Tuesday, 28 April 2026

পটলার তেলেভাজা আর লড়াইয়ের চপ

 পটলার তেলেভাজা আর লড়াইয়ের চপ


আসল কলকাতা যদি চিনতে হয়, জানতে হয়, তাহলে আপনাকে আসতে হবে উত্তর কলকাতাতেই। শ্যামবাজার, বাগবাজার, হাতীবাগান  অঞ্চলেই। বেঙ্গল রেঁনেসার একঝাঁক উজ্বল সব জ্যোতিষ্কের সমাবেশ ঘটেছিল এই উত্তরেই। বাঙালীর যা কিছু গর্বের তার অনেকটা জুড়েই আছে উত্তর কলকাতা।  সুনীল গাঙ্গুলীর 'সেই সময়' পড়লে, সেকালের অনেকটাই ধরা যায়। এতো গেল বাঙালীর বৌদ্ধিক চর্চার দিক।কিন্তু সেকালের কলকাতার বাঙালীরা যে ভোজন বিলাসীও, তার খোঁজও আপনি পাবেন এই উত্তর কলকাতাতেই। এপারের বাঙালীরাও স্বভাবগত ভাবে ভোজন বিলাসীও। নানারকম সুখাদ্যের সমাহার এই উত্তর কলকাতাতেই। নকুড়ের মিষ্টি কেউ খেয়েছেন? আজও তার জুড়ি মেলা ভার। নকুড়ের মিষ্টির দোকানের জগৎজোড়া নাম যদি বলি, খুব কি ভুল বলা হবে?কে না খেয়েছে এই দোকানের মিষ্টি? রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, বিভিন্ন দেশ বিদেশের রাষ্ট্র প্রধান এবং আরো সব বিখ্যাত মানুষজনেরা। আম্বানীর ছেলের বিয়েতেও