Thursday, 2 July 2026

ডিমের মিহিদানা

 ডিমের মিহিদানা 


কেউ শুনেছেন? আমি তো দুদিন আগেও এর কোন নাম শুনিনি। কিন্তু শুনতেই হলো।


ডিম শুনেছি, মিহিদানার সাথেও বেশ মাখামাখি সেই ছোটবেলা থেকেই।  কিন্তু এইরকম যে কিছু হতে পারে, তা আমার জানাশোনার বাইরে ছিল।

আমাদের ছোটোবেলায় ডিম সে একটা মহার্ঘ্য ব্যাপার ছিল। আসলে তখন তো এতো পোল্ট্রিও হয়নি। তাই ডিমের জোগান ছিল বেশ বেশ কম। মুরগির ডিম তখনো হিন্দুবাড়িতে নিষিদ্ধই ছিল। 

আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাড়ীতে ছিল কাজের মাসী চিন্তা আর তার বর ভরত, সে ছিল জলের ভারী। মিউনিসিপালিটির কল থেকে আমাদের খাবার জলের যোগান দিত। চিন্তার বাড়ি ছিল মাল পাড়ায়, আমাদের ফাঁসিপাড়ার বাড়ীর খুব কাছেই। তার দুদশটা হাঁস ছিল। সেই হাঁসের ডিম আমাদের দিত মাঝে মাঝে , সেদিন মনে হত খুব স্পেশাল একটা দিন। তবে সুতোয় কাঁটা হাফ ডিমই ছিল বরাদ্দ। তাই খেতাম তারিয়ে তারিয়ে, কুসুম ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কুসুমকে নিয়েই কেটে যেত বহুক্ষন। মানে খাওয়ার শেষে কুসুমে কুসুমে কুসুমময়। স্বাদটা বহুক্ষণ ধরে রাখতাম। আসলে সেইসময়কার মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতীক ছিল এই হাফ ডিমের গপ্প। আমাদের প্রজন্মের সবাই এই হাফ ডিম সমাজ থেকেই উঠে আসা। তবে সেই ডিম কিন্তু আজকের ডিমের থেকে অনেক আলাদা। দেশী হাঁসের নীলাভ ডিম, হোক হাফ তবু তার স্বাদ, আজও মনে গেঁথে আছে আর সেই যৌথ পরিবারের সুখী সুখী ছবিটাও বড় স্পষ্ট। সে ছিল বড় বড় সুখ আর ছোট ছোট দুঃখের দিন। 

আমার পিসি থাকতেন বহরমপুরের রাধারঘাটে। বেশ অবস্থাপন্ন। সেই সব দিনে যখন মোটরগাড়ি ছিল খুব হাতেগোনা তখন পিসির ঝা চকচকে গাড়ী। বহরমপুর থেকে প্রায়ই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চলে আসতেন। পিসির আসাটা ছিল এক উৎসব।  যে কদিন থাকতেন যেন দুগগা পূজোর আমেজ মাখা। পিসি আমার ডিম প্রীতির কথা জেনে করে দিলেন গোটা গোটা ডিমের ডালনা। এর পরে আর কি কোন কথা থাকতে পারে? ডিম পর্বের এখানেই শেষ। 


এবার আসি মিহিদানায়। দুএকবার খেয়েছি ঠিকই। কিন্তু কোনদিনই খুব ভালো লেগেছে বলে মনে পড়েনা। ট্রেনে যাওয়ার পথে বর্ধমান ষ্টেশনে দেখতাম খুব মিহিদানা আর সীতাভোগ বিক্রি করত। মিহিদানা আর সীতাভোগের সাথে আমার নিবিড় পরিচয় এই বর্ধমানেই।  বর্ধমানের ব্র‍্যাণ্ড এমবাসাডর কিন্তু এখনো এই মিহিদানা আর সীতাভোগ।  আর এই স্পেশালিটি মিষ্টির এক নম্বর দোকান গণেশের দোকান। আগে কার্জন গেটের অনেক ভেতরে ছিল গণেশের দোকান।  এখন বড় রাস্তায় তিনকোনিয়া বাস স্ট্যান্ডের কাছে বিরাট দোকান করেছে। রমরমে ব্যাবসা। লোকের যতই সুগার হোক, এর চাহিদা বেড়েছে বই কমেনি।

তবে আমার কিন্তু সীতাভোগই বেশী পছন্দের। তাও বর্ধমানের নয়, এই কলকাতারই। আমি তিনবছর স্টেট ব্যাঙ্কের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির চার্জে ছিলুম।সেই সময় বহুগুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম।  সুরঞ্জন দাস, চিন্ময় গুহ আরো বহু বহু জনের। এদের সাথে আজ আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু পুঁটিরামের সীতাভোগের সাথে আজও আমার অন্তরঙ্গ যোগাযোগ রয়ে গেছে। সেরা সীতাভোগ অবশ্যই কলেজ স্কোয়ারের পুঁটিরামের দোকানের। পেতে পারেন যদি সকাল সকাল যান। খুব চাহিদা,  আস্তে না আসতেই উধাও হয়ে যায়।


ডিম হলো, মিহিদানাও হলো। সীতাভোগও পরিবেশন করলাম অতিরিক্ত।  এবার তাহলে তৈরি থাকুন ডিমের মিহিদানার জন্যে। এটা বাংলাদেশী রেসিপি৷ এই বাংলায় এই পদের পদকর্তা আমার কন্যাসমা রাধিকা,শ্যালিকা কন্যা।  যা আমাদেরও বিনোদিত করছে কখনো কখনো । দারুণ লাগলো খেতে।  সাধারণ মিহিদানা নয়। মিষ্টি মিষ্টি ডিম ডিম। It’s different. সঙ্গে ডিমের মিহিদানা তৈরির ভিডিও দেখে নিন ইউ টিউবে। মেয়ে বা বউমাকে বলুন একদিন তৈরি করে খাওয়াবে। ভাল লাগলে রাধিকাকে ধন্যবাদ দেবেন। না লাগলে চেপে যান।😁

