Tuesday, 20 January 2026

আপনমনে



 আজ বহুদিন পরে কাঁকুড়গাছির যোগোদ্যানে ঢুকে পড়েছিলাম। অনেকটা ঘটনাচক্রেই। আমাদের আড্ডা মারার জায়গা বেদখল হয়ে গেছে। এখন একমাস ধরে বড়পার্কে চলবে সুভাষমেলা। সুতরাং, আমরা এখন ঠাঁইহারা। বসার জায়গা নেই। উদ্দেশ্যবিহীন হেঁটেই চলেছি। আর আমার এই চলার পথেই রামকৃষ্ণ মিশনের যোগোদ্যান। রামকৃষ্ণ ভক্তদের কাছে যোগোদ্যান খুবই উল্লেখযোগ্য জায়গা। আগে এই অঞ্চলে প্রচুর বাগান ছিল। আজ যেটা যোগোদ্যান, সেটাই ছিল রামবাবুর বাগান। রামকৃষ্ণ দেব প্রায়ই এখানে আসতেন। বিবেকানন্দও বহুবার এসেছেন।


আগে আমিও প্রায়ই আসতাম। ভক্তিরসে জাড়িত হয়ে নয়। জিলিপির রস আমাকে টেনে আনত। এখানে আরতির পর প্রসাদে জিলিপি দেওয়া হয়। এব্যাপারে রামকৃষ্ণ দেবের সাথে আমার বহুত মিল। দুজনেই জিলিপির ভক্ত। কিন্তু সে ভক্তির খেসারত আমাকে দিতে হয়েছিল দস্তুরমতো।  চড়চড় করে সুগার স্পাইক করে গিয়েছিল। বহুকষ্টে বহুব্যয়ে মধুমেহ শেষে পোষ মানে। 

আজ বহুদিন পরে, ঢুকে পড়লাম। চারিদিকে ভক্তের দল। সবাই ভক্তিরসে টইটম্বুর। আমিই এই বেরসিক বসে রইলাম এই ভক্ত দলের মাঝে। ভক্তি আমাকে মোটেই টানে না। আর ভারতীয় গুরুবাদে ভক্তি মানেই কমপ্লিট সারেন্ডার। ও আমার মোটেই হবার নয়। আমি নজরুলের 'শির নেহারি নতশির ওই শিখর হিমাদ্রির' টাইপের। মেরে ফেললেও নাড়া বাঁধব না কোন গুরুর কাছে। সে তিনি রামকৃষ্ণ হন, চাই তৈলঙ্গস্বামীই। 

তবে আজ বেশ কিছু গান শুনলাম আরতির পরেই। গাইলেন শ্যামপ্রিয়ানন্দ বলে এক মহারাজ। সবই ভক্তিগীতি।  কিন্তু গাইলেন পুরো কালোয়াতি ঢঙে। গলার কি গমক আর কাজ। পুরো এক ঘন্টা বসে রইলাম। সঙ্গীত এক আশ্চর্য জিনিষ।  আমার মতো ন্যাড়াকেও বারবার বেলতলায় টেনে আনে। জাস্ট মুগ্ধ হয়ে শুনলাম। 


শেষমেষ কি হলো? প্রসাদের লাইনে দাঁড়িয়ে পড়লুম। হাতে পড়লো, হাতে গরম জিলিপি। না, তার অমর্যাদা করিনি। ভক্তি সহকারে সে জিলিপির রসাস্বাদন করলুম। ভক্তি নাই বা থাকুক, জিলিপির ভক্ত হতে বারণ তো কেউ করেনি।

Sunday, 18 January 2026

সক্রেটিস

 এই কলকাতা শহরের বিভিন্ন প্রান্তে, বেশ কিছু বন্ধুবৃত্ত আছে আমার। ছোট ছোট সার্কেলে, চার/পাঁচজনের।  এদের নিয়েই আমার চারইয়ারী বন্ধুর দল। সবমিলিয়ে সংখ্যায় নেহাৎ কম নয়। তাদের সাথে পানভোজন তো হয়ই। সেটা কার না জানা। সবাই যে পানাসক্ত, এমনটিও নয়। তবে পান এইসব আড্ডার অনুপান মাত্র। যেমন কালোয়াতি গানের সাথে তবলার সঙ্গত। ঠিক তাই। এসব আড্ডায় বেশ উচ্চাঙ্গের আলোচনা হয় তার মধ্যে কেউ যদি গ্লাসে দুএকচুমুক দেয়, তাতে কি এমন মহাভারত অশুদ্ধ হয়?

