Tuesday, 28 April 2026

পটলার তেলেভাজা আর লড়াইয়ের চপ

 পটলার তেলেভাজা আর লড়াইয়ের চপ


আসল কলকাতা যদি চিনতে হয়, জানতে হয়, তাহলে আপনাকে আসতে হবে উত্তর কলকাতাতেই। শ্যামবাজার, বাগবাজার, হাতীবাগান  অঞ্চলেই। বেঙ্গল রেঁনেসার একঝাঁক উজ্বল সব জ্যোতিষ্কের সমাবেশ ঘটেছিল এই উত্তরেই। বাঙালীর যা কিছু গর্বের তার অনেকটা জুড়েই আছে উত্তর কলকাতা।  সুনীল গাঙ্গুলীর 'সেই সময়' পড়লে, সেকালের অনেকটাই ধরা যায়। এতো গেল বাঙালীর বৌদ্ধিক চর্চার দিক।কিন্তু সেকালের কলকাতার বাঙালীরা যে ভোজন বিলাসীও, তার খোঁজও আপনি পাবেন এই উত্তর কলকাতাতেই। এপারের বাঙালীরাও স্বভাবগত ভাবে ভোজন বিলাসীও। নানারকম সুখাদ্যের সমাহার এই উত্তর কলকাতাতেই। নকুড়ের মিষ্টি কেউ খেয়েছেন? আজও তার জুড়ি মেলা ভার। নকুড়ের মিষ্টির দোকানের জগৎজোড়া নাম যদি বলি, খুব কি ভুল বলা হবে?কে না খেয়েছে এই দোকানের মিষ্টি? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন দেশ বিদেশের রাষ্ট্র প্রধান এবং আরো সব বিখ্যাত মানুষজনেরা। আম্বানীর ছেলের বিয়েতেও আলো করে ছিলো এই দোকানের সন্দেশ। এরা শুধু সন্দেশই বানান, রসের মিষ্টি নয়। ঠিক হেদোর উল্টোদিকে  রামদুলাল সরকার স্ট্রীটে  এই দোকান। পারলে যাবেন একদিন, এর সন্দেশের স্বাদের জবাব হয় না, হবে নাও কোনদিন।  কেননা এর পরতে পরতে ইতিহাসের গন্ধ মাখানো। মীর্জা গালিব কলকাতায় থাকাকালে, এই অঞ্চলেই ছিলেন অনেকদিন।  তখন কি এই দোকান ছিল? থাকলে তিনিও আসতেন ঠিকই, তাহলে সন্দেশ নিয়ে তার লেখা  কিছু শের শায়েরীতে অবশ্যই থাকতো। 


এ অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে না? একদম। ভেবেছিলাম আজ শিল্প নিয়ে কিছু লেখালিখি হোক। কিন্তু, ' দিদির রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।' শিল্প কোথায় যে লিখব? বাঙলা থেকে শিল্পটিল্প বহুদিন গেছে উঠে। কি করা যায়? আরে চপভাজাও তো ইদানীং শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে। তার বেলা? 'তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর উপর রাগ করো' ওটি চলবে না।

উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে চপ শিল্পের রমরমা। আর আজ তাদেরই কাউকে নিয়ে হয়ে যাক মেগাসিরিয়ালের শুরুবাত? ঠিক কি না? ঠিক ঠিক। আপনাদের অনুমোদন নিয়েই তাহলে চপ হোক, শিল্প।


আজকের এই শিল্পোদ্যোগী মহাশয়ের নাম অবশ্যই আদি অকৃত্তিম পটলা। আর দোকানের নাম,লোকমুখে পটলার তেলেভাজার দোকান। এর একটা পোশাকি নামও আছে, সেটা হলো, Patla's snacks. এই দোকানের সিগনেচার আইটেম কি বলুন দেখি? ' 'লড়াইয়ের চপ'।  এই চপ আর মুড়ি নিয়ে   কেউ কি লড়াই করতে যায়।

? যায় হয়তো, আমার জানা নেই। তবে এই ভোটের রাজ্যে, অলিতে গলিতে যখন লড়াই লড়াই, লড়াই চাই এইরকম একটা হাইপ চলছে। তখন সেই সব বীর যোদ্ধাদের কেউ কেউ যদি লড়াইয়ের চপ আর মুড়ি নিয়ে মিছিলে যায়  বা পথসভা করে, তাতে আমি তোকোন দোষ দেখিনা।

কিন্তু পটলা এই চপের নাম কেন 'লড়াইয়ের চপ' দিল? তারও ইতিহাস তো আছে কিছু। অবশ্যই আছে।


শুনুন তবে সেই ইতিহাস। এই লড়াইয়ের চপের জন্ম সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন এই তেলেভাজার দোকানের মালিক ছিলেন, অমুল্যধন সাউ। যাকে সবাই পটলা নামেই চিনতেন। তখন যুদ্ধ চলছে জোর কদমে। তাই পটলার সেই বড় আকৃতির চপের নামও লোকমুখে ' লড়াইয়ের চপ' বলে চালু হয়ে গেল। সে যুদ্ধ কবে শেষ হয়ে। কিন্তু নিত্যনতুন যুদ্ধ তো চলছেই। আর সে সব আপনারা সবাই তো অবগত আছেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'লড়াইয়ের চপ' আজও লড়াইয়ের চপ। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, চলবে। যুদ্ধ যতদিন চলবে, পটলার ' লড়াইয়ের চপ' ততদিনই থাকবে। ঠিক কি না? বলুন, 'ঠিক, ঠিক'।