Monday, 22 June 2026

আমার ছোটবেলা

 আমার ছোটবেলা


জীবনের যে পর্যায়ে পড়ে আছি, সেটা শুধুই স্মৃতি রোমন্থনের সময়। এখন অবশ্য আগের মতো নয়। এই সোশ্যাল মিডিয়ার দৌলতে আমার মতো যাদের বয়স বেড়ে  গেছে, তারাও যথেষ্ট স্মার্ট আর সক্রিয়ও। ঘোরাফেরা,  বন্ধুবান্ধবী কোন ব্যাপারেই তারা আগেকার দিনের বুড়োদের মতন আনস্মার্ট নয়। তবুও আসে একটা সময়, যখন ফেলে আসা দিনগুলো কড়া নেড়ে নেড়ে জানান দিয়ে যায়। আমরাও ছিলাম তোমার জীবনের শুরুর দিনগুলোতে।

আসলে আমি মানুষ হিসেবে খুব সেনসুয়াল। তাই পুরনো দিনের যাপন আজও আমার মনে নাড়া দিয়ে যায়।

আমার শহর,আমার মা, আমার বাবা, আমার ভাই-বোনেরা, বন্ধুরা। ফেলে আসা ছোটবেলার বন্ধুদের কথা স্পষ্ট মনের পর্দাই ভেসে ওঠে। একেবারেই জীবন্ত যেন কালকের দেখা ঘটনা। হাত বাড়ালেই যেন ছোঁওয়া যাবে।কিন্তু তা তো নয় তাদের অনেকেই যে আজ অজানালোকের বাসিন্দা। হাজারো ডাক, হাজারো হাহাকারেও তারা স্তব্দ হয়েই থাকবে। দেয়ালে টাঙানো ছবির মতই। 


আমার শহরের নাম অনেকেই জানেন মুর্শিদাবাদ জেলার রঘুনাথগঞ্জ।জঙ্গিপুর মহকুমার সদরশহর। আমার স্মৃতিতে একটা ছোট্ট সুন্দর সাজানো শহর। কোর্ট কাছারী,স্কুল কলেজ,অফিসপত্র সবই ভাগীরথির এইপারে অর্থাৎ রঘুনাথগঞ্জে আর ওপারে জঙ্গীপুর শহর। ধারে ভারে জঙ্গিপুর কিন্তু এইপারের রঘুনাথগঞ্জের তুলনায় অনেক ছোট আর গুরুত্বহীন। তবে জঙ্গিপুর কলেজ কিন্তু জঙ্গিপুরেই। আমার দাদা,দিদিরা সবাই এই কলেজেই পড়ত। তখন পারাপারের একমাত্র বাহন ছিল নৌকা। সদরঘাটের খেয়া পার হয়ে যেত হত ওপারের জঙ্গীপুর কলেজে।


এইখানেই আমার জন্ম কোন এক বৈশাখের পঁচিশে।তারিখটা নিশ্চয় চেনা চেনা লাগছে।সত্যি বলতে জীবনে এই একটাই আমার প্রাপ্তি। পঁচিশের দড়ি ধরে ঝুলে পড়া। তাই তো সারাজীবন একটা পদ্যও না লিখে কেমন কবিগুরুর সঙ্গে ঝুলে রয়েছি।তবে কবিতা যে একেবারের লিখিনি তা তো নয়। প্রথম যখন একটা সুন্দরী কিশোরী মনের মধ্যে তোলপাড় তুলতো তখন লিখেই ফেলেছিলাম, ' মঞ্জু তোমাকেই'। নেহাৎ মন্দ হয়নি। সেই কবিতা আর কবিতার মঞ্জু আজও রয়ে গেছে ষোড়শী রুপে আমার মনের গভীরে। সে অবশ্য একটু বড়কাল মানে সদ্য গোঁফ ওঠা বয়সের কথা। এ বয়সে ছেলেরা একটু এঁচোড়ে পাকা হয়। আমিও বাদ যাইনি। তো এসব কথা পরে আসবেখন। এখন শুনুন আমার ছোটবেলার ছোট কথা আর ছোট্ট শহর  রঘুনাথগঞ্জের কথা।আমাদের শহর ছিল বড় সুন্দর। ছোট্ট কিন্তু ঝকঝকে তকতকে। এখনকার মত এত আবর্জনার রমরমা তখন দেখিনি। ময়লা না ছিল বাইরে না সেইসময়ের মানুষের মনের মধ্যে। আজ যখন সেইসময়ের মানুষদের কথা ভাবি, তাদেরকে মনে হয় সব রুপকথার চরিত্র। এখনকার মানুষদের মত এত বিবর্ণ বা স্বার্থপর নয়। 


এত সব ভাবতে ভাবতে বিষয় থেকে কখন গেছি সরে। যা বলছিলাম রঘুনাথগঞ্জ ভারী সুন্দর শহর। ভাগীরথি নদী বয়ে গেছে এর পাশ দিয়ে।এখানে আরো একটা ছোট নদী আছে, খড়খড়ী তার নাম। সে নদীতেও অনেক মাছ। ছোট্ট নদী কিন্তু বড় সুন্দর।


আসল নদী কিন্তু ভাগীরথী। ফরাক্কা থেকে ধুলিয়ান, নিমতিতা হয়ে মিশে গেছে সাগরে। তার একপাশে রঘুনাথগঞ্জ আর অন্যপারে জঙ্গীপুর।A tale of two cities এর মত ব্যাপার। একে অন্যের পরিপূরক।ভারী মৃদুছন্দে বয়ে চলা জীবন। কোন ব্যস্ততা নেই। সবাই সবাইকে চেনে।তারা হয় কাকা,জ্যাঠা, দাদা, দিদি এইরকম আর কি। সবাই সবাইয়ের সাথে আত্মীয়তার সুরে বাধা। আমার তো অনেকটা Malgudi Days মতই মনে হয়। আসলে আমাদের সবারই মালগুড়ী ডেস কোথাও না কোথাও আছে। সবার হয়ত মনে থাকে না। আমার থেকে গেছে। কারণ আমি তো বড় হয়নি,সত্যিই হয়নি। ছোটই থেকে গেছি। 


