Wednesday, 30 September 2026

সক্রেটিস

 ইচ্ছে ভ্রমণ


রবি ঠাকুর কবেই লিখে গেছেন:


আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে,

দৈবে হতেম দশম রত্ন, নবরত্নের কালে,

একটি শ্লোকে স্তুতি গেয়ে, রাজার কাছে নিতেম চেয়ে,

উজ্জয়িনীর বিজন প্রান্তে কানন ঘেরা বাড়ী,

রেবার তটে চাঁপার তলে, সভা বসত সন্ধ্যা হলে,

খেলার ছলে আপন মনে, দিতাম কন্ঠ ছাড়ি।


জীবনতরী বয়ে যেত, মন্দাক্রান্তা তালে, 

আমি যদি জন্ম নিতেম কালিদাসের কালে।


উজ্জয়িনী আমারও খুব প্রিয় জায়গা। শিপ্রা নদীতীরে বসে,  শকুন্তলা না হোক, লিখতে তো পারতাম,

' যাও পাখী বলো তারে, সে যেন ডাকে না মোরে।'


তবে আজকে আমার পছন্দের তালিকায় উজ্জয়িনী নয়,  প্রাচীন গ্রীস। সময়ের দুরত্বে, পথের দুরত্বে সে যে উজ্জয়িনীর থেকেও যোজন যোজন দূর।


আজকে আমার গন্তব্য প্রাচীন গ্রীসের পাহাড় ঘেরা শহর এথেন্স। রোমান সভ্যতায় এথেন্স আর স্পার্টার গুরুত্ব অপরিসীম।  কিন্তু আজ আমি বেছে নেব এথেন্সকেই। কারণ এখানেই আমার শিক্ষক, সে সময়ের শ্রেষ্ট শিক্ষক, সক্রেটিসের বাস। আমি তারই শিষ্য। কে আমি? আমি ক্রিটো।  সক্রেটিসের ঘনিষ্ঠ বন্ধুই বলতে পার। আর সেই সময়কাল কিন্তু আজ নয়, খ্রীষ্টপূর্ব পুর্ব প্রায় পাঁচশ বছর আগে। ধরাই যায় প্রায় তিনহাজার বছর আগে। সেদিনের সেই ক্রিটো, এই আজকের আমি।  কত তফাৎ না।ম? সেদিনের সেই ক্রিটো, সক্রেটিসের ছায়াসঙ্গী, এই আজকের আমি। যার একমাত্র কাজ, ফেসবুকে শুধু চুটকী লেখা। কি অধ:পতন। 

কিন্তু ক্রিটো কে ছিলেন?  সেইযুগে ক্রিটো ছিলেন, সক্রেটিসের এক ধনী বন্ধু যিনি তাকে ছায়ার মতো অনুসরণ করতেন। সক্রেটিসের শিষ্য মহাজ্ঞানী প্লেটো একটা বই লিখেছিলেন আমারই নামে, সে বইয়ের নাম 'ক্রিটো'।  তাতে সক্রেটিসের সাথে ক্রিটোর সংলাপের বিবরণী আছে। ক্রিটো সক্রেটিসের জেলখানা থেকে মুক্তির ব্যবস্থা সক্রেটিসের জীবনের শেষ মূহুর্ত পর্যন্ত করে গেছেন, প্রহরীদের উৎকোচ দিয়ে তিনি, সক্রেটিসের মুক্তির ব্যবস্থা পাকা করে ফেলেছিলেন। কিন্তু সক্রেটিস সেই প্রস্তাব প্রত্যাখান করেন, তার কাছে শ্রেয় মনে হয়, হেমলক পান করা।

এবার বরং শোনা যাক খুবই সংক্ষেপে সেই মহান শিক্ষকের একদিনের জীবন কাহিনী। 


তাহলে শুনুন একদিনের কথা।  মানে আমি ক্রিটো,  দাঁড়িয়ে আছি, সক্রেটিসের বাড়ীর সামনে। তখনও ভোর হয়নি।আধো অন্ধকারে তখনও এথেন্স ঢাকা। সক্রেটিস বেড়িয়ে এলেন বাড়ী থেকে, খালি গায়ে, গায়ে শুধু একটা মোটা চাদর। আমায় দেখে হেসে বললেন, ক্রিটো তুমি এত ভোরে এসে গেছ? তোমার কি ভয় হয়, আমি পালিয়ে যাব? "

আমি হেসে বললাম ' না গুরুদেব, আমি এসেছি শুধু প্রাত:ভ্রমণের জন্যে" 

আস্তে আস্তে সুর্যের আলো ছড়িয়ে পড়ল। আমরা এগিয়ে চললাম, আগোরার দিকে। আগোরা কি জানেন তো? আজকের যাকে আমরা বলি মার্কেট প্লেস, তাই সেকালের আগোরা। সেখানে যে শুধু বেচাকেনা হতো তাই নয় কিন্তু ব্যায়ামাগারও ছিল। গ্রীক ভাস্কর্যে ম্যাসকুলাইন বডি শুধু স্মরণ করুন। তাহলেই বুঝতে পারবেন, সে যুগে আজকের জিমন্যাসিয়ামের কতটা কদর ছিল।

আগোরায় বহু লোকের সমাবেশ হতো। সারা এথেন্সের লোক জড়ো হতো সেখানে। এথেন্সের কেন্দ্রস্থলে ছিলো সেই আগোরা। দার্শনিক, ফলবিক্রেতা থেকে বিভিন্ন পেশার লোক জড়ো হতো সেখানে। সক্রটিসকে ঘিরে ভিড় জমে উঠতো। বিশেষ করে তরুণরা তাকে বেশ পছন্দ করতো। সক্রেটিস শুধু প্রশ্ন করে যেতেন, উত্তর দিতেন না। বলতেন নিজে প্রশ্ন করো, নিজেই এর উত্তর খুঁজে পাবে।


তিনি এক তরুণকে প্রশ্ন করলেন, "বলো তো ন্যায় কি?" তরুণ উত্তর দিলেন, 'আইন মেনে চলাই ন্যায়।'