গৌতম আমার পাড়ার বন্ধুবৃত্তের তেমনই এক বন্ধু। টাইমস আর স্টেটসম্যানে বহুদিন সাংবাদিকতা করেছে।  অবসরপরবর্তী জীবনেও এমিটিতে পড়িয়েছে বছর দশেক। বেশ পড়াশোনা আছে। ওর সাথে আড্ডা জমাতে গেলে, নিজেরও কিছু রেস্ত থাকা চাই, না হলে আড্ডার সুখ কোথায়? নেহাৎ কপালগুণে, গ্রীক সভ্যতা ও সংস্কৃতির একটা বই ভাষানুবাদের কাজ করেছিলাম। তাই আলোচনা হয়েছিল বেশ ভালো।

সেদিন পার্কে আমি আর গৌতমই ছিলাম, আর বিশেষ কেউ আসেনি। কথা শুরু হলো, গ্রীক সভ্যতা আর সংস্কৃতি নিয়ে। ভাগ্যিস চেনা সাব্জেক্ট, তাই আড্ডা জমে উঠলো। ইতিহাস তো আমার বিষয় নয়, যা কিছু টুকটাক পড়াশোনা, তাও ফিজিক্স নিয়ে।

তবে ইতিহাস আমাকে ভীষণ আকর্ষণ করে। মায়া সভ্যতা, ইজিপ্টের ইতিহাস আর প্রাচীন গ্রীস। তাদের সভ্যতা, শৌর্য,, সাহিত্য, নাটক, রাজনীতি।  কি ফ্যাসসিনিটং যে লাগে। গ্রীসে তো পাহাড়, পর্বত অনেক, যাতাযত খুব সহজ নয়। তাই গড়ে উঠেছিল ছোট ছোট সিটি স্টেটস। পাহাড়ে ঘেরা এক একটা সভ্যতা, জ্ঞানচর্চার তীর্থভূমি। এথেন্স, স্পার্টা, থিবস এক একটা তীর্থক্ষেত্র বিশেষ।

সক্রেটিস ছিলেন এথেন্সের এক প্রাজ্ঞ জ্ঞানী পুরুষ।  তিনি প্রাচীন এথেন্সের বাজারে ( আগোরা),  জিমন্যাসিয়ামে আড্ডা মেরে সময় কাটাতেন। তাকে ঘিরে থাকতো ছেলে, ছোকড়া আর জিজ্ঞাসু মানুষের দল। তিনি দর্শন নিয়ে তার অনুগামীদের দলের সাথে আলোচনা করতেন। তাদের মধ্যে প্রশ্ন জাগিয়ে তুলতেন। সক্রেটিস বিশ্বাস করতেন প্রকৃত সুখ আসে সৎ গুণের বিকাশ এবং আত্মউন্নতির প্রকৃত প্রচেষ্টার মাধ্যমে। তিনি প্রায়শই প্রশ্ন তুলতেন এথেনীয় সমাজের প্রচলিত রীতিনীতি এবং মূল্যবোধ নিয়ে। তার বিরুদ্ধে ধর্মনিরপেক্ষতা ও যুবসমাজকে কলুষিত করার অভিযোগ আনে শাসক সমাজ। তার বিচার চলে দীর্ঘদিন। তার পক্ষে বিপক্ষে নানা সওয়াল হয়। তাকে ক্ষমা চাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় অথবা এথেন্স থেকে নির্বাসন নচেৎ হেমলক বিষ পান করে মৃত্যুবরণ।  তিনি হেলমককে বেছে নেন। তার মৃত্যুতে এথেন্সের এক বিরাট যুগের অবসান হয়।