আমাদের ছোট্ট শহরে কয়েকটা মাত্র পাড়া ছিল, খুব কাছাকাছি,ঘেষাঘেষি করে, গুষ্ঠিসুখের ওম নিত সবাই। এবার শুনুন আমাদের পাড়াগুলোর নাম। আমাদের বাড়ী এখনও আছে ফাঁসীতলায়,(শুনে ভয় পাবেন না, আমরা অতি সজ্জন লোক, কাউকে ফাঁসিতে ঝোলানো আমাদের কম্ম নয়, সেসব হয়েছিল বৃটিশ আমলে,গোরা সাহেবরা কাকে ফাঁসি দিয়েছিল, সেইথেকেই এই নাম),পাঁকুড়তলা,সেখানে এখনো একটা পাঁকুড় গাছ আছে বা রয়েই গিয়েছে সেই স্বাধীনতার আগে থেকেই,বাজারপাড়া, দরবেশ পাড়া, ফুলতলা, সদরঘাট,ম্যাকেঞ্জী পার্ক,বালিঘাটা আরো কিছু। শরৎ পন্ডিত মশাইকে মনে আছে নিশ্চয়, আরে দাদাঠাকুর।যার পন্ডিত প্রেস আজও আছে, আর সেখান থেকে ‘জঙ্গীপুর সংবাদ’ আজও বেরোয়।শরৎ পন্ডিতের জীবন নিয়ে দাদাঠাকুর সিনেমা হয়েছিল। ছবি বিশ্বাস করেছিলেন। তো দাদাঠাকুর ছিলেন আমার দুই বন্ধু রবি আর অনুত্তমের দাদু। আমি তো প্রায়ই তার বিছানার পাশে বসে তার সঙ্গে গল্প করতাম। উনি যে এত নামকরা লোক তখন কি আর জানতাম, তবে তিনি নজরুলের কথা, সুভাষের কথা,  পুরনো দিনের অনেক কথা বলতেন। তারা সব সেইসময়ের ইয়া ইয়া লোক। দাদাঠাকুরের অবারিত সমাদর ছিল, এদের আড্ডায়।

দাদাঠাকুরের বাড়ীর কেউই কিন্ত জুতো বা চটী পরতেন না। খালি পায়ে হাঁটতেন সেই সময়ে। রবি আর অনুত্তমকেও দেখেছি খালি পায়ে স্কুলে আসতে। জানিনা, আজ নিশ্চয় সেই রেওয়াজ আর চালু নেই।


জঙ্গিপুরের আর একজনকে আপনারা চিনবেন।  বিখ্যাত ধনী হরিশ পোদ্দার।  অবশ্য অনেকেই তার নাম শুনে থাকবেন যদি সত্যজিত রায়ের ''সোনার কেল্লা' দেখে থাকেন। তাতে ফেলুদার মুখে একটা সংলাপ আছে “এ তো আর জঙ্গীপুরের হরিশ পোদ্দার নয়, যে কথায় কথায় লাখ দু'লাখ ফেলে দেবে“ 


মুশকিল হল, রঘুনাথগঞ্জে অন্তত আমাদের কালে, সবাই সবাইকে চিনতেন, তাই কিছুটা ভয়ও কাজ করতো। কোনও বদমায়েশি  করে নজর এড়িয়ে যাওয়া খুব মুশকিল ছিল।


মনে আছে, একবার আমার ছোটবেলায় টিউশন ফাঁকি দিয়ে জঙ্গলী সিনেমা দেখতে গিয়েছিলাম। তখনকার দিনের খুব সাড়া জাগানো সিনেমা। সায়রা বানুর প্রথম ছবি। শাম্মী কাপুর নায়ক।  ভয়ে ভয়ে বেড়িয়েছি হল থেকে। কেউ যদি দেখে ফেলে, কপালে কষ্ট আছে। 

ছোটকাকার কাছে ঠিকই ধরা পরে গেলাম।অবশ্য তাতে ক্ষতি বিশেষ হয় নি। আমার ছোটকাকা আমাকে রিক্সা করে ছায়াবাণী সিনেমা হল থেকে নিয়ে গিয়েছিল।বাবার কানে তোলে নি, তুললে চড়চাপাটি পরত নির্ঘাত।


এ কথায় সেকথায় বড় দিকভ্রান্ত হয়ে পরছি। গুছিয়ে বলা হচ্ছে না কিছুই। তাই এবার শুরুর শুরু করি। তবে শুরুতে একটা কথা বলতে ইচ্ছে করছে। আমি বোধহয় আমার ছোট বয়সে একটু সুদর্শনই ছিলাম।আমার বয়স তখন মাত্র ৮। আমার পাড়ার এক কাকার ইচ্ছে ছিল বড় হলে তার মেয়ে পাঞ্চালীর সঙ্গে আমার বিয়ে দেবার। শুনে সেই বয়সেই কী আনন্দই না হয়েছিল। তাই শুনে ডগমগ হয়ে বাড়ীতে ফিরেই পাউডার মেখে আমার সেই অপরুপ মুখ আয়নায় দেখে নিজেই চমৎকৃত হয়েছিলাম। ছবি আঁকতে জানলে সে ছবি আপনাদের দেখাতে পারতুম। তবে সে ছবি আমার মনের মণিকোঠায় জমা আছে আজও। আর কিশোরী পাঞ্চালীরও।  


তারপর জীবন গিয়েছে চলে কুড়ি কুড়ি বছরের পার। পাঞ্চালীর সঙ্গে আর দেখা হয়নি। কী জানি কোন অর্জুন তাকে জয় করে  নিয়ে গেছে।