সক্রেটিসের পালটা প্রশ্ন, " যদি আইন অন্যায় হয়,যদি আইন কেবল সুবিধা দেয় ক্ষমতাবানদের? ' 

সক্রেটিসকে ঘিরে ভিড় জমে যায়, কিন্তু তিনি কারও সাথে ঝগড়া করেন না। কিন্তু তার প্রশ্নগুলো দাবানালের মতো ছড়িয়ে যায়।


একদিন আমরা গেলাম প্লেটোর বাড়ী, তার প্রিয় শিষ্য। প্লেটো তরুণ,  দীপ্তমান চেহারা। প্লেটো ধনাড্য ঘরের ছেলে। তার বাড়ীতেই আমাদের আজকের আহার। সক্রেটিস তাকে জিজ্ঞেস করলেন, জ্ঞান কি? প্লেটোর উত্তর। যা গুরু শেখান। সক্রেটিস মাথা নাড়লেন। না, গুরু উত্তর দেন না, প্রশ্ন করেন। জ্ঞান তোমার ভেতরেই আছে।

সেদিন আমি দেখলাম প্লেটোর চোখে আগুন জ্বলে উঠেছে। সেদিন আমার মনে হয়েছিল, এই তরুণই একদিন সক্রেটিসের উত্তরাধিকারী হবে।

সক্রেটিসের বাড়ীতে সেদিনের আহারে ছিল,  রুটি, জলপাই,  ছাগলের দুধের পনীর আর সুরা। সক্রেটিস সামান্যই খেতেন। আহারের ফাঁকে আলোচনা উঠল। সুখ কি? কেউ বলল ধন, কেউ খ্যাতি। সক্রেটিস বললেন, সুখ হলো আত্মাকে চেনা, অজ্ঞতাকে চেনতে শেখা।

এক বিকেলে আলবিডাসিয়াসিও সঙ্গে এলো। তরুণ, ভীষণ সুদর্শন আর আত্মগর্বী।

সক্রেটিস তাকে প্রশ্ন করলেন, ' নেতৃত্ব কি? সে বলল, মানুষকে নিয়ন্ত্রণ করা।

সক্রেটিস বললেন, "তুমি যা বললে  তা ভূল। নেতৃত্ব হলো মানুষকে সত্য দেখানো। তুমি কি তা পারো?"


সক্রেটিসের বিচার

খ্রীষ্টপূর্ব ৩৯৯:

পেলোপনশীয় যুদ্ধে এথেন্স পরাজিত। এথেন্স সন্দেহ আর ক্ষোভে জর্জরিত। সক্রেটিসের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলো, তিনি দেবতাদের অস্বীকার করেন। যুবকদের বিভ্রান্ত করেন। সক্রেটিস জবাবে বললেন,আমি কিছুই জানিনা। শুধু জানি আমি অজ্ঞ। এ জ্ঞানের জন্যে যদি আমাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়, তবে এথেন্স আমাকে নয়, নিজেকেই হত্যা করবে।

বিচারের রায় হলো, তাকে হেমলক পান করে মৃত্যুবরণ করতে হবে। আর একটা বিকল্প প্রস্তাবও ছিল। তাকে এথেন্স থেকে নির্বাসিত করে দ্বীপান্তরে পাঠান হবে। কিন্তু তিনি তার প্রিয় এথেন্স ছেড়ে যেতে চাননি।


আমি ক্লিটো, প্রতিদিন জেলখানায় যেতাম। এক রাতে তাকে বললাম। " গুরুদেব, পাহারাদারকে উৎকোচ দিয়ে, আপনার পালিয়ে যাবার ব্যবস্থা হয়েছে। আপনি বেড়িয়ে আসুন। থিসোলিতে আপনার নিরাপদে থাকার ব্যবস্থা হয়েছে।"


তিনি হাসলেন, বললেন, " ক্রিটো আমি যদি পালাই, তবে আমি আইন ভাঙব,অন্যায় সহ্য করা শ্রেয়, অন্যায় করা নয়।" 

আমার দুচোখ জলে ভরে গেল।


শেষের কদিন, আমরা তার শিষ্যরা, তাকে ঘিরে থাকতাম। প্লেটো, ফায়েডো, আপেলোদোরাস সবাই অশ্রুপূর্ণ চোখে তাকে ঘিরে থাকত।

তিনি ধীরে বললেন, " যেমন সংগীত বীণা ভাঙলেও টিকে থাকে। আত্মাও দেহের বাইরে জাগ্রত থাকে। মৃত্যু ভয়ের কিছু নয়।"


শেষসকাল

সকালে প্রহরী হেমলকের পাত্র এনে দিল। ঘর নিস্তব্দ। আমরা সবাই কাঁদছিলাম। সক্রেটিস পাত্র হাতে নিয়ে বললেন। " মৃত্যু নিয়তি, ভয় করো না। অসততা ভয়ঙ্কর,  মৃত্যু  নয়'।


তিনি ধীরে ধীরে হেমলক পান করলেন। তারপর,কিছুক্ষণ পায়চারী করে শুয়ে পড়লেন। 

শেষ মূহুর্তে আমাকে বললেন, "ক্রিটো,  আক্রলেপিয়াসকে একটা মোরগ দিয়ে দিও। মৃত্যু হলো একটা আরোগ্য। " 

তারপরেই তার দেহ, নিস্তব্দ হলো।


আমি বহুক্ষণ তার মরদেহের পাশে বসে রইলাম। মনে হলো, আমার গুরু মারা যাননি। প্রশ্ন হয়েই বেঁচে রইলেন। তিনি আমাদের কোন উত্তর দেননি। তিনি আমাদের কেবল দিয়ে গেলেন জ্বলন্ত প্রশ্ন। 


আজ আমি ক্রিটো, সেই প্রশ্ন নিয়েই বেঁচে আছি।

সত্য কোথায়? ন্যায় কি? আত্মা কি অমর?