লড়াইয়ের চপ আদতেই প্লেন & সিম্পল, আলুর চপ। আগে সাইজে বড় হতো। বেশ একটা লড়াই লড়াই ভাব থাকতো।  ইদানীং, ওতটা বড় হয়তো হয় না, তবে যত্নে ভাজা, কড়া করে।  যেটা অম্বলের রোগীদের সাথে বেশ যায় মানে খেলে আর কি। আমি তো প্রায়ই গিরীশ মঞ্চে নাটক দেখতে যায়। তখন মাঝেমধ্যেই পটলার দোকানে ঢুঁ মারি। ওদের রাধাবল্লভী আর আলুর দমটা মারাত্মক টাইপের টেস্টি। আমি ইদানীং আদি হরিদাস মোদকের নুচি ছেড়ে পটলাতেই মন দিয়েছি। তাছাড়া আছে অজস্র তেলেভাজার সম্ভার। চপ, বেগুনী , ধোঁকা,  ইত্যাদি ইত্যাদি।  আমি ওই রাধাবল্লভীতেই থেমে থাকি। আসলে আমার টাইপটাতো একটু কেষ্ট কেষ্ট , তাই রাধার সাথেই আমার ভাব আর ভালোবাসাও। 

এতো কথা যে বললাম, একবার যাবেন নিশ্চয়ই পটলার দোকানে। বাগবাজার বাটা দিয়ে ঢুকে গঙ্গামুখী হবেন। গঙ্গামুখী বলেছি,গঙ্গাযাত্রা নয়। মাইন্ড দ্যাট। বেশ কিছুটা  টোটো করে হেঁটে বা টোটোই চেপে এলেই ১৮ নম্বর বাগবাজার।  আরামসে চিনবেন।  সব তেলেভাজা প্রেমীরা ঘিরে রেখেছে,  পটলার স্নাক্স দোকান, মৌমাছিরা যেমন চাঁক ঘিরে থাকে। ভয় পাবেন না আরামসে খান। এক আধদিনই তো খাবেন। রোজ রোজ  তো নয়। জানি আপনি পেটরোগা বাঙালী,  তাই বলে লড়াই করবেন না? এবার, একটু হাঁটি হাঁটি করে গিরিশে ঢুকে পড়ুন। কোন না কোন নাটক চলবেই।দারুণ হিমশীতল একটা থিয়েটার হল। টিকিট পেয়েই যাবেন,বিরাট থিয়েটার হল। নাটক দেখার শেষে, ইচ্ছে হলে বাড়ী ফেরার পথে একটু বাণিজ্যও করতে পারেন। সব টাটকা শাকসবজি ওঠে সামনের রাস্তার দুধারেই। আর পাবেন বাগবাজার গঙ্গার ঘাট থেকে ধরা জ্যান্ত জ্যান্ত সব মাছ। টেসই আলাদা।  সীজনে ইলিশও পাবেন। গ্যারান্টি। কে না জানে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটের ইলিশ স্বাদে রুপে গন্ধে একেক একেকটা সব সেইকালের  'নুরজাহান',যা দুনিয়াকে আলো করে রাখে।

Monday, 23 March 2026

কালীপ্রসন্ন সিংহী

 আজ চারটে বাজতেই বেড়িয়ে পড়েছি বিশেষ এক উদ্দ্যেশ্য নিয়ে। অন্যদিন হলে উদ্যেশহীন ভাবে বেড়িয়ে পরি।  অবশ্যই উত্তর কলকাতায়। আসল কলকাতা, বাবু কলকাতা। সে কলকাতার সোঁদা গন্ধ হয়, পুরনো বিবর্ণ বাড়ী ঘরদুয়ার দেখে যাদের মন খারাপ হয়, যাদের ঘাড়ের উপর বেঙ্গল রেঁনেসার চরিত্ররা ক্রমাগত নিশ্বাস ফেলে, আমি সেরকম ভাগ্যবানদের একজন। 

