোঁওয়া যাবে।কিন্তু তা তো নয় তাদের অনেকেই যে আজ অজানালোকের বাসিন্দা। হাজারো ডাক, হাজারো হাহাকারেও তারা স্তব্দ হয়েই থাকবে। দেয়ালে টাঙানো ছবির মতই।
আমার শহরের নাম অনেকেই জানেন মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জ।জঙ্গিপুর মহকুমার সদরশহর। আমার স্মৃতিতে একটা ছোট্ট সুন্দর সাজানো শহর। কোর্ট কাছারী,স্কুল কলেজ,অফিসপত্র সবই ভাগীরথির এইপারে অর্থাৎ রঘুনাথগঞ্জে আর ওপারে জঙ্গীপুর শহর। ধারে ভারে জঙ্গিপুর কিন্তু এইপারের রঘুনাথগঞ্জের তুলনায় অনেক ছোট আর গুরুত্বহীন। তবে জঙ্গিপুর কলেজ কিন্তু জঙ্গিপুরেই। আমার দাদা,দিদিরা সবাই এই কলেজেই পড়ত। তখন পারাপারের একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। সদরঘাটের খেয়া পার হয়ে যেত হত ওপারের জঙ্গীপুর কলেজে।
এইখানেই আমার জন্ম কোন এক বৈশাখের পঁচিশে।তারিখটা নিশ্চয় চেনা চেনা লাগছে।সত্যি বলতে জীবনে এই একটাই আমার প্রাপ্তি। পঁচিশের দড়ি ধরে ঝুলে পড়া। তাই তো সারাজীবন একটা পদ্যও না লিখে কেমন কবিগুরুর সঙ্গে ঝুলে রয়েছি।তবে কবিতা যে একেবারের লিখিনি তা তো নয়। প্রথম যখন একটা সুন্দরী কিশোরী মনের মধ্যে তোলপাড় তুলতো তখন লিখেই ফেলেছিলাম, ' মঞ্জু তোমাকেই'। নেহাৎ মন্দ হয়নি। সেই কবিতা আর কবিতার মঞ্জু আজও রয়ে গেছে ষোড়শী রুপে আমার মনের গভীরে। সে অবশ্য একটু বড়কাল মানে সদ্য গোঁফ ওঠা বয়সের কথা। এ বয়সে ছেলেরা একটু এঁচোড়ে পাকা হয়। আমিও বাদ যাইনি। তো এসব কথা পরে আসবেখন। এখন শুনুন আমার ছোটবেলার ছোট কথা আর ছোট্ট শহর রঘুনাথগঞ্জের কথা।আমাদের শহর ছিল বড় সুন্দর। ছোট্ট কিন্তু ঝকঝকে তকতকে। এখনকার মত এত আবর্জনার রমরমা তখন দেখিনি। ময়লা না ছিল বাইরে না সেইসময়ের মানুষের মনের মধ্যে। আজ যখন সেইসময়ের মানুষদের কথা ভাবি, তাদেরকে মনে হয় সব রুপকথার চরিত্র। এখনকার মানুষদের মত এত বিবর্ণ বা স্বার্থপর নয়।
এত সব ভাবতে ভাবতে বিষয় থেকে কখন গেছি সরে। যা বলছিলাম রঘুনাথগঞ্জ ভারী সুন্দর শহর। ভাগীরথি নদী বয়ে গেছে এর পাশ দিয়ে।এখানে আরো একটা ছোট নদী আছে, খড়খড়ী তার নাম। সে নদীতেও অনেক মাছ। ছোট্ট নদী কিন্তু বড় সুন্দর।
আসল নদী কিন্তু ভাগীরথী। ফরাক্কা থেকে ধুলিয়ান, নিমতিতা হয়ে মিশে গেছে সাগরে। তার একপাশে রঘুনাথগঞ্জ আর অন্যপারে জঙ্গীপুর।A tale of two cities এর মত ব্যাপার। একে অন্যের পরিপূরক।ভারী মৃদুছন্দে বয়ে চলা জীবন। কোন ব্যস্ততা নেই। সবাই সবাইকে চেনে।তারা হয় কাকা,জ্যাঠা, দাদা, দিদি এইরকম আর কি। সবাই সবাইয়ের সাথে আত্মীয়তার সুরে বাধা। আমার তো অনেকটা Malgudi Days মতই মনে হয়। আসলে আমাদের সবারই মালগুড়ী ডেস কোথাও না কোথাও আছে। সবার হয়ত মনে থাকে না। আমার থেকে গেছে। কারণ আমি তো বড় হয়নি,সত্যিই হয়নি। ছোটই থেকে গেছি।