Tuesday, 25 August 2026

লালপরী আর নীলপরীরা

 লালপরী,নীলপরী আর বাখরখানি 


লালবাগ যারা গেছেন, তারা নিশ্চয়ই পাঁচরাহার মোড় চেনেন। পাঁচরাহা কি নিশ্চয়ই বুঝেছেন। পাঁচ রাস্তার মোড়। এক রাহা চলে গেল ভাগীরথীর পানে যেখানে থাকত ছোটখাটো চেহারার জ্যোতিকণা। ভারী সুন্দর, বিষন্নও যেন। হটাৎ ওর মুখটা ভেসে উঠল মনের কোনে। ভারী দুঃখী মেয়ে। আর এর একদিকে কেল্লা নিজামত।  যার দক্ষিণ দরজা পেরিয়েই আমাদের রাজত্ব। আমাদের আড্ডার জায়গা, রোমান গথিক স্টাইলের প্রাচীরের গায়ে গঙ্গার ধার ঘেষে আমাদের আড্ডা। সামনে সুমহান হাজারদুয়ারী।  সেছিল এক স্বপ্নের দিন। রইল বাকী তিন রাহা। একদিক গেছে হাতীশাল। আর একদিকে বিরাট আস্তাবল। আজ আর ঘোড়া নেই। দোকানে দোকানে ভরে আছে। আর একদিক গেছে খাগড়ার দিকে, মাঝে মহারাজ নন্দকুমারের বাড়ী, কাশিমবাজারের মহারাজের বাড়ী পেরিয়ে বহরমপুর শহর। যেখানে আমরা হরহামেশাই সাইকেল চালিয়ে সিনেমা দেখতে যেতাম। আশা পারেখের সিনেমা। আমাদের কালের বুক ঢিপঢিপ করা হিরোইন। তার ছলছলে চোখ আমাদের বুকে উথালপাতাল ঝড় তুলে যেত। আর সন্ধ্যেবেলা গাছমছম অন্ধকারের মধ্যে বটপাকুড়ের অন্ধকার ছায়া পেরিয়ে ফিরে আসতাম এই ছোট্ট শহরেই। পাঁচরাহা, এই ছোট্ট ঐতিহাসিক শহরেরই প্রাণকেন্দ্র। ছোট্টই বা বলি কি করে? এককালে বাংলা,বিহার, ওড়িশার রাজধানী। কম কথা তো নয়। সেকালের লন্ডনের থেকেও জাঁকে জমকে ভারী ওজনদার শহর। আজও তো তার কিছু চিহ্ন রয়েই গেছে। নবাব,বাদশাহ, হাতীশালে হাতী, আস্তাবলে সব বড় বড় ঘোড়া, এসব তো আমরাই দেখেছি। তবে নবাব আমাদের কালে হয়ে রইল ছোটে নবাব। আমাদের এক ক্লাসের বন্ধু। রাজত্ব হারিয়ে সেও মিশে গেল আমজনতার মাঝে। মতিঝিলের মসজিদের পাশের আমবাগানের ডালে বসে বিড়ি ফোঁকা ছোটে নবাব আমাদের মত পাত্র মিত্র অমাত্যদের সাথে,রাজকার্য ভুলে মশগুল হয়ে আড্ডায় মেতে রইত।


পাঁচরাহার দোকান, হাটবাজার বাস স্টপ, নবাবের আস্তাবল, হাতীশাল। কুঁড়াদার সেলুন, ঝুমুর চপের দোকান, অমল মোদকের মিষ্টির দোকান, নীরোদবাবুর বেকারি,জামাইয়ের মিষ্টির দোকান, আজ হয়ত আর নেই।  রয়ে গেছে স্মৃতিতে।  ইতিহাস আর বর্তমানে হাত ধরাধরি করে চলা এক ভারী মনখারাপের জায়গা। কেল্লায় আড্ডা ফেরত আমরা জামাইয়ের মিষ্টির দোকানের ধাপিতে বসতাম কিছুটা সময়। অপেক্ষায় থাকতাম কখন যাবে লালপরী আর নীলপরির দল । এরা সব লালবাগের সেরা সুন্দরীদের ঝাঁক। পৃথিবীর সেরা সুন্দরী সব। আমাদের সামনে দিয়ে সদর্পে বেড়িয়ে যেত। আড়চোখে দেখত অবশ্যই। সেটাই ছিল তখন বিরাট প্রাপ্তি। আর ছিল বেকারির গরম গরম বাখরখানি। তার তুল্য স্বাদ আর কোথাও  পাইনি। আসলে কৈশোরের স্বাদ কি আর ফিরে পাওয়া যায়?

এটা কোন গপ্প নই,স্মৃতিকথা তো নয়ই। আজ জ্বরের ঘোরে আধেক ঘুমে আধেক জাগরণে এসে ফিরে গেল লালপরী আর নীলপরীদের দল। বাখরখানির স্বাদ এখনো যে মুখে লেগে আছে। সে-তো মিথ্যে নয়। এসেছিল তারা, ফিরেও গেল। কোথায় কে জানে?