আজ কেন বেড়িয়ে পরেছি, কিই বা উদ্যেশ, সে সবই বলব তার একটা পটভূমিকা আছে।আমা













দের একটা ছোট্ট ক্লাব আছে, নাম তার চার ইয়ারী। মানে চার বন্ধু সমাবেশ। আমি,শিশির, জয় আর নির্মাল্য মাঝেমধ্যেই আড্ডায় বসি। উদ্যেশ অবশ্যই আড্ডা মারা।তবে আড্ডা মারতে গেলেও, পান,অনুপানের সঙ্গত লাগে, না হলে আড্ডা জমে না। পান হয় যথেষ্টই, সেটা জোগায় শিশির প্রধানত, আর নির্মাল্য।  উৎকৃষ্ট স্কচ/সিঙ্গল মল্ট। সে যায় হোক, এখানে কিন্তু পান করাটাই অনুপান তূল্য। এখানে বিষম বিশাল বৌদ্ধিক  আলোচনা হয়। নাটের গুরু শিশির, তার সাথে সেয়ানে সেয়ানে টক্কর দেয় নির্মাল্য।  জয় মাঝেমধ্যে from Auditors point of view মূল্যবান মতামত দেয়। তবে আসর জমে যায়। ঘড়ির কাঁটা ১০টা পেরিয়ে গেলেও, কিসিকা কই পড়েশান নেহি। আজকাল এতো এপ বেড়িয়ে গেছে, ফেরার টাক্সি পেতে কয়ি পড়েশান হোতা হি নেহি।


সে যাইহোক,  গত সেশনে ঠিক হলো পুরনো কলকাতা ঘোরা হবে। নির্মাল্য কালীপ্রসন্ন সিংহের বাড়ীর কথা তুললো। পুরনো কলকাতা আমার হাতের তালুর মত চেনা। কিন্তু কালীপ্রসন্নর বাড়ীটা চিনতাম না। তাই আজ বেড়িয়ে পড়লাম ছানবিন করতে। জোঁড়াসাকো রামমন্দিরের উলটো দিকে বানারসি ঘোষ স্ট্রীটে।  খুব সহজেই পৌছনো গেল। সে বাড়ীর অতি জরাজীর্ণ অবস্থা। চারিদিকে বটবৃক্ষ জন্মে গেছে। ভেতরে কয়েকজন দখলদার আছে। ভেতরে ঢুকতে দিল,কিন্তু ছবি তুলতে দিল না। পুরো জোঁড়াসাকো অঞ্চলটাই অবাঙালী দখলে। এককালে বাঙালী সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু আজ বেদখল। বাঙালী যে আত্মবিস্মৃত জাতি, তাতে কোন সন্দেহ নেই। কালীপ্রসন্নর বাড়ীটা শুনেছি ফার্স্ট ক্লাস হেরিটেজ তকমা পাওয়া।  কিন্তু না বাড়ীর গায়ে আছে কোন Plaque  না কোন রক্ষণাবেক্ষণ।  কালীপ্রসন্ন সিংহ সম্মন্ধে আপনারা কমবেশি সবাই জানেন। তার উদ্যোগে ও অর্থানুকুল্যে মূল সংস্কৃত থেকে মহাভারতের বাংলায় অনুবাদ করা হয়। স্বয়ং বিদ্যাসাগর মহাশয় রাজী হয়েছিলেন সেই মহাভারতের সম্পাদনার ভার নিতে। কালীপ্রসন্ন সিংহ আরো এক কারণে বিখ্যাত।  তিনি লিখেছিলেন ' হুতোম পেঁচার নকশা'।  এক বিশেষ ধরণের গদ্যরীতির প্রচলন করেছিলেন।  কিন্তু মাত্র ২৯ বছর বয়সে তিনি মারা যান।

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের 'সেই সময়' মাষ্টারপিসে তার বিশেষ উল্লেখ আছে। উপন্যাসে তিনি নবীনকুমার। এক বর্ণময় চরিত্র। উপন্যাসে বিবৃত তার পিতৃবন্ধু বিধুশেখর তার জন্মদাতা পিতা। কারণ তার সামাজিক পিতার সময় কেটে যেত, রাঁড়ের বাড়ীতে। যা সেই সমাজের ধনাঢ্য ব্যক্তিদের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ছিল। ওটাই ছিল বাবুকালচার,  পায়রা  ওড়ানো আর গহরজান, নিকি বাঈজীদের পেছনে লাখ লাখ টাকা উড়ানো।

কালিপ্রাসন্ন সিংহের বাড়ী দেখা হয়ে গেলো। মিশন একোমপ্লিশড। এবার বিলে মানে বিবেকানন্দের বাড়ী বাঁয়ে রেখে এগিয়ে চলা, নকুড়ের দোকান পড়ল পথে, উপেক্ষা করলাম। হরিঘোষ স্ট্রীট পেরিয়ে এসে গেলাম শ এর তেলেভাজার দোকানে। মোটা মোটা ধোঁকা কিনলাম।  কাল ডালনা হবে। আপনারা কেউ ধোঁকা খেয়েছেন, সুন্দরীদের  কাছে? আমার সেই ধোঁকা খাওয়ার কোন মুহরতই তৈরী হয়নি। তাও কুন্তলা এখনও সন্দেহ করে। আরে বাবা, আগে যখন দেবদূতের মতো চেহারা ছিল, তখনই কিছু করিনি, আর এখন এক পা নিমতলায় রেখে কি প্রেম হয়? হ্যায় কোয়ি? 