Thursday, 28 May 2026

জামাইষষ্ঠী




 বেলাশেষে জামাইষষ্ঠী 


কাল গেছে জামাইষষ্ঠী।  প্রতিবারেই আসে আবার চলেও যায়। শ্বশুর বাড়ী থেকে ডাক পড়ে নি কোনদিনই। তাদের নাকি নেই ওইসব। কি জানি কোন মগের দেশে বিয়ে হয়েছিল। অদ্ভুত সব নিয়ম।  জামাই ষষ্ঠী নেই,ভাঁইফোটা নেই। কি অদ্ভুত না? এরা অবশ্য নিজেদের বাঙালী বলে দাবী করে না। বলে তেনারা নাকি বাঙাল। বাঙালির একদম উল্টো মেরুর মানুষজন।  আসলে কোন ছোটবেলায় বে হয়েছে, বুঝতেই পারিনি কি হচ্ছে, হচ্ছেই বা কোন মগের মুল্লুকে। বুঝলে কি আর ওমুখো হতুম? তবে যাই বলিনা কেন, আমার শ্বশুর,শ্বাশুড়ি ভারী ভালোমানুষ ছিলেন। অযাচিত স্নেহবর্ষণ করে গেছেন জীবনভোর।  আর জামাইষষ্ঠী নিয়ে একটা আফসোস থেকে গেলেও তা পুষিয়ে দিয়ে গেছেন কিন্তু ষোল আনায় নয় আঠারো আনায়। আর এখন তো শ্বশুর শ্বাশুড়ি দুজনেই প্রয়াত। তাই সেই ডাক পাবার আশা, ভরসা গেছে টুঁটে।


কাল গেছে এক বিস্ময়কর দিন। বেলাশেষের মরসুম যাচ্ছে। করোনায় আপন করে নেয়, না আমfun আমায় নিয়ে লোফালুফি খেলে তাই নিয়েই ত্রস্ত থাকি। 

এসময় ওপর থেকে ডাক! না না সে ওপর নয়, ওপরের ফ্ল্যাটে ছোট শ্যালিকার দুই সুপুত্রী,রাধিকা আর রুকমিনীর কাছ থেকে জরুরী তলব। যেতে হবে, ভারী জরুরী কাজ। 


 গিয়ে তো বিস্ময়ে শিবনেত্র অবস্থা। আজ নাকি আমাদের জামাইষষ্ঠী।  এ কি বিস্ময় জাগে প্রাণে। শ্বশুর শ্বাশুড়ি বেঁচে থাকতে হলোনি। আজ বেলাশেষে এ কোন আমন্ত্রণ?  ভারী মজবুত আর দমদার বন্দোবস্ত। জামাইষষ্ঠীর কেক,গ্লাসভর্তি সোনালী পানীয় আর আরসালানের বিরিয়ানি। কাল যেন আসমান থেকে খোদার রহমৎ ঝরে পড়ল। ওই যে কথায় আছে না, ভগবান কা ঘর মে দের হ্যায় আন্ধের নেহী।


আঁধার কেটে যখন আলোর প্রকাশ হয়েই গেল তখন থেকেই যাই আর কবছর, কি বলেন? আপনারাও দাবী তুলুন, "আসছে বছর আবার হবে।" 

আমার বিশ্বাস আগামী বছরও হবে। হতেই হবে। আর এবারের মতই সে উৎসবেরও পুরোহিত হবেন এরাই, রাধিকা আর রুকমিনী।

Thursday, 21 May 2026

ভূত অদ্ভুত



 ভূত আর অদ্ভুত 


আপনারা কেউ কি ভূতে বিশ্বাস করেন বা ভগবানে? আসলে বিশ্বাস আছে বললেই যে তাকে ইনিয়ে বিনিয়ে দশ বিশটা কারণ দেখাতে হবে তা নয়।  আসলে বিশ্বাস আছে বললেই হবে। কিউ কি, বিশ্বাসটা আমাদের ভীষণ প্রয়োজন😁। কারণ এই বিশ্বাস না থাকলে আমি,আপনি কোন দমকা হাওয়ায় উড়ে গিয়ে কোন কৃষ্ণ গহবরের ভেতর সেঁধিয়ে যাব সে কোন শর্মাই বলতে পারবে না। তাই ভয়ে বা ভক্তিতে যাই হোক, বিশ্বেস ভারী জরুরী।


আমার আবার ভূত আর ভগবান দুটোতেই ভারী ভক্তি। ভগবান কে দেখিনি ঠিকই কিন্তু লক্ষ কোটি মানুষের বিশ্বাসে, শ্রদ্ধায় তার অস্তিত্বের একটা আভাস তো পাওয়া যায়। বৈষ্ণোদেবীতে যখন গিয়েছি দেখি একই রাস্তায় হাজারো মানুষের ভীড়।  তারা সবাই যে শক্ত সবল তাও নয়। তবু কি এক বিশ্বাস তাদের টেনে নিয়ে চলেছে শিখরের দিকে। তারা শেষে কি পেল জানি না? বেদীতে বসান  বৈষ্ণোদেবীর তিন টুকরো পাথর আমার বিশ্বাসের নিক্তিতে স্থান পায়নি ঠিকই কিন্তু আসার পথে শত সহস্র মানুষের যে বিশ্বাসের রুপ আমি দেখেছি তাকে উড়িয়ে দেব এমন সাধ্যি আমার নেই। শুধু যে তীর্থস্থানেই ভগবানের দেখা মেলে তা কিন্তু নয়। পথে বেরোলেই তার দেখা মেলে। আজকেই সুফি সাধক রুমির একটা লেখা চোখে পরল।

ভ্রমণে  বেরোলেই তুমি পাবে শক্তি আর ভালোবাসা। আর ভালবাসাই তো ভগবান। আমার ভগবান আমার এই দেশ,এই পৃথিবী আর তার লক্ষকোটি মানুষ। এই ভগবানের দেখা মেলে চলার পথে, চেনা অচেনার ভিড়ে।