আমাদের ছোট্ট শহরে কয়েকটা মাত্র পাড়া ছিল, খুব কাছাকাছি,ঘেষাঘেষি করে, গুষ্ঠিসুখের ওম নিত সবাই। এবার শুনুন আমাদের পাড়াগুলোর নাম। আমাদের বাড়ী এখনও আছে ফাঁসীতলায়,(শুনে ভয় পাবেন না, আমরা অতি সজ্জন লোক, কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো আমাদের কম্ম নয়, সেসব হয়েছিল বৃটিশ আমলে,গোরা সাহেবরা কাকে ফাঁসি দিয়েছিল, সেইথেকেই এই নাম),পাঁকুড়তলা,সেখানে এখনো একটা পাঁকুড় গাছ আছে বা রয়েই গিয়েছে সেই স্বাধীনতার আগে থেকেই,বাজারপাড়া, দরবেশ পাড়া, ফুলতলা, সদরঘাট,ম্যাকেঞ্জী পার্ক,বালিঘাটা আরো কিছু। শরৎ পন্ডিত মশাইকে মনে আছে নিশ্চয়, আরে দাদাঠাকুর।যার পন্ডিত প্রেস আজও আছে, আর সেখান থেকে ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ আজও বেরোয়।শরৎ পন্ডিতের জীবন নিয়ে দাদাঠাকুর সিনেমা হয়েছিল। ছবি বিশ্বাস করেছিলেন। তো দাদাঠাকুর ছিলেন আমার দুই বন্ধু রবি আর অনুত্তমের দাদু। আমি তো প্রায়ই তার বিছানার পাশে বসে তার সঙ্গে গল্প করতাম। উনি যে এত নামকরা লোক তখন কি আর জানতাম, তবে তিনি নজরুলের কথা, সুভাষের কথা, পুরনো দিনের অনেক কথা বলতেন। তারা সব সেইসময়ের ইয়া ইয়া লোক। দাদাঠাকুরের অবারিত সমাদর ছিল, এদের আড্ডায়।
দাদাঠাকুরের বাড়ীর কেউই কিন্ত জুতো বা চটী পরতেন না। খালি পায়ে হাঁটতেন সেই সময়ে। রবি আর অনুত্তমকেও দেখেছি খালি পায়ে স্কুলে আসতে। জানিনা, আজ নিশ্চয় সেই রেওয়াজ আর চালু নেই।
জঙ্গিপুরের আর একজনকে আপনারা চিনবেন। বিখ্যাত ধনী হরিশ পোদ্দার। অবশ্য অনেকেই তার নাম শুনে থাকবেন যদি সত্যজিত রায়ের ''সোনার কেল্লা' দেখে থাকেন। তাতে ফেলুদার মুখে একটা সংলাপ আছে “এ তো আর জঙ্গীপুরের হরিশ পোদ্দার নয়, যে কথায় কথায় লাখ দু'লাখ ফেলে দেবে“
মুশকিল হল, রঘুনাথগঞ্জে অন্তত আমাদের কালে, সবাই সবাইকে চিনতেন, তাই কিছুটা ভয়ও কাজ করতো। কোনও বদমায়েশি করে নজর এড়িয়ে যাওয়া খুব মুশকিল ছিল।
মনে আছে, একবার আমার ছোটবেলায় টিউশন ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলী সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। তখনকার দিনের খুব সাড়া জাগানো সিনেমা। সায়রা বানুর প্রথম ছবি। শাম্মী কাপুর নায়ক। ভয়ে ভয়ে বেড়িয়েছি হল থেকে। কেউ যদি দেখে ফেলে, কপালে কষ্ট আছে।
ছোটকাকার কাছে ঠিকই ধরা পরে গেলাম।অবশ্য তাতে ক্ষতি বিশেষ হয় নি। আমার ছোটকাকা আমাকে রিক্সা করে ছায়াবাণী সিনেমা হল থেকে নিয়ে গিয়েছিল।বাবার কানে তোলে নি, তুললে চড়চাপাটি পরত নির্ঘাত।
এ কথায় সেকথায় বড় দিকভ্রান্ত হয়ে পরছি। গুছিয়ে বলা হচ্ছে না কিছুই। তাই এবার শুরুর শুরু করি। তবে শুরুতে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমি বোধহয় আমার ছোট বয়সে একটু সুদর্শনই ছিলাম।আমার বয়স তখন মাত্র ৮। আমার পাড়ার এক কাকার ইচ্ছে ছিল বড় হলে তার মেয়ে পাঞ্চালীর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার। শুনে সেই বয়সেই কী আনন্দই না হয়েছিল। তাই শুনে ডগমগ হয়ে বাড়ীতে ফিরেই পাউডার মেখে আমার সেই অপরুপ মুখ আয়নায় দেখে নিজেই চমৎকৃত হয়েছিলাম। ছবি আঁকতে জানলে সে ছবি আপনাদের দেখাতে পারতুম। তবে সে ছবি আমার মনের মণিকোঠায় জমা আছে আজও। আর কিশোরী পাঞ্চালীরও।
তারপর জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার। পাঞ্চালীর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কী জানি কোন অর্জুন তাকে জয় করে নিয়ে গেছে।






