যাকগে, এর ফাঁকে দেখি একদল সুন্দরী বসন্তের গান গাইতে গাইতে যাচ্ছে শোভাযাত্রা করে। দেখলাম কিছুক্ষণ।  ছবিও তুলেছি, দেব এরসাথে।


আমি এখন দর্জিপাড়ায় জয়ন্তের সাথে গল্প করছি। এক কানে জয়ন্তের কথা শুনছি, টুকটাক হ্যাঁ হুঁ করছি, আর এক আঙুলে, এক মনে আপনাদের জন্যে ভাটকথা লিখছি। তার মানে আমার মন দুটো ফিল্ডে কাজ করছে একইসময়ে। এটা আমার বিশেষ গুণ। অবশ্য এটা আয়ত্ব করতে দীর্ঘ সাধনার দরকার। দুহাত একসাথে কাজ করলে সে হয় সব্যসাচী আর আমার মন যে একসাথে দুজায়গায়, খেপ খাঁটে, আমি তাহলে কি? নিশ্চয় স্পেশাল কিছু????

Friday, 13 February 2026

হলং



কাল ছিল আমাদের ডুয়ার্স সফরের দ্বিতীয় দিন। এর আগে জলপাইগুড়িতে কোনদিন রাত্রিবাস করিনি। এবারও সে অপূর্ণতাও পূর্ণ হয়ে গেল। কারণ এবার নিউজলপাইগুড়ি থেকে আমাদের যাত্রার ট্রেন খুব সকালে। রাত্রিবাস জরুরী ছিল। স্টেশনের কাছেই হোটেল। ঝকঝকে  হোটেল। ননী কোন অপূর্ণতা রাখে নি। ওই রাত্রে তরুণ যখন চিতল মাছের পেটি খোঁজে, তখন বুঝে নিন, আথিতেয়তা কোন পর্য্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। 

সে সব যাই হোক, ওই সকালে সবাই স্নান সেরে আলুর পরোটা প্যাকেট নিয়ে উঠলুম ট্যুরিস্ট স্পেশাল ভিস্তাডোমে। চারিদিকে কাঁচ ঘেরা ট্রেন। ভিস্তাডোম। ভারী সুন্দর।  ছবি দিয়েছি কয়েকটা দেখবেন। বেশ লাগে এসব ট্রেনে সফর করতে। ট্রেন লাইনের দুপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে। সেই নিশ্চিন্তপুরের অপু, দুর্গারও ভালো লাগতো।  আমরা যারা এই যুগের, কেউ কেউ যারা আজো অপু রয়ে গেছি, তারাও আজো জানালার ধারে বসে এই ডুয়ার্সের নদী পাহাড় অরণ্য আজও অবাক বিস্ময়ে দেখেই চলে। অপুরা চিরকালই পৃথিবীতে রয়ে যায়। একসময় এই ভিস্তাডোম সফর শেষ হল। ট্রেন যেন তাজগী ঘোড়ার সওয়ার করে নিমেষে পৌঁছে দিল, মাদারীহাট স্টেশনে৷ মাদারীহাট, হলংএ ঢোকার সিংহদ্বারই বলা যায়।এবার তিনদনের মৌরসীপাট্টা আমাদের এই হলং ইকো রিসোর্টেই। কটেজ টাইপের বাড়ী। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।  আমাদের গুলতানি মারার আদর্শ জায়গা। তবে আমাদের কটেজের মালিক বিশ্বনাথদা৷ বিশ্বনাথবাবুর পরিচয় যদি এককথায় দিতেই হয়৷ তবে তার পরিচয় প্রেমিক আর বিপ্লবী।  বিপ্লব করতে করতে প্রেম। বিপ্লবের সর্বনাশ। প্রেমের জয়। আর কেই বা না চায় প্রেমের জয়, বলুন? আমিও তাই। আপনিও নিশ্চয় দলছাড়া হতে চাইবেন না৷ 


এক সময়ের নকশাল। সেই স্কুলের দশম ক্লাস থেকেই, গলায় ইন্টারন্যাশনাল, আর রবীন্দ্রনাথের, 'ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, মোদের বাঁধন ততই টুটবে" গলায় নিয়ে মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প। সেসব ছিল একদিন। তবে বিপ্লবের বারুঁদে ভেজাল ছিল। বেশীওপরে উঠতে পারেনি। কমদামি হাওয়াইয়ের মতো পপাতধরণীতলে হতে সময় লাগেনি মোটেই। আর প্রেমও তো ছিল অনেক। মঞ্জু,ডলি, মলি, জ্যোতিকণার দল। সবাই কিন্তু রুপসী কন্যা। প্রেমটা একতরফাই ছিল৷ মুখফুটে বলা হয়নিকো আর৷ বিপ্লব, প্রেম সবই শেষ।  এবার ফিরে আসুন জলদাপাড়ায়। শিং বেঁকানো গন্ডারের আড্ডায়৷ এখানে প্রেমের প্রবেশ নিষেধ।  বেশী ট্যাঁফোঁ করলে, গণ্ডারের গুতোয় এফোঁড ওফোঁড় হয়ে যাবার শঙ্কা৷ 