Saturday, 8 August 2026

ভবানীদার গল্প

কতই বা বয়স হবে আমাদের  তখন ১৪/১৫,  তার বেশী নয়। এমন কিছু আগের নয়। আসলে এখন ৫৫/৬০ বছর সময় আমার কাছে কোন সময়ই নয়। নেহাৎই কালকের কথা। সময়ের হিসেব একেবারে পালটে গেছে। আর পালটানোর আসল হোতা হচ্ছে ছোটকা। ছোটকা কিন্তু আমার কাকা বা জ্যাঠা কেউ নয়। ছোটকা আমাদের ফ্যামিলির সবচেয়ে ছোট সদস্য। তাই আমার কাছে কখনও ও ছোটকা, কখনও বা টুটুম। ওর আর একটা নাম আছে যেটা আমার এক্কেবারে পছন্দ নয়। আর সেইজন্য সেটা নিয়ে আমি পাঁচ কান করতেও চাইনা। তবে যা বলছিলাম ৫৫/৬০ বছর কেন আমার কাছে, কোন সময়ই নয়? কারণ আমার সাথে টুটুমের যা কিছু গপ্পসপ্প, সব আলোকবর্ষের হিসেবে।  এই মহাবিশ্ব নিয়ে ওর ভারী আকর্ষণ। রাত্রে ও আমার পাশে শুয়ে ওর প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসে।আর ওর সব কিছু প্রশ্নই এই আকাশ  আর বিশাল মহাবিশ্ব ঘিরে। ও ওর দাদুকে ভাবে ভারী পন্ডিত গোছের কিছু।তাই আমাকেও ওর প্রশ্নের উত্তর নিয়ে তৈরি থাকতে হয়। চন্দ্র, সূর্য্য, তারা শুধু নয়। ওর আকর্ষণ আরো গভীরে।  নোভা,সুপারনোভা, নিউট্রন, নেবুলা আর এখন শুধু ব্ল্যাকহোল।  আর এ সবের মূলে কিন্তু ইউটিউব। কম্পিউটারের পর্দায় ওর দেখার বিষয় হল এই সব মহাজাগতিক বিষ্ময়। ওটা নিয়ে ওর ভয় ও ভাবনা দুটোই আছে। ব্ল্যাকহোল কতদুরে? সব আলোকবর্ষের হিসেব। কত মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে সেটা বুঝতে, বোঝাতে আমার ভারী মাথা খাটাতে হয়। তবে আমরা দুজনেই একসময় পৌঁছে যায় ব্ল্যাকহোলের দোরগোড়ায়। ওর ভারী ভয়, ওর দাদু যেন হারিয়ে না যায় ব্ল্যাকহোলের অতল গভীরে। আমি বোঝায় ভয় কিসের, ব্ল্যাকহোল দিয়ে ঢুকে ঠিক বেরিয়ে আসব হোয়াইট হোল দিয়ে।  জীবনও তো তাই। জীবনের অজস্র ফুটোফোটার ব্লাকহোল পেরিয়ে বাঁচবার পন্থা নিশ্চয়ই আছে। শুধু পথটা চিনে নেওয়া চাই। হোয়াইট হোল তো আছেই, আমাদের সবার অপেক্ষায়। 

বলতে যাচ্ছিলাম আমাদের নবাব বাহাদুর স্কুলের ল্যাব এসিস্ট্যান্ট ভবানীদার কথা, চলে এলাম বহুদুরে। তবে এ পথ পেরোতে আমার সময় লাগবে না মোটেই।  কল্পনার দৌড় থাকলে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের ভারী হাত ধরাধরি ভাব। তাহলে শুরু করি? সে একটা দুষ্টু মিষ্টি গল্প। ভবানীদা ছিলেন আমাদের কেমিষ্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ল্যাব এসিস্ট্যান্ট।  আর আমার বয়সী ছেলেদের হাত দেখতে তার বেশ আগ্রহ। বেশি কিছু লাগত না। স্কুল ক্যানটিনে এক কাপ চা, বিস্কুট খাওয়ালেই ভবানীদা ভারী মনোযোগ সহকারে  আমাদের হাত নিয়ে বসে পরতেন তা নিরীক্ষণ করতে। আর আমাদের বয়সী ছেলেদের মনের গতি প্রকৃতি তার ভারী জানা। বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে বলতেন, 'বুঝলে নিলু, একজন তোমাকে খুব পছন্দ করে।" ১৫ বছরের নবীন হৃদয়,  সে অচেনা ত্রয়োদশী বা চতুর্দশীর সম্ভাবনায় ধড়ফড় করে ওঠে। ' স্কুলে আসার পথে দেখবে তো ভাল করে, একটা বিনুনী দোলানো মিষ্টি মেয়ে তোমার দিকে আড়চোখে তাকায় কিনা?' যদি তাকায় তবে জানবে ওই সেই মেয়ে। আতিপাতি করে খুঁজে ফিরি? কে সেই মেয়ে। ডলি,মঞ্জু, চায়না?  কে সে? 


সেটা যে আড়চোখে তাকিয়েই জীবন নদীতে অবগাহনের সময়।  সেই অবগাহন আজও তো শেষ হয়নি। যদিও জানি, ব্ল্যাকহোলের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি প্রায়, তবুও হোয়াইট হোলের রাস্তা? সেও তো আমার জানা৷ ঠিক পৌঁছে যাব জানি একদিন। জীবন মরণেরও ঊর্দ্ধে,অন্য কোন ঠিকানায়। জীবন যে অনন্ত এক পথচলা।

Saturday, 25 July 2026

দিল্লি দূর নেহী

 ছবিতে এই যে ছেলেটাকে দেখছেন কমেডিয়ানের সাজে, ও এসেছে দিল্লিতে নিজের ভাগ্য গড়ে  নিতে। ও নিজের ভাগ্য আদৌ গড়তে পারবে কি না, না ভাগ্যও ওকে নিয়ে কমেডি করবে,  তা  বলতে  পারে কেবল সময়। এসেছে সেই সুদূর রাজস্থানের শিকার জিলার কোন এক অখ্যাত গ্রাম থেকে। আপাতত এক পাঞ্জাবী বার কাম রেস্ট্যুরেন্টের খদ্দের ধরার কাজ করে করোলবাগের এই সদা সরগরম বাজারে। সকাল ১১ থেকে রাত ১১টা অব্দি ওর ডিউটি। ওর কাজ খদ্দের ধরা ওই বার কাম রেস্টুর‍্যেন্টের জন্যে।  ১১টার পরে,  ওর বাসায় যাবে সেই দূর রজৌরী গার্ডেনে।  সকাল থেকেই আমার পেছনে লেগে ছিল, ওর রেস্ট্যুরেন্টে নিয়ে যাবার জন্যে। দারুণ সব অফার। পাঞ্জাবী হোটেল যখন দারুর প্রাধান্যটাই বেশী। এক পেগ হুইস্কী নিলে, এক পেগ ফ্রি। দুইয়ে দুই। তার সাথে দারুণ সব স্বাদিষ্ঠ খানা। কিন্তু পাঞ্জাবী খাবারে এতই বাল্লে বাল্লে মালাই আর দেশী ঘিওয়ের ছড়াছড়ি যা পেটরোগা বাঙালীর মোটেই সয় না। এর আগে সে শিক্ষে আমার হয়ে গেছে। সে সব যাইহোক, ওর সাথে কথা বলে আমার মন ভিজে গেছে। আমি কথা দিয়েছি একদিন আমি যাবই ওদের রেস্ট্যুরেন্টে গলা ভেজাতে।  অনুরোধে ঢেঁকীও গিলতে হয়। আর এ আর এমন কি। সামান্য ওয়ান প্লাস ওয়ান, কিই বা এমন। হয়তো দুপেগও নিয়ে নিতে পারি, ওর মুখ চেয়ে। দুই দুগুনি চার। সে ম্যানেজ করা যাবে। তবে ওই মালাই আর দেশী ঘিয়ের মহোৎসব কি ভাবে ম্যানেজ করব সেটা নিয়েই বড্ড চিন্তা ছিল। 