সক্রেটিস নিজে কিছু লিখে যাননি, পরবর্তী কালে তার শিষ্য প্লেটো, তার শিক্ষা, দর্শন নিয়ে লিখে গেছেন।

প্রাচীন গ্রীস ইতিহাস চর্চারও পথিকৃৎ। ইতিহাস চর্চার শুরু হয় হেরোডোটাস ও থুসিডিসিসের মাধ্যমে প্রায় খ্রীষ্টপূর্ব ৫০০ বছর আগে। থুসিডিসিস মনে করতেন ইতিহাসকে হতে হবে নিরপেক্ষ,যুক্তিনিষ্ঠ  ও নীতিনিরপেক্ষ।

প্রাচীন গ্রীসের নাটকচর্চা এক অসাধারণ উচ্চতায় উঠেছিল। কমেডি ও ট্রাজেডি। কমেডিতে ছিল হাসির আড়ালে এক গভীর বার্তা সারা সমাজের প্রতি। এরিস্টোফেনিস ছিলেন গ্রীক কমেডির সম্রাট। তার এক বিখ্যাত নাটক, Lysistrata. এই নাটকে গ্রীক নারীরা সিদ্ধান্ত নেয়, যতক্ষন না পুরুষরা যুদ্ধ বন্ধ করছে, তারা যৌনসম্পর্ক করবে না।

ব্যঙ্গ: যুদ্ধপ্রীতি বনাম মুক্তিবোধ।

আর একটি নাটকে তিনি সক্রেটিসকে ব্যঙ্গ করে, দর্শন ও শিক্ষার কৃত্তিমতাকেও প্রশ্ন করেন।

প্রাচীন গ্রীসের ট্রাজেডি ছিল নিয়তির বিরুদ্ধে মানুষের সংগ্রাম। 

গৌতমের সাথে আড্ডা আপাতত এখানেই শেষ। পরেরদিন নিশ্চয় আরো হবে। গ্রীস সম্মন্ধে যে এখনো অনেক কিছুই বলা বাকী রইল।

Friday, 16 January 2026

চন্দননগর: আজ সারাদিন

 চন্দন নগর: সারাদিন


অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান। কম তো নয়, ষাট ব..ছ..র। দাদার বিয়েতে এসেছিলাম ৬০ বছর আগে।  তখনই ভালো লেগে গিয়েছিল। অবশ্য তখনকার চন্দননগর আর আজকের চন্দননগরে মনে হয় বিস্তর ফারাক। চন্দননগর ফ্রান্সের কলোনি ছিল প্রায় ৩০০ বছর, টু বি ভেরী প্রিসাইস ২৭৫ বছর। এর স্থাপত্যে, সাহিত্যে, সঙ্গীতে ভালো প্রভাব ছিলো ফরাসিদের।  অবশ্য সেসব আজ খুঁজে পাওয়া যাবেনা। প্রোমোটারদের হাতে পড়ে, সেসব স্থাপত্য ভেঙেচুরে ফ্ল্যাটবাড়ী হয়ে গেছে।

তারমধ্যে যেটুকু বেঁচে আছে গঙ্গার ধারে দীর্ঘ স্ট্রান্ড। এখনো সুন্দর।আর পেলাম আর একটা চার্চ, নাম সেক্রেড হেড চার্চ। ফ্রেঞ্চ গথিক স্টাইলে তৈরী।

ফ্রান্স সম্মন্ধে আমার বরাবরই একটা কৌতুহল ছিল। একসময় ফ্রেঞ্চ ভাষা শেখাও শুরু করেছিলাম। কিন্তু বেশীদূর এগোতে পারিনি। ভাষাটা যে কঠিন তা নয়। আর বর্নমালা হুবুহু না হলেও প্রায় ইংরেজি।  কিন্তু মুর্শিদাবাদের গ্রামে বসে ফরাসী ভাষা শেখা আর হয়ে ওঠেনি।