আর ভূতেও আমার ভারী বিশ্বেস আর ভালোবাসাও।সেই কবে ডিকেন্সের " ক্রিশমাশ ক্যারল' এর সেই উপকারী ভূতকে ভালোবেসে ফেলেছিলুম,সেই ভালবাসা সময়ের সাথে সাথে গাঢ় হয়েছে  কিন্তু একটুও ম্লান হয়নি, দ্যুতি ছড়িয়েই চলেছে। এ ভূতেদের আমি দেখেছি, আমার ছোটবেলা জুড়ে জড়িয়ে আছে তারা। আমার ছোটবেলা কেটেছে জিয়াগঞ্জের ভট্ট পাড়ায়। আমাদের বন্ধু,  নব নালন্দার অনিরুদ্ধ, তার দেশের বাড়ি এই ভট্টপাড়ায়। তো এখানের ভূতই বলুন বা অশরীরী, তারা কিন্তু ভারী মানুষ ঘেঁষা। সন্ধ্যে হতেই তারা আমাদের সঙ্গী হত। ঘরে, বাইরে, আবছা আলোর ঝাপসা অন্ধকারে তাদের উপস্থিতি  বেশ ভরসা যোগাত আমাদের। এবার বহুবছর পরে জিয়াগঞ্জে গিয়ে তাদের আর দেখা পেলুম না। আমাদের পুরনো শ্যাওলা ধরা বাড়ির জায়গায় মাল্টিস্টোরিড ফ্ল্যাট বাড়ি উঠেছে। সেখানে আর তাদের স্থান হয়নি।  সেইসব ভূতেরা বোধহয় আমার ছোটবেলার মতই হারিয়ে গেছে। আর ফিরে আসবে না।

Saturday, 16 May 2026

মন্দারমণি

 গতবছর আজকের দিনে শুধু আমি নয় আমরা তিনজন মন্দারমনিতে।আছে গৌতম আর কানু শেঠও। সোলো ট্র‍্যাভেলার আমি মোটেই নয়। বন্ধু বান্ধব দুচারজন চাইই চাই। না হলে ঘুরে বেড়িয়ে ঠিক মেজাজ মস্তি কোনটাই আসে না।

আজ হঠাৎই আসা। নেহাৎই কি বেড়াতে?  ন্না। আজকাল অনেক রকম ট্যুর বেরিয়েছে না,  মেডিকেল ট্যুরিজম, বিজনেস ট্যুরিজম ইত্যাদি ইত্যাদি।  এগুলো সব একটা কিনলে একটা ফ্রি কনসেপ্ট থেকেই পাওয়া। আমাদের এটাও সেইরকমই গোছের কিছু। হোটেল বা রিসোর্টে কিন্তু উঠিনি। উঠেছি কোথায়? শুনলে অবশ্য আপনাদের চমকাবারই কথা। আমাকে যারা চেনেন তারা নিশ্চয় ভাবছেন এই কাফের আলাকুদ ছোকরার ধম্মে মতি হলো কবে? সত্যি বলতে কি, এটা সেইরকম রিলিজিয়াস ট্যুরিজম জাতীয় কিছু না। নির্ভেজাল বেড়ানও নয়। এটা অনেকটা সামাজিক দায়িত্ব মূলক ট্যুরিজম। কানু শেঠ এই আশ্রমের বেশ কিছু উন্নয়ন মূলক কাজ করছে। স্কুল রঙ করাচ্ছে, জলের ব্যবস্থাও করছে। বেশ লাখ লাখের ব্যাপার। সেটা ওর একার দায়িত্ব। ওর মধ্যে আমরা নেই। আর থাকবই বা কি করে?  আমাদের তো পেনশন নিয়ে টেনশন আভি তক জারী হ্যায়। ব্যাঙ্ক মানছে না মোটেই।


 সে যাইহোক,আগামী তিনদিন আমাদের দিন গুজরান এই রামকৃষ্ণ মিশনের আশ্রমেই। চারবেলা থাকা খাওয়া আর বিশ্রামের ব্যবস্থাও এখানেই। আমাদের মানে আমার আর গৌতমের একমাত্র কাজ ঘুরে বেড়ানো আর মস্তি করা। সমুদ্রের ধারে সন্ধ্যের ফুরফুরে হাওয়ায় বসে বিয়ার ক্যানে সিপ দেওয়া। এটাই আমরা এট বেস্ট করতে পারি কানুর জন্যে। ও ওদিকে স্কুলবাড়ী রঙ করুক, জলের পাম্প বসাক, যা ইচ্ছে করুক।

রামকৃষ্ণের কথাই যখন এলো আর তার আশ্রয়েই যখন থাকব কদিন, তখন যদি গৃহকর্তার প্রশংসায়, দু চার কথা না বলি, তাহলে নিমকহালালি না বরং নিমকহারামির কাজ হবে।


সবাই চেনেন তো রামকৃষ্ণকে? অবশ্যই চেনেন।  বাংলায় থাকেন আর রামকৃষ্ণদেবকে চেনেন না, এটা হতেই পারে না।অন্তত নাম তো শুনেছেন। আমিও আপনাদের মতো। তার নাম অনেক শুনেছি। শ্রীম'র লেখা রামকৃষ্ণ কথামৃত একখানা আমারও আছে। পড়িও মাঝে মধ্যে। ভালোই লাগে। গ্রামের সহজ সরল লোক। পড়াশোনা স্বভাবতই বেশী কিছু করেননি। কিন্তু শুনেছি তিনি স্বভাবজ্ঞানী ছিলেন। অনেক দামী দামী কথা নাকি বলে গেছেন। এ আমার বিশ্বেস হয় না ঠিক। তবে হতেও পারে। শ্রীম তো তাই লিখে গেছেন। শ্রীম আমার খুব চেনা। ওনার পাড়াতেই আমি ব্যাঙ্কের ম্যানেজারি করেছি বেশ ক'বছর। ওনার প্রপৌত্র, দীপক গুপ্তা মহাশয়ের বেশ ঘনিষ্ঠ বৃত্তে ছিলাম।  এখন আর উনি নেই অবশ্য। তবে ওনার কাছে আমার অবিশ্বাসের কথা, দিল খুলকে বাতা দিয়া থা। দীপকবাবু সজ্জন ব্যক্তি।  আমার কথায় রেগে তো যানইনি। বরঞ্চ বললেন যেটুকু আপনার বিশ্বাস সেটুকুতেই থাকুন। বাকী সব বাদই থাক।