পুনশ্চ : দিল্লিতে সেবার চারদিন ছিলাম। তার পরের তিনদিন,  সেই রেস্টুর‍্যেন্টেই পরের তিনটি সন্ধ্যেই কেটেছিল। ইভিনিং ড্রিংক্স সে ডিনার তক। সেখানে ভালো চাইনিজ খাবারও পেয়ে গিয়েছিলাম। ওয়েটার যারা ছিল সব এই বাংলার। রোজ বসতো ,লাইভ গানের আসর।  লক্ষনৌর এক ওস্তাদ আর তার সঙ্গীনি দিল্লিরই এক সুন্দরী কন্যে ভারী সুন্দর গজল আরো সব গান গাইতেন।  একে দিল্লি, তাই করোলবাগের চত্তর, চারিদিকে সব লম্বাচওড়া সর্দারজী তাদের পরিবার সমেত, আর পাতিয়ালা পেগ। ভারী সুন্দর তিনটে সন্ধ্যে কেটেছিল সেবার দিল্লিতে। সাউথ আফ্রিকার এক বিরাট ব্যবসায়ী সর্দারজীর সাথেও ভারী ভাব হয়ে গিয়েছিল সেবার।


 ভারতবর্ষের কথা ভেবে, অবাকই লাগে। কি বিরাট বিচিত্র দেশ আমাদের, কি বিশাল তার সংস্কৃতি আর বৈচিত্র্য।  এমন ঐশ্চর্য্যময়ী বিচিত্র দেশ এই বিশ্বসংসারে আর দুটি নেই।  কি যেন এক অদৃশ্য সুরে বাঁধা।  গর্ব হয় নিজেকে  আরতবাসী ভেবে। 

ছবির এই ছেলেটির সাথে আর দেখা হয়নি আমার। আমার বিশ্বাস, আজ নিশ্চয় সে নিজেকে প্রতিষ্টিত করতে পেরেছে। আজ হঠাৎই তার কথা মনে পরে গেল। সে যেন তার ঠিকানা খুঁজে পেয়ে থাকে দিল্লিতে।

Friday, 24 July 2026

বছর তিনেক আগে- রঘুরাজপুর


















আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেটে গেল রঘুরাজপুর গ্রামে।   অনেকে আবার একে শিল্পীগ্রাম বলেও থাকে। উৎকল ঘরানার ছবি আঁকাই এদের পেশা আর নেশাও। একজন দুজন নয় সারা গ্রামের লোকেরাই এই পেশায় যুক্ত। সারাবছর ট্যুরিষ্টরা আসে আর মেলায় মেলায় ঘুরেই এদের বিক্রিবাট্টা। তাছাড়া বিদেশেও এদের শিল্পসামগ্রীর চাহিদা আছে। মূলত ঘর সাজাবার ডেকর হিসেবে এগুলোর চাহিদা।সরকারি সাহায্যও প্রচুর মেলে। সাহায্য ছাড়া এদের টিঁকিয়ে রাখা যাবেনা। আমরাও ঘুরে ফিরে দেখলাম। আমি তো শিল্পের বুঝি,ঘেঁচু। কুন্তলাই ঘুরে ঘুরে দেখল, কিনলোও কিছু।হয়তো গিফট করবে কাউকে কাউকে। তবে রঘুরাজপুর গ্রামটা আমার বেশ লাগে। কি দারুণ সবুজ। একটা নৃত্যাঙ্গন ঘিরে ছোট্ট একটা স্টেডিয়াম। মাঝে জগন্নাথদেবের মন্দির। আর ওড়িশি নাচ তো জগতবিখ্যাত। গুরু কেলুচরন এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন। তার সেই বাড়ী আজ ভগ্নস্তুপ। কেউ তার স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাই করেনি। এতদিন জানতাম বাঙালীই শুধু আত্মবিস্মৃত জাতি। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশাও কম নয়। সেসব যাইহোক, রঘুরাজপুর আমার বেশ পছন্দের গ্রাম।  আগে যদি জানতুম তাহলে এখানেই হয়তো বিয়েশাদি করে থিতু হতেম। তাম্বুল খাইতাম আর কি করতাম?  আঁকা আমার কম্ম নয়। হাতের লেখাই কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং, তার উপরে আঁকা? হবে নি? ওড়িশি নাচ, তাও নয়। তবে পান্ডাগিরিই করতাম। এটা আমায় ঠিক মানিয়ে যেতো। ভগবানের হয়ে দালালি সে কি কম হালালের কাজ? 


যাক, এসব। এর একটা দ্বিতীয় পর্বও আছে। পুরীর চ্যাঙ ওওয়া তে লাঞ্চ। চমৎকার ছিমছাম রেস্তোরাঁ। দুপুরে খুব লোকজন ছিলেন না। অনেকের রিকমেন্ডেশন ছিলো এখানে আসার জন্যে। তাই এলাম। আমি সেইরকম চীনে খাবারের ভক্ত নই। তবুও এসেই।গেলাম।  বেশ ভালো। আমিও রেকমেন্ড করছি আসার জন্যে। আমরা খেলাম থাই সুপ, কুং ফু চিকেন আর মিক্সড ফ্রায়েড রাইস। পরিমাণে যথেষ্ট আর স্বাদিষ্ঠ ।  টোটাল বিল ৮৪০ টংকা মাত্র। এটুকু এফোর্ড করাই চলে। তবে চাইনিজ হোক, চাই মুঘলাই আমার আসল পছন্দের খাবার ছ্যাঁচড়া। আমার স্বভাব চরিত্রের সাথে বেশ মেলে। শুধু আমি কেন, বাঙালী চরিত্রের আসল দিকই হলো, ছ্যাঁচড়ামি । ছ্যাঁচড়া আমাদের জাতীয় খাবার আর ছ্যাঁচড়ামি বাঙালীর জাতীয় চরিত্র। জয় জগন্নাথ।

Wednesday, 15 July 2026

পুরুলিয়ায়

 

আমাদের শেকড়বাকড় স্বজন বন্ধুরা সবই রঘুনাথগঞ্জের । আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাস ২৫০ বছরেরও বেশী। তার আগে আমাদের আদিবাড়ী ছিল কাঞ্চনতলা গ্রাম, ফারাক্কা যাবার পথে। আগে আমার লেখা যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় জেনে গেছেন আমাদের পুর্বজরা পেশাতে ছিলেন ডাকাত। পরে নবাব নাজিমদের আনুকুল্যে প্রচুর ভুসম্পতির মালিক হন। সাঁওতাল পরগণা, মুর্শীদাবাদ, মীর্জাপুর আরো বহু অঞ্চলে জমিদারী বিস্মৃত করেন নবাবী পাট্টার জোরে।এর অনেকটাই আমার দেখা।তবে জমি যে বাপের হয়না দাপের এটা আমার জীবনেই পরীক্ষিত সত্য।পদ্মার গর্ভে আর অযোগ্য উত্তরপুরুষদের হাতে পরে তাই সবই হোল বেহাত আর বেশ কিছুটা গেল পদ্মার গর্ভে। পাপের শাস্তি বোধহয়। তবে আমার মাঝে মাঝে আফসোস হয় । যদি পূর্বপুরুষদের জীনের এককণাও পেতুম, তাহলে বেশ তোলাবাজ,রংবাজ হয়ে বেশ কাল কেটে যেত। হা করে বসে থাকতে হত না ডিএ বাড়ল না কমল সেই দিকে তাকিয়ে। 

বড্ড ধান ভানতে শীবের গীত হয়ে যাচ্ছে। আসল কথায় ফেরা যাক। আমার জন্ম, দেশ সবই রঘুনাথগঞ্জে। কিন্তু এখানে আমাদের খুব বেশীদিন থাকা হয়নি। বাবার বদলীর চাকরী। দুতিন বছর অন্তর অন্তর আমরাও পাঁচ ভাইবোন হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনখানে করে বেরিয়েছি। তাই আমার শৈশব কৈশোর কাল শুধু রঘুনাথগঞ্জে নয়, ছড়িয়ে আছে পুরুলিয়া, মেজিয়া, জিয়াগঞ্জ আর লালবাগের আকাশে বাতাসে। 

জিয়াগঞ্জে কেটেছে আমার পাঠশালা কাল। ভুজঙ্গ মাষ্টারের পাঠশালায়। আমার সেই সময়ের কথা আমি আগেই লিখেছি। তাতে যেমন ভুজঙ্গ মাষ্টার আছেন,হরিশ দাদু আছেন, আছে আমার বন্ধু কচু আর জিয়াগঞ্জের সেই তেনারা, সন্ধ্যের পর যাদের নাম নিতে মানা। এই তেনাদের সাথে আমার প্রায়ই মুলাকাত হয়েছে সে জিয়াগঞ্জের আধো অন্ধকার গলিতে বা লালবাগে নবাবী আমলের প্রাসাদে। তারা আমার কোন ক্ষতি তো করেনইনি হয়তবা স্বগোত্রীয় ভেবে কিছুই প্রশয়ই দিয়েছেন। 

যাক সেসব কথা তেনারা আছেন তেনাদের জায়গায়, তাদের বিরক্ত করার দরকার কি। তবে আছেন, এটা জেনে রাখুন। হচ্ছিল জিয়াগঞ্জের কথা হটাত তেনারা এসে পরলেন।বরং জিয়াগঞ্জকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। কারণ জিয়াগঞ্জের কথা আগেই লিখেছি। কারুর যদি ইচ্ছে হয় আমার টাইমলাইলে পড়ে নেবেন। 

এখন বরং আমার সঙ্গে চলুন পুরুলিয়া।পুরুলিয়াও আমার মনে ছাপ রেখে গেছে। পুরুলিয়ায় আমরা ছিলাম প্রথমে নীলকুঠিডাঙায়। বেশ সুন্দর পাড়া, ছিমছাম।আমাদের বাড়ীর সামনেই ছিল এক্ জজসাহেবের বাড়ী। তার নাম আজ আর মনে নেই। তবে জজসাহেবের বাড়ীর সুন্দরী মেয়ে বউরা রোজ বিকেলেই আমার মা বা দিদির কাছে আসতেন গল্প করতে। এতসব কথার মধ্যে মার কথা বলাই হয়নি। মা ছিল বেশ গপ্পে মানুষ। তাই আসর জমজমাটই হত। তবে আমি ছিলাম মুখচোরা। মিশতে পারতাম না মোটেই। আমার দিদিরা তাই আমাকে বলত ‘মিচকে শয়তান’। আমার ফেবুর বন্ধুরা অনেকেই খুশী হবে। আর শান্তি নিশ্চয় হাততালি দিচ্ছে এতক্ষনে। আমার দাদা ওখানে ভর্তি হয়েছিল জেকে কলেজে, দিদি নিস্তারিনী কলেজে,অলকা দিদি শান্তিময়ী গার্লস স্কুলে।

আমি ভর্তি হলাম শিশুশিক্ষা বলে একটা স্কুলে এক ক্লাস উপরে। ওখানে তখন ওইরকম নিয়ম ছিল, বাংলা থেকে গেলেই একক্লাস ওপরে ভর্তি করে নেওয়া। আসলে পুরুলিয়া সবে তখন বিহার থেকে বাংলায় এসেছে। সেই স্কুলের কিছু স্মৃতি আজও মনে আছে। মনে আছে ওখানে আমাকে একটা নাটকে নিয়েছিল, রাজপুত্রের চরিত্রে। কিন্তু রাজপুত্র যে কারনে অকারনে শুধু হাসে। তাই পদচ্যুত হয়ে পেলাম মরা সৈনিকের পার্ট। তাতে হাসি তো বন্ধ হল না। মরা সৈনিক যে শুয়ে শুয়েও হাসে। অতএব আবার বাদ। এবার দেওয়া হল খাবার দেওয়ার কাজ, আবার বাদ,এবার এত বেশী বেশী করে দিতে থাকলাম, যে খাবারে টান পরে গেল। শিশুশিক্ষা থেকে এবার ভর্তি হলাম পুরুলিয়া জেলা স্কুলে। বিরাট স্কুল, বিরাট মাঠ। আড্ডা স্যার বলে একজনকে মনে আছে। খুব রাশভারী। ইংরেজী পড়াতেন প্রমথস্যার , তিনিও বেশ চড়া মেজাজের। ক্লাসে গন্ডগোল করার কোন উপায় ছিলনা। আর মনে আছে প্রথম ছৌ নাচ দেখার কথা। ভারী আশ্চর্য্য লেগেছিল। আমার ছোট্ট মনে বড় ছাপ ফেলে গিয়েছিল ওইসব ঝলমলে পোষাক আর নাচ। আমার ক্লাসে এক বন্ধু হয়েছিল, জেলা স্কুলের সামনেই বাড়ী।আমাকে নিয়ে যেত ওদের বাড়ী। ওদের বাড়ীতেই প্রথম একোয়ারিয়াম দেখেছিলাম। এর মধ্যে আমরা নীলকুঠীডাঙার বাসা ছেড়ে একটা বড় বাড়ী নিয়েছি হুচুকপাড়ায়। বাড়ীর পেছনে বাগান থেকে অযোধ্যা পাহাড় দেখা যেত দুরে।তবে সেই পাহাড়তলী থেকে কোন দইওয়ালা আসে নি, আসে নি কোন গোয়ালাদের মেয়েও আমার খোঁজে । এই হুচুকপাড়ার মুখে একটা বড় বাড়ী ছিল। সম্ভবত কোন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্তের। সেই বাড়ীতেই আমি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদকে দেখেছিলাম।

আর একজনের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তিনি জীমুতবাহন সেন। বিরাট সমাজসেবী,প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ত। পুরুলিয়ার অনেক স্কুল কলেজই ওর আনুকল্যে গড়া। সেই সেনসাহেবের বাড়ীতে সন্ধ্যেয় আড্ডা বসত। আমার বাবা সেখানে প্রায়ই যেতেন কখন কখনো আমিও গিয়েছি। যতদুর মনে পরে একটা পোর্টিকোর মত একটা জায়গা পেরিয়ে ঢুকতে হত। আর গেটের ওপরে সম্ভবত বোগেনভালিয়া বা ঝুমকোলতার গাছ ছিল। জীমুতবাহন সেন কে আপনারা নাই চিনতে পারেন। কিন্তু ফেবুর দীপক সেন কে অনেকেই চেনেন নিশ্চয়। দীপক সেন ওনারই ভাইপো। ছোটবেলায় দেখেছি নিশ্চয় পাত্তা দেয়নি মোটেই। এখনও যে দেয় এমনটি নয়।

পুরুলিয়ায় আমি একটু গালিও শিখেছিলুম। অদ্ভুত রকমের। ওখানকার ডায়ালেক্ট অনেকেই জানেন। বটেক, কিন্তুক কিন্তু সব কথার মধ্যে মিশে থাকে। ওখানে ভিক্টোরিয়া স্কুলের মাঠে খেলার সময় মারামারিতে একটা ছেলে আমাকে বলল, “তোকে পুলি  ছুড়ে মারবক কিন্ত।“ পুলি যে একটা অশ্লীল শব্দ পরে তা জানলাম।

ভাবছি আমার ধেড়ে বয়সের বন্ধুদের মধ্যে এটা চালু করে দেব আজ থেকেই। আজ আমাদের গেট্টু আছে। আজ পল্টাকেই ছুড়ে মারব প্রথম পুলিটা।

পুরুলিয়ার সাহেব বাঁধ তার লাল নীল মাছ, সুন্দর মানুষজন সবই গেথে আছে মনের মধ্যে। আর মনে আছে একটা বাচ্চা ছেলের কথা। যাকে রোজ হুচুকপাড়া থেকে চটের ব্যাগ আর পকেটে এক টাকা নিয়ে জজকোর্ট ছাড়িয়ে বাজার করতে আসতে হত। এক টাকায় তখন ব্যাগভর্তি বাজার। ফেরার সময় টানতে পারত না।পুরুলিয়ার গরমে তার ফর্সামুখ লাল হয়ে যেত। বসে পরত কোর্টের সামনে এক বেলগাছের নিচে। ভারী ব্যাগ এবার গলায় ঝুলিয়ে সে হাঁটতে শুরু করত, হাতে যে বড় ব্যাথা করত। আরে  সে বাচ্চা তো আমিই ছিলাম আজ তো মনে হয় সে অন্য কেউ। তাই তার জন্য ব্যাথায় মন টনটন করত। আজ পুরুলিয়া কান্ড এখানেই ইতি। এরপর পুরুলিয়া নিয়ে লিখবে দীপক। এবার আমি ফিরে যাব রঘুনাথগঞ্জে। সেখানে সুকুমারী ঠাকরুন, অলকাদিদি( আমি অবশ্য ওকে দিদি বলে কোনদিন মানিই নি, কিন্তু ওর চলে যাবার দিন কেন আজও ওর কথা মনে করে দুচোখ ছেপে জল নামে) আর ভোলা আরও অনেকে। এর পরের সংখ্যায়।


Thursday, 2 July 2026

ডিমের মিহিদানা

 ডিমের মিহিদানা 


কেউ শুনেছেন? আমি তো দুদিন আগেও এর কোন নাম শুনিনি। কিন্তু শুনতেই হলো।


ডিম শুনেছি, মিহিদানার সাথেও বেশ মাখামাখি সেই ছোটবেলা থেকেই।  কিন্তু এইরকম যে কিছু হতে পারে, তা আমার জানাশোনার বাইরে ছিল।

আমাদের ছোটোবেলায় ডিম সে একটা মহার্ঘ্য ব্যাপার ছিল। আসলে তখন তো এতো পোল্ট্রিও হয়নি। তাই ডিমের জোগান ছিল বেশ বেশ কম। মুরগির ডিম তখনো হিন্দুবাড়িতে নিষিদ্ধই ছিল। 

আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাড়ীতে ছিল কাজের মাসী চিন্তা আর তার বর ভরত, সে ছিল জলের ভারী। মিউনিসিপালিটির কল থেকে আমাদের খাবার জলের যোগান দিত। চিন্তার বাড়ি ছিল মাল পাড়ায়, আমাদের ফাঁসিপাড়ার বাড়ীর খুব কাছেই। তার দুদশটা হাঁস ছিল। সেই হাঁসের ডিম আমাদের দিত মাঝে মাঝে , সেদিন মনে হত খুব স্পেশাল একটা দিন। তবে সুতোয় কাঁটা হাফ ডিমই ছিল বরাদ্দ। তাই খেতাম তারিয়ে তারিয়ে, কুসুম ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কুসুমকে নিয়েই কেটে যেত বহুক্ষন। মানে খাওয়ার শেষে কুসুমে কুসুমে কুসুমময়। স্বাদটা বহুক্ষণ ধরে রাখতাম। আসলে সেইসময়কার মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতীক ছিল এই হাফ ডিমের গপ্প। আমাদের প্রজন্মের সবাই এই হাফ ডিম সমাজ থেকেই উঠে আসা। তবে সেই ডিম কিন্তু আজকের ডিমের থেকে অনেক আলাদা। দেশী হাঁসের নীলাভ ডিম, হোক হাফ তবু তার স্বাদ, আজও মনে গেঁথে আছে আর সেই যৌথ পরিবারের সুখী সুখী ছবিটাও বড় স্পষ্ট। সে ছিল বড় বড় সুখ আর ছোট ছোট দুঃখের দিন। 

আমার পিসি থাকতেন বহরমপুরের রাধারঘাটে। বেশ অবস্থাপন্ন। সেই সব দিনে যখন মোটরগাড়ি ছিল খুব হাতেগোনা তখন পিসির ঝা চকচকে গাড়ী। বহরমপুর থেকে প্রায়ই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চলে আসতেন। পিসির আসাটা ছিল এক উৎসব।  যে কদিন থাকতেন যেন দুগগা পূজোর আমেজ মাখা। পিসি আমার ডিম প্রীতির কথা জেনে করে দিলেন গোটা গোটা ডিমের ডালনা। এর পরে আর কি কোন কথা থাকতে পারে? ডিম পর্বের এখানেই শেষ। 


এবার আসি মিহিদানায়। দুএকবার খেয়েছি ঠিকই। কিন্তু কোনদিনই খুব ভালো লেগেছে বলে মনে পড়েনা। ট্রেনে যাওয়ার পথে বর্ধমান ষ্টেশনে দেখতাম খুব মিহিদানা আর সীতাভোগ বিক্রি করত। মিহিদানা আর সীতাভোগের সাথে আমার নিবিড় পরিচয় এই বর্ধমানেই।  বর্ধমানের ব্র‍্যাণ্ড এমবাসাডর কিন্তু এখনো এই মিহিদানা আর সীতাভোগ।  আর এই স্পেশালিটি মিষ্টির এক নম্বর দোকান গণেশের দোকান। আগে কার্জন গেটের অনেক ভেতরে ছিল গণেশের দোকান।  এখন বড় রাস্তায় তিনকোনিয়া বাস স্ট্যান্ডের কাছে বিরাট দোকান করেছে। রমরমে ব্যাবসা। লোকের যতই সুগার হোক, এর চাহিদা বেড়েছে বই কমেনি।

তবে আমার কিন্তু সীতাভোগই বেশী পছন্দের। তাও বর্ধমানের নয়, এই কলকাতারই। আমি তিনবছর স্টেট ব্যাঙ্কের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির চার্জে ছিলুম।সেই সময় বহুগুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম।  সুরঞ্জন দাস, চিন্ময় গুহ আরো বহু বহু জনের। এদের সাথে আজ আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু পুঁটিরামের সীতাভোগের সাথে আজও আমার অন্তরঙ্গ যোগাযোগ রয়ে গেছে। সেরা সীতাভোগ অবশ্যই কলেজ স্কোয়ারের পুঁটিরামের দোকানের। পেতে পারেন যদি সকাল সকাল যান। খুব চাহিদা,  আস্তে না আসতেই উধাও হয়ে যায়।


ডিম হলো, মিহিদানাও হলো। সীতাভোগও পরিবেশন করলাম অতিরিক্ত।  এবার তাহলে তৈরি থাকুন ডিমের মিহিদানার জন্যে। এটা বাংলাদেশী রেসিপি৷ এই বাংলায় এই পদের পদকর্তা আমার কন্যাসমা রাধিকা,শ্যালিকা কন্যা।  যা আমাদেরও বিনোদিত করছে কখনো কখনো । দারুণ লাগলো খেতে।  সাধারণ মিহিদানা নয়। মিষ্টি মিষ্টি ডিম ডিম। It’s different. সঙ্গে ডিমের মিহিদানা তৈরির ভিডিও দেখে নিন ইউ টিউবে। মেয়ে বা বউমাকে বলুন একদিন তৈরি করে খাওয়াবে। ভাল লাগলে রাধিকাকে ধন্যবাদ দেবেন। না লাগলে চেপে যান।😁