আপাতত প্রেমে ইতি দিয়ে চলুন, জঙ্গলে যাই। বন্যেরা বনে সুন্দরের খোঁজে। 


হলং রিসার্ভ ফরেস্ট৷ ১৮ জনের দল৷ মহিলাও বেশ কয়েকজন আছেন। ক্যাচোর ম্যাচর চলছেই সারাক্ষণ।  এদের নিয়েই জঙ্গলে।  হলংএ ননীর সাথে আগেও এসেছি। সেবার কপালে এক ভারী গরীব ধরণের গণ্ডার ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। তবে এবার ননীর কপাল একেবারে তুঙ্গে বৃহস্পতি।  জন্তু জানোয়ার আর পাখী, ময়ুরের মেলা। একটা দুটো নয়৷ দলে দলে আর পালে পালে৷ আর ময়ুরেরা  তো সারাক্ষণ পেখম মেলে আমাদের মনোরঞ্জন করেই চলল। বিশালাকায় হাতীর দল, ষণ্ডামার্কা সব শিং বেঁকানো শম্বরের দল, দৈতাকায় সব বাইসন বা গৌড়, যাই বলুন। দারুণ জমজমাট এক জাঙ্গল সাফারি হলো। 


কিন্তু আসল আড্ডা তো হবে ভর সন্ধ্যে বেলায়। হাম তুম আর ব্যাগপাইপার। ও কিছু নয়। একটু ক্যাটালিটিক এজেন্ট মাত্র৷ দু এক পেগ পেটে পড়লেই সব এক একজন আঁতেল মার্কা হয়ে ওঠেন। আর এই আড্ডাটার জন্যেই আমরা বারবার ফিরে আসি ননীগোপালের দলে। দুতিনঘন্টা নিমেষে কেটে যায়। ফরাসী বিপ্লব, নাজিম হিকমত, চে গুয়েভারা, সত্যজিত, সুনীল শক্তি আরো সব নামী অনামী হস্তীদের চুলচেরা বিশ্লেষণে৷ দারুণ জমজমাট আড্ডা। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললেও আড্ডা থামতে চায় না৷ দুপেগ তিনপেগের পড়ে আবার শুরু হয় অনুরোধের আসর। অনারের খেলা তখন৷ এ খেলা ননীর তৈরি আমরা তখন একে অন্যকে সম্মান জানায়,  খাদা দিয়ে নয় পেগ দিয়ে। এ খেলাও একসময়ে থেমে যায়। খালাসীটোলার আলোও  নিভে যায়। 

"তখন থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন। "

অথবা

।" ভ্রুপল্লবে যদি ডাক দিয়ে থাক, 

চন্দনবনে দেখা হতে পারে।"

আপনারাও আসুন। 

আজ আমরা বনে নয়, সবাই মিলে যাব চন্দনের বনে।

Monday, 2 February 2026

কোপাই

 শান্তিনিকেতনে এসে কোপাইয়ের সাথে দেখা না করে চলে যাব, এমনটি হয় নাকি? কোপাই পুর্বজন্মের প্রেমিকার মতো। বর্তমানের গভীরে এ যেন চিরন্তন।  


শীতের কোপাই শীর্ণা কিন্তু আলো ঝলমলে রুপসী।  উচ্ছল হয়তো নয়, কিন্তু শান্ত, গভীর। এতে অবগাহনে জন্মজন্মান্তর যেন পেরিয়ে আসা যায়। আজ এসেছি সেই কোপাইয়ের কাছে। কোপাইয়ের গভীরে হাত ছোঁয়ালাম, সারা শরীরমন জুড়ে যেন উৎসবমুখর হয়ে এলো। ঠিক চিনেছে আমাকে। 

 "জনম জনম হাম রুপ নিহারুলু, নয়ন না তিরপিত ভেল।"

Sunday, 1 February 2026





















আজ বিষ্ণুপুর যাবার পথে বনলতা রিসোর্টে দুপুরের খাওয়া সারলুম।বনলতা রিসোর্ট একটা অসাধারণ ছুটি কাটাবার জায়গা। চমৎকার কটেজ, রুম,  হাতী, ঘোড়া, পুকুরের মাছ, গাইয়ের দুধ কি নেই? মাছ ধরার ব্যবস্থা,  সব সব ব্যবস্থাই আছে। এদের রিসোর্টে  বারও আছে। দেখে তো আমি চমৎকৃত।  ননীকে অনেকবার বলেছিলাম। বন্ধুসঙ্গে গুষ্টিসুখে দিন কাটাবার এক উৎকৃষ্ট জায়গা। গা করেনি। ওর যত ঝোঁক উত্তরেই। কপালগুণে, আজ দেখা হয়ে গেল।খানাও হলো। দারুণ একখানা লাঞ্চ। তবে বারে পা গলানো আজ বারণ। কারণ আজ আমার অকারন এর দিন। এক হোলিপ্লেসে আছি। সেখানে মদ্যপান?  নৈব্য নৈব্য চ।


তাহলে শুনুন আজ কি কি খেলুম। খাবো খাবো করি। কিন্তু খাবারের গপ্প শুনেই দিলখুস হয়ে যায়। দুইয়ের বদলে তিনপদ হয়ে গেলেই আর ভেতরে যেতে চায়না। তবে আজ সব খেয়েছি। এদের একটা বেসিক থালি আছে। তার মূল্য মাত্র ১০০/। যাচাই অর্থাৎ আপনি যতবার রিফিলিং চাইবেন করে যাবে। কথাটি কইবে না। আজ ছিল উচ্ছে ভাজা, দুধসুক্তো (অসাধারণ),  আলুপোস্ত লা জবাব জাস্ট আমি যেমনটি চাই, সোনা মুগের ডাল, পরমান্ন, আর চাটনি টমেটোর। এর সাথে আমরা নিয়েছিলাম কাতলা কালিয়া। ব্যস। এতেই আই ঢাই অবস্থা। এরপর জয়পুরের জঙ্গল পেরিয়ে বিষ্ণুপুর।  এর আগে বিষ্ণুপুর বহুবার এসেছি। তখন আসতাম বিষ্ণুপুর সিল্ক আর তসর নিতে। ব্যাওসার কাজে। আমার না তেনার। সে যাই হোক, মন্দির তখনও দেখেছি, আজও দেখলাম। মন্দিরগুলো সংরক্ষণ খুব উঁচুদরের। মন্দিরের ছবি দিলাম অনেকগুলো।সবার নাম মনে নেই। যে কটা পারলাম, নাম দিয়ে দিলাম। 

আর কি আবার ফিরে সেই জয়রামবাটি তেই।  ফেরার পথে সেই বনলতার একফুটি ল্যাংচা আর পাটিসাপটা, সেও একফুটের কম নয়। খেতে পারিনি।  নিয়ে এসেছি।

আজ আপাতত এই। শেষে ভেবে দেখলাম এই তীর্থদর্শন সফল করার ফল তবে কি? শুধুই ভোগের বর্ণনা? কভি নেহি? রঙ দে মোহে গেরুয়া। তাই একটা গেরুয়া টুপি কিনে নিয়ে পরলাম। কিন্তু বৈরাগ্য সাধনে মুক্তি, সে আমার নয়।  কুন্তলার প্রবল আপত্তিতে আর পাবলিক প্যাঁকের ভয়ে মাঝামাঝি একটা না গেরুয়া না হলদে এক টুপিতে কম্প্রোমাইজ করলাম। সেই যে ঠাকুরের কি একটা গান আছে না, 

"ঘরে যারা যাবার , তারা কখন গেছে ঘরপানে,

পারে যারা যাবার গেছে পারে,

ঘরেও নহে, পারেও নহে যে জন আছে মাঝখানে,

সন্ধ্যেবেলা কে ডেকে নেয় তারে।"

আমি সেই মাঝের জন। আমার ঠাকুর সেই রবি ঠাকুরই। 

Tuesday, 20 January 2026

দা'ঠাকুর






আমার ছোটবেলা


আজ ফেলে আসা দিনগুলোর কথা বড় মনে পড়ে। আমার শহর,আমার মা, আমার বাবা, আমার ভাই-বোনেরা, বন্ধুরা। ফেলে আসা ছোটবেলার বন্ধুদের কথা স্পষ্ট মনের পর্দাই ভেসে ওঠে। একেবারে জীবন্ত যেন কালকের দেখা ঘটনা। হাত বাড়ালেই যেন ছোঁওয়া যাবে।কিন্তু তা তো নয় তাদের অনেকেই যে আজ অজানলোকের বাসিন্দা। হাজারো ডাক, হাজারো হাহাকারেও তারা স্তব্দ হয়েই থাকবে। দেয়ালে টাঙানো ছবির মতই। 

আমার শহরের নাম অনেকেই জানেন মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জ।জঙ্গিপুর মহকুমার সদরশহর। আমার স্মৃতিতে একটা ছোট্ট সুন্দর সাজানো শহর। কোর্ট কাছারী,স্কুল কলেজ,অফিসপত্র সবই ভাগীরথির এইপারে অর্থাৎ রঘুনাথগঞ্জে আর ওপারে জঙ্গীপুর শহর। ধারে ভারে জঙ্গিপুর কিন্তু এইপারের রঘুনাথগঞ্জের তুলনায় অনেক ছোট আর গুরুত্বহীন। তবে জঙ্গিপুর কলেজ কিন্তু জঙ্গিপুরেই। আমার দাদা,দিদিরা সবাই এই কলেজেই পড়ত। তখন পারাপারের একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। সদরঘাটের খেয়া পার হয়ে যেত হত ওপারের জঙ্গীপুর কলেজে।

এইখানেই আমার জন্ম কোন এক বৈশাখের পঁচিশে।তারিখটা নিশ্চয় চেনা চেনা লাগছে।সত্যি বলতে জীবনে এই একটা কাজই করেছি। পঁচিশের দড়ি ধরে ঝুলে পরতে পেরেছি। তাই তো সারাজীবন একটা পদ্যও না লিখে কেমন কবিগুরুর সঙ্গে ঝুলে রয়েছি।তবে কবিতা যে একেবারের লিখিনি তা তো নয়। প্রথম যখন একটা সুন্দরী কিশোরী মনের মধ্যে তোলপাড় তুলল তখন লিখেই ফেলেছিলাম। সে অবশ্য একটু বড়কাল মানে সদ্য গোঁফ ওঠা বয়সের কথা। এ বয়সে ছেলেরা একটু এঁচোড়ে পাকা হয়। আমিও বাদ যাইনি। তো এসব কথা পরে আসবেখন। এখন শুনুন আমার ছোটবেলার ছোট কথা আর ছোট্ট শহর  রঘুনাথগঞ্জের কথা।আমাদের শহর বড় সুন্দর। ছোট্ট কিন্তু ঝকঝকে তকতকে। এখনকার মত এত আবর্জনার রমরমা তখন দেখিনি। ময়লা না ছিল বাইরে না সেইসময়ের মানুষের মনের মধ্যে। আজ যখন সেইসময়ের মানুষদের কথা ভাবি, তাদেরকে যেন মনে হয় রুপকথার চরিত্র সব। এখনকার মানুষদের মত এত বিবর্ণ বা স্বার্থপর নয়। 

এত সব ভাবতে ভাবতে বিষয় থেকে কখন গেছি সরে। যা বলছিলাম রঘুনাথগঞ্জ ভারী সুন্দর শহর। ভাগীরথির নদী বয়ে গেছে এর পাশ দিয়ে।এখানে আরো একটা ছোট নদী আছে, খড়খড়ী তার নাম। সে নদীতেও অনেক মাছ।ত্রিদিব মন্ডল প্রায়ই সেই সব মাছের ছবি দেয় ফেবুতে।দেখেছেন নিশ্চয়। একপাশে রঘুনাথগঞ্জ আর অন্যপারে জঙ্গীপুর।A tale of two cities এর মত ব্যাপার। একে অন্যের পরিপূরক।ভারী মৃদুছন্দে বয়ে চলা জীবন। কোন ব্যস্ততা নেই। সবাই সবাইকে চেনে।তারা হয় কাকা,জ্যাঠা, দাদা, দিদি এইরকম আর কি। সবাই সবাইয়ের সাথে আত্মীয়তার ছন্দে বাধা। আমার তো অনেকটা Malgudi Days মত লাগে। আসলে আমাদের সবারই মালগুড়ী ডেস কোথাও না কোথাও আছে। সবার হয়ত মনে থাকে না। আমার থেকেই গেছে। কারণ আমি তো বড় হয়নি,সত্যিই হয়নি। ছোটই থেকে গেছি। সে যাইহোক আমার ছোট্ট শহরে কয়েকটা মাত্র পাড়া ছিল, খুব কাছাকাছি,ঘেষাঘেষী করে গুষ্ঠিসুখের ওম নিত সবাই। ওম কি জানেন না? এটা বোঝান খুব মুস্কিল নয়। আমার সাথে যদি আপনার দেখা হয় তাহলে ঠিক জেনে যাবেন।এবার শুনুন আমাদের পাড়াগুলোর নাম। আমাদের বাড়ী এখনও আছে ফাঁসীতলায়,(শুনে ভয় পাবেন না, আমরা অতি সজ্জন লোক, কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো আমাদের কম্ম নয়, সেসব হয়েছিল বৃটিশ আমলে,গোরা সাহেবরা কাকে ফাঁসি দিয়েচিল, সেইথেকেই এই নাম),পাকুড়তলা,সেখানে এখনো একটা পাকুড় গাছ আছে বা রয়েই গিয়েছে সেই স্বাধীনতার আগে থেকেই,বাজারপাড়া, দরবেশ পাড়া, ফুলতলা, সদরঘাট,ম্যাকেঞ্জী পার্ক,বালিঘাটা আরো কিছু। শরৎ পন্ডিত মশাই কে মনে আছে নিশ্চয়, আরে দা’ঠাকুর।যার পন্ডিত প্রেস আজও আছে, আরে যেখান থেকে ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ আজও বেরোয়।শরৎ পন্ডিতের নামে দাদাঠাকুর সিনেমা হয়েছিল। ছবি বিশ্বাস করেছিলেন। তো দা'ঠাকুর ছিলেন আমার দুই বন্ধু রবি আর অনুত্তমের দাদু। আমি তো প্রায়ই তার বিছানার পাশে বসে তার সঙ্গে গল্প করতাম। উনি যে এত নামকরা লোক তখন কি আর জানতাম, তবে তিনি নজরুলের কথা সুভাষের কথা অনেক বলতেন। এদের বাড়ীর কেউই কিন্ত জুতো বা চটী পরতেন না। জানিনা, সে রেওয়াজ এখন চালু আছে কিনা? জঙ্গিপুরের আর একজনকে অবশ্য অনেকেই চিনবে, যদি সত্যজিতের সোনার কেল্লা দেখা থাকেন। তাতে ফেলুদার মুখে শুনবেন “এ তো আর জঙ্গীপুরের হরিশ পোদ্দার নয়, যে লাখ দু'লাখ ফেলে দেবেন।“ 

মুশকিল হল, রঘুনাথগঞ্জে সবাই সবাইকে চেনে, তাই কোনও অপকর্ম করে নজর এড়িয়ে যাওয়া খুব মুশকিল ছিল। একবার আমার ছোটবেলায় টিউশন ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলী সিনেমা দেখেছিলাম। শাম্মী কাপুর আর সায়রা বানুর ছবি, তখনকার দিনের খুব বিখ্যাত ছবি।কাকা,জ্যেঠাদের চোখ এড়াতে পারি নি। ঠিক ধরা পরে গেলাম।অবশ্য তাতে ক্ষতি বিশেষ হয় নি। আমার ছোটকাকা আমাকে রিক্সা করে ছায়াবাণী সিনেমা হল থেকে নিয়ে গিয়েছিল।বাবার কানে তোলে নি, তুললে চড়চাপাটি পরত নির্ঘাত।এ কথায় সেকথায় বড় দিকভ্রান্ত হয়ে পরছি। গুছিয়ে বলা হচ্ছে না কিছুই। তাই এবার শুরুর শুরু করি। তবে শুরুতে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমি বোধহয় আমার ছোট বয়সে একটু সুদর্শনই ছিলাম।আমার বয়স তখন মাত্র ৮। আমার পাড়ার এক কাকার ইচ্ছে ছিল বড় হলে তার মেয়ে পাঞ্চালীর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার। শুনে কী আনন্দই না হয়েছিল। তাই শুনে ডগমগ হয়ে বাড়ীতে ফিরেই পাউডার মেখে আমার সেই অপরুপ মুখ আয়নায় দেখে নিজেই চমৎকৃত হয়েছিলাম। দীপকের মত ছবি আঁকতে জানলে সে ছবি আপনাদের দেখাতে পারতুম। তবে সে ছবি আমার মনের মণিকোঠায় জমা আছে আজও। পাঞ্চালীর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কী জানি তাকে কোন অর্জুন নিয়ে গেছে জয় করে ।

আপনমনে



 আজ বহুদিন পরে কাঁকুড়গাছির যোগোদ্যানে ঢুকে পড়েছিলাম। অনেকটা ঘটনাচক্রেই। আমাদের আড্ডা মারার জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। এখন একমাস ধরে বড়পার্কে চলবে সুভাষমেলা। সুতরাং, আমরা এখন ঠাঁইহারা। বসার জায়গা নেই। উদ্দেশ্যবিহীন হেঁটেই চলেছি। আর আমার এই চলার পথেই রামকৃষ্ণ মিশনের যোগোদ্যান। রামকৃষ্ণ ভক্তদের কাছে যোগোদ্যান খুবই উল্লেখযোগ্য জায়গা। আগে এই অঞ্চলে প্রচুর বাগান ছিল। আজ যেটা যোগোদ্যান, সেটাই ছিল রামবাবুর বাগান। রামকৃষ্ণ দেব প্রায়ই এখানে আসতেন। বিবেকানন্দও বহুবার এসেছেন।


আগে আমিও প্রায়ই আসতাম। ভক্তিরসে জাড়িত হয়ে নয়। জিলিপির রস আমাকে টেনে আনত। এখানে আরতির পর প্রসাদে জিলিপি দেওয়া হয়। এব্যাপারে রামকৃষ্ণ দেবের সাথে আমার বহুত মিল। দুজনেই জিলিপির ভক্ত। কিন্তু সে ভক্তির খেসারত আমাকে দিতে হয়েছিল দস্তুরমতো।  চড়চড় করে সুগার স্পাইক করে গিয়েছিল। বহুকষ্টে বহুব্যয়ে মধুমেহ শেষে পোষ মানে। 

আজ বহুদিন পরে, ঢুকে পড়লাম। চারিদিকে ভক্তের দল। সবাই ভক্তিরসে টইটম্বুর। আমিই এই বেরসিক বসে রইলাম এই ভক্ত দলের মাঝে। ভক্তি আমাকে মোটেই টানে না। আর ভারতীয় গুরুবাদে ভক্তি মানেই কমপ্লিট সারেন্ডার। ও আমার মোটেই হবার নয়। আমি নজরুলের 'শির নেহারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির' টাইপের। মেরে ফেললেও নাড়া বাঁধব না কোন গুরুর কাছে। সে তিনি রামকৃষ্ণ হন, চাই তৈলঙ্গস্বামীই। 

তবে আজ বেশ কিছু গান শুনলাম আরতির পরেই। গাইলেন শ্যামপ্রিয়ানন্দ বলে এক মহারাজ। সবই ভক্তিগীতি।  কিন্তু গাইলেন পুরো কালোয়াতি ঢঙে। গলার কি গমক আর কাজ। পুরো এক ঘন্টা বসে রইলাম। সঙ্গীত এক আশ্চর্য জিনিষ।  আমার মতো ন্যাড়াকেও বারবার বেলতলায় টেনে আনে। জাস্ট মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। 


শেষমেষ কি হলো? প্রসাদের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লুম। হাতে পড়লো, হাতে গরম জিলিপি। না, তার অমর্যাদা করিনি। ভক্তি সহকারে সে জিলিপির রসাস্বাদন করলুম। ভক্তি নাই বা থাকুক, জিলিপির ভক্ত হতে বারণ তো কেউ করেনি।