 তবে বিশ্বাস ভক্তি আমার রক্তে নেই।আমাদের হেরেডিটিও বলা যায়। পরদায়েশী অবিশ্বাশী।  আমিই আমার গুরু আর চ্যালা দুটোই। তবে চোখ কান খোলা থাকে সততই। জল বাদ দিয়ে দুধটুকুই নি, ঠিক পরমহংসের মতোনই।


তবে রামকৃষ্ণ দেবের অনুগামী তো প্রচুর। অনেক আচ্ছা আচ্ছা লোক।আমার ডাক্তারবাবুই তো তার বিশাল ভক্ত,অনুগামী। আমার জান মালের না হোক,জানের বকলমা তো তেনাকেই দিয়ে রেখে আমি নিশ্চিন্তে ঘুরছি গিরিশের মতো। তাকে না চটানই মঙ্গল। তাই এখানেই রামকৃষ্ণ চর্চা বন্ধ রাখলুম।


তবে এসময় মন্দারমনি না যাওয়াই ভাল। যা গরম, প্রাণ যায় যায় অবস্থা। নেহাৎ বম্বে রিসোর্ট ছিল। ওদের একটা পাবে গিয়ে আমি আর গৌতম বসে থাকতুম আর বিয়ারের বংশ ধ্বংস করতুম।







Tuesday, 12 May 2026

মামা ভাগ্নে

 মামা ভাগ্নে

'নরানাং মাতুলক্রম' 

কথাটা শোনা শোনা লাগছে না? আরো আছে, 'বৃদ্ধস্য তরুণী ভার্যা' 'মিষ্টান্ন মিতরে জনা'। সব শাস্ত্রবচন। আমি অতো শাস্তর বিশারদ নই। তবে কানে আসে। তাই দু'একটা কথা বলেও ফেলি। 

প্রথমেই বলে ফেলি, আমি মোটেই ততোটা বুড়ো নই, যতটা আমাকে দেখায়, তার থেকে মনে প্রাণে আমি ঢের ঢের নবীন। আর চলনে বলনেও প্রবীণ বা বুজর্গ এর ছাপ ততটা পরেনি যতটা পড়া উচিত ছিল। এর জন্যে ক্রেডিট বা ডিসক্রেডিট যদি কাউকেও দিতে হয়, সে সব আমার যোগাসনের  গুরুমশাইদেরই প্রাপ্য। আর ভার্যা মোটেই আর তরুণী নন। বরং যেদিন ধরণী তরুণী ছিল গোছের একটা ব্যাপার। এ ব্যাপারে বেশী কথা না বলাই নিরাপদ। 

সে সব কথা যাক। কথা হচ্ছিল মামা আর ভাগ্নের বিষয়ে।  ভাগ্নেরা মামার ছাঁচেই নাকি অনেকটা ঢালা। এ কথা কি সত্যি? ভাগ্নে যদি আপনার থাকে মিলিয়ে দেখুন তো একবার।  হয়তো আপনার বেলায় মিললেও মিলতে পারে।আমার তো বিন্দুমাত্র মেলেনি। শর সে পাও তক। আমাকে তো চেনেন। আমার চরিত্রও জানেন। অবশ্যি নিজের চরিত্তির নিয়ে ওতো ঢাঁক পেটাব না। কবে কোথায় কি বেড়িয়ে পড়ে, কে জানে। থাক বরং।  অতটা গব্ব না করাই ভালো।  

তবে মোটের উপর মানে মোটামুটি আরকি,আমি নির্ঝঞ্ঝাট টাইপের লোক। কোনকিছুতেই গা লাগাই না। ওই 'হচ্ছে হোক' জাতের মানুষ। কিছুতেই হেলদোল নেই। স্রোতের সাথে গা ভাসিয়ে চলা, এই হচ্ছে আমার কাজ। হাঁত পা ছুড়ে স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটা আমার বিলকুল নাপসন্দ। ওই স্রোতে গা লাগিয়েই তো বিপদে পড়েছিলাম। একবার নয় দুবার। জানমালের সলিল সমাধি আর কি। জঙ্গীপুরের ভরা গঙ্গা সাঁতার দিয়ে পার হতে গিয়ে একেবারে ভেসে গিয়েছিলাম।  ভাগ্যিস সতু ছিল। তাই চুলের মুঠি ধরে আর ধাক্কা দিয়ে দিয়ে পাড়ে টেনে এনেছিল। সতু ছিল বলেই আজও আমি রয়ে গেছি। আর আপনাদের আমার বকবকানি শুনতে হচ্ছে। সব ওই সতুর দোষ।  আমার কোন দায়ও নেই, দায়িত্বও নেই। যত দোষ ওই সতু ঘোষ। মাঝেমধ্যে সতুর কথা মনে পড়ে অবশ্য । হাজার হোক আমার জীবনদাতা।  কি জানি এখন কোথায় আছে বা নেই? তবে সতুরা সতুই থাকে সারাজীবন।  বিপদ দেখলেই ঝাপিয়ে পড়ে কোনকিছুর পরোয়া না করেই।

ভাগ্নের কথা বলতে গিয়ে অনেক কথাই এসে যাচ্ছে। আসলে ওর জীবনের অনেকটা জুড়েই আমি জড়িয়ে আছি। ঠিক প্রত্যক্ষ ভাবে নয়, পরোক্ষ হলেও খুব নিবিড় ভাবে। ওর জন্ম আমাদের বাড়ীতে লালবাগেরই হাসপাতালে।  সেখানে দিদির রাতের খাবার দিতে গিয়ে খরিস সাপের সাথে মুখোমুখি মুলাকাত । ছোবল তুলে চোখে চোখ দিয়ে কয়েক মূহুর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ছোটেনবাবের ইয়ারদোস্ত জেনে, ছোবলটা আর দেয়নি। নবাবের দেশের সাপ তো, তাদের মর্জিমেজাজই আলাদা জাতের। সেই সাপটার কথাও আজকাল আমার মনে পড়ে। সতুর মতো সেও আমার জীবনদাতা। না হলে সেদিনও এক ছোবলেই ফুঁ হয়ে যেতাম। 

ভাগ্নের জন্ম হলো। ভাগ্নের পড়াশোনার এক অধ্যায়ও কেটেছে আমাদের কলকাতার বাড়ীতেই। ওর সেলে চাকরিরও এক অধ্যায়ের সাথে আমি জড়িয়ে আছি। আর ওর বিয়ে সেও আমার নিয়ে আসা সম্মন্ধ দিয়েই।

এইভাবে ভাগ্নের জীবনের সাথে পাকে পাকে জড়িয়ে থাকা স্বত্বেও ওর সাথে আমার বেজায় অমিল। আমার মতো বেহিসেবী, বেআক্কেলী নয়। ভীষণ হিতাহিত জ্ঞান, ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন, হিসেবী পদক্ষেপ আজ ওকে নিয়ে এসেছে সাফল্যের চূড়ায়। এতদিন সেল আর এনটিপিসিতে কাজ করে ও আজ ডিভিসির ডিরেক্টর হয়ে কলকাতায় ফিরে এসেছে। আজ যাচ্ছি ওরই সানি পার্কের বাসায়। ডিনারের নেমন্তন্ন। 

জীবনের সব সাফল্যই আজ ওর করায়ত্ত।  কিন্তু বেচারী না জানলো বিড়ি ফোঁকার আনন্দ, না বুঝল এই আপ্তবাক্য  যে ' সাগর সে গেহরা যাম'।  না পেল মামার মতো স্রোতে ভেসে যাবার আনন্দ। আপাদমস্তক ভালো ছেলেই রয়ে গেল সারাজীবন। আসলে ওর জীবনে সতুর মতো বন্ধুরা আসেনি। আজ যদি আবার জীবনে আমার কিছু বেছে নেবার সুযোগ আসে, তবে আবার স্রোতে ভেসে যেতেই চাইব। চাইব সতুর মতো বন্ধুদেরই। রামকৃষ্ণদেবের মতই বলব, এই নাও মা তোমার পাপ, এই নাও তোমার পূণ্য আমায় আবার মহাকালের স্রোতে ভাসিয়ে দাও মা। এই নাও মা তোমার ভক্তি এই নাও তোমার অভক্তি , আমায় সতুর মতো বন্ধু আবার দিও মা।

Tuesday, 28 April 2026

পটলার তেলেভাজা আর লড়াইয়ের চপ

 পটলার তেলেভাজা আর লড়াইয়ের চপ


আসল কলকাতা যদি চিনতে হয়, জানতে হয়, তাহলে আপনাকে আসতে হবে উত্তর কলকাতাতেই। শ্যামবাজার, বাগবাজার, হাতীবাগান  অঞ্চলেই। বেঙ্গল রেঁনেসার একঝাঁক উজ্বল সব জ্যোতিষ্কের সমাবেশ ঘটেছিল এই উত্তরেই। বাঙালীর যা কিছু গর্বের তার অনেকটা জুড়েই আছে উত্তর কলকাতা।  সুনীল গাঙ্গুলীর 'সেই সময়' পড়লে, সেকালের অনেকটাই ধরা যায়। এতো গেল বাঙালীর বৌদ্ধিক চর্চার দিক।কিন্তু সেকালের কলকাতার বাঙালীরা যে ভোজন বিলাসীও, তার খোঁজও আপনি পাবেন এই উত্তর কলকাতাতেই। এপারের বাঙালীরাও স্বভাবগত ভাবে ভোজন বিলাসীও। নানারকম সুখাদ্যের সমাহার এই উত্তর কলকাতাতেই। নকুড়ের মিষ্টি কেউ খেয়েছেন? আজও তার জুড়ি মেলা ভার। নকুড়ের মিষ্টির দোকানের জগৎজোড়া নাম যদি বলি, খুব কি ভুল বলা হবে?কে না খেয়েছে এই দোকানের মিষ্টি? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন দেশ বিদেশের রাষ্ট্র প্রধান এবং আরো সব বিখ্যাত মানুষজনেরা। আম্বানীর ছেলের বিয়েতেও আলো করে ছিলো এই দোকানের সন্দেশ। এরা শুধু সন্দেশই বানান, রসের মিষ্টি নয়। ঠিক হেদোর উল্টোদিকে  রামদুলাল সরকার স্ট্রীটে  এই দোকান। পারলে যাবেন একদিন, এর সন্দেশের স্বাদের জবাব হয় না, হবে নাও কোনদিন।  কেননা এর পরতে পরতে ইতিহাসের গন্ধ মাখানো। মীর্জা গালিব কলকাতায় থাকাকালে, এই অঞ্চলেই ছিলেন অনেকদিন।  তখন কি এই দোকান ছিল? থাকলে তিনিও আসতেন ঠিকই, তাহলে সন্দেশ নিয়ে তার লেখা  কিছু শের শায়েরীতে অবশ্যই থাকতো। 


এ অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে না? একদম। ভেবেছিলাম আজ শিল্প নিয়ে কিছু লেখালিখি হোক। কিন্তু, ' দিদির রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।' শিল্প কোথায় যে লিখব? বাঙলা থেকে শিল্পটিল্প বহুদিন গেছে উঠে। কি করা যায়? আরে চপভাজাও তো ইদানীং শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে। তার বেলা? 'তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর উপর রাগ করো' ওটি চলবে না।

উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে চপ শিল্পের রমরমা। আর আজ তাদেরই কাউকে নিয়ে হয়ে যাক মেগাসিরিয়ালের শুরুবাত? ঠিক কি না? ঠিক ঠিক। আপনাদের অনুমোদন নিয়েই তাহলে চপ হোক, শিল্প।


আজকের এই শিল্পোদ্যোগী মহাশয়ের নাম অবশ্যই আদি অকৃত্তিম পটলা। আর দোকানের নাম,লোকমুখে পটলার তেলেভাজার দোকান। এর একটা পোশাকি নামও আছে, সেটা হলো, Patla's snacks. এই দোকানের সিগনেচার আইটেম কি বলুন দেখি? ' 'লড়াইয়ের চপ'।  এই চপ আর মুড়ি নিয়ে   কেউ কি লড়াই করতে যায়।

? যায় হয়তো, আমার জানা নেই। তবে এই ভোটের রাজ্যে, অলিতে গলিতে যখন লড়াই লড়াই, লড়াই চাই এইরকম একটা হাইপ চলছে। তখন সেই সব বীর যোদ্ধাদের কেউ কেউ যদি লড়াইয়ের চপ আর মুড়ি নিয়ে মিছিলে যায়  বা পথসভা করে, তাতে আমি তোকোন দোষ দেখিনা।

কিন্তু পটলা এই চপের নাম কেন 'লড়াইয়ের চপ' দিল? তারও ইতিহাস তো আছে কিছু। অবশ্যই আছে।


শুনুন তবে সেই ইতিহাস। এই লড়াইয়ের চপের জন্ম সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন এই তেলেভাজার দোকানের মালিক ছিলেন, অমুল্যধন সাউ। যাকে সবাই পটলা নামেই চিনতেন। তখন যুদ্ধ চলছে জোর কদমে। তাই পটলার সেই বড় আকৃতির চপের নামও লোকমুখে ' লড়াইয়ের চপ' বলে চালু হয়ে গেল। সে যুদ্ধ কবে শেষ হয়ে। কিন্তু নিত্যনতুন যুদ্ধ তো চলছেই। আর সে সব আপনারা সবাই তো অবগত আছেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'লড়াইয়ের চপ' আজও লড়াইয়ের চপ। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, চলবে। যুদ্ধ যতদিন চলবে, পটলার ' লড়াইয়ের চপ' ততদিনই থাকবে। ঠিক কি না? বলুন, 'ঠিক, ঠিক'।


লড়াইয়ের চপ আদতেই প্লেন & সিম্পল, আলুর চপ। আগে সাইজে বড় হতো। বেশ একটা লড়াই লড়াই ভাব থাকতো।  ইদানীং, ওতটা বড় হয়তো হয় না, তবে যত্নে ভাজা, কড়া করে।  যেটা অম্বলের রোগীদের সাথে বেশ যায় মানে খেলে আর কি। আমি তো প্রায়ই গিরীশ মঞ্চে নাটক দেখতে যায়। তখন মাঝেমধ্যেই পটলার দোকানে ঢুঁ মারি। ওদের রাধাবল্লভী আর আলুর দমটা মারাত্মক টাইপের টেস্টি। আমি ইদানীং আদি হরিদাস মোদকের নুচি ছেড়ে পটলাতেই মন দিয়েছি। তাছাড়া আছে অজস্র তেলেভাজার সম্ভার। চপ, বেগুনী , ধোঁকা,  ইত্যাদি ইত্যাদি।  আমি ওই রাধাবল্লভীতেই থেমে থাকি। আসলে আমার টাইপটাতো একটু কেষ্ট কেষ্ট , তাই রাধার সাথেই আমার ভাব আর ভালোবাসাও। 

এতো কথা যে বললাম, একবার যাবেন নিশ্চয়ই পটলার দোকানে। বাগবাজার বাটা দিয়ে ঢুকে গঙ্গামুখী হবেন। গঙ্গামুখী বলেছি,গঙ্গাযাত্রা নয়। মাইন্ড দ্যাট। বেশ কিছুটা  টোটো করে হেঁটে বা টোটোই চেপে এলেই ১৮ নম্বর বাগবাজার।  আরামসে চিনবেন।  সব তেলেভাজা প্রেমীরা ঘিরে রেখেছে,  পটলার স্নাক্স দোকান, মৌমাছিরা যেমন চাঁক ঘিরে থাকে। ভয় পাবেন না আরামসে খান। এক আধদিনই তো খাবেন। রোজ রোজ  তো নয়। জানি আপনি পেটরোগা বাঙালী,  তাই বলে লড়াই করবেন না? এবার, একটু হাঁটি হাঁটি করে গিরিশে ঢুকে পড়ুন। কোন না কোন নাটক চলবেই।দারুণ হিমশীতল একটা থিয়েটার হল। টিকিট পেয়েই যাবেন,বিরাট থিয়েটার হল। নাটক দেখার শেষে, ইচ্ছে হলে বাড়ী ফেরার পথে একটু বাণিজ্যও করতে পারেন। সব টাটকা শাকসবজি ওঠে সামনের রাস্তার দুধারেই। আর পাবেন বাগবাজার গঙ্গার ঘাট থেকে ধরা জ্যান্ত জ্যান্ত সব মাছ। টেসই আলাদা।  সীজনে ইলিশও পাবেন। গ্যারান্টি। কে না জানে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটের ইলিশ স্বাদে রুপে গন্ধে একেক একেকটা সব সেইকালের  'নুরজাহান',যা দুনিয়াকে আলো করে রাখে।