তবে ফরাসী সাহিত্য অল্পবিস্তর পড়া ছিল। মোঁপাসার ছোটগল্প, প্রুস্ত, জাঁ পল সার্ত্রে, সিমোন দ্য বোভিয়ার এদের লেখার খবরও কিছু রাখতাম। যখন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পোস্টেড ছিলাম, তখন চিন্ময়  গুহ প্রায়ই আমার চেম্বারে বসে আড্ডা মারতেন। চিন্ময় গুহকে চেনেন তো? ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির ইংরেজী বিভাগের প্রধান ছিলেন। কিন্তু ফরাসী ভাষা আর সাহিত্যে বিশাল গণ্যমান্য একজন পন্ডিত । যেমন তেমন নয়, ফরাসী সরকার তাকে তিন তিনবার ফরাসী ভাষা ও সাহিত্যে পারদর্শিতার জন্যে  তাকে সর্বোচ্চ সম্মানে সম্মানিত করেছিলেন। তো এইরকম এক বিরাট হস্তী আমার সাথে আড্ডা মারতেন ঘন্টার পর ঘন্টা।  আমার মুখে প্রুস্ত, সার্তের নাম শুনে চিন্ময়বাবু তো হতবাক। "ব্যাঙ্কের লোকেরা এসব পড়ে নাকি?" সত্যি বলতে পড়েছি তো নিশ্চয় কিছু, কিন্তু ওতো উচ্চমার্গীয় আলোচনা কি আর কিছু বুঝেছি? তবে চিন্ময়বাবু নির্ঘাত চমকে গেছিলেন ব্যাঙ্কের এক বাবুর মুখে প্রুস্তের নাম শুনে। 


' বললেন স্যারকে গিয়ে আপনার কথা বলতে হবে। স্যার মানে বিখ্যাত ঐতিহাসিক তপন রায়চৌধুরী। তারই জীবনকথা।  তার লেখা 'বাঙালনামা' আমি পড়েছি। অনেকেই তাকে বইটার নাম পালটাতে বলেছিলেন। পাল্টান নি, বরিশালের বাঙাল তো, সাংঘাতিক  গোঁয়ার। সে বই আমার নিজস্ব লাইব্রেরীতে ছিল।একজনকে পড়তে দিলাম। সেও বাঙাল। সে আর ফেরৎই দিল না। সেইথেকে আমি আর কাউকে বই দিই না।


আজেবাজে কথা থাক, 

আসল ব্যাপার হলো আমার ছোট ছেলের সাথে, চন্দননগর কলেজের প্রিন্সিপাল, দেবাশীষ সরকারের বেশ জানাশোনা।  আর সেই সূত্রেই, আজ চন্দননগর যাওয়া। চন্দননগর কলেজে একটা চমৎকার মিউজিয়াম করেছেন উনি। সেটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলাম। সব পুরোনো চন্দননগর আর সেখানকার বিপ্লবীদের অনেক সংগ্রহ চমৎকার ভাবে রাখা হয়েছে এক হেরিটেজ বিল্ডিঙে। দেবাশীষ বাবুর সাথে অনেকক্ষণ গল্প হলো। আপনারাও চেনেন তাকে। আগে টিভিতে টকশোতে প্রায়ই আসতেন। পুরো বামমার্গের লোক।

আজ  অনেক ছবি তুলেছি। 

পরিশেষে, 'ভুতের রাজা দিল বর' এ মধ্যাহ্ন ভোজন। ছেলেই খাওয়ালো, মাটন আর মোচাঘণ্ট।  কাল থোড় ছেঁচকি খেয়েছিলেন। আজ আপনাদের জন্যে মোচাঘণ্ট।  রিয়েলি ডেলিশিয়াস। 'ভূতের রাজা দিল বর' আজ সত্যিই বর দিয়েছে। ওদেরকে দিলাম ফুল মার্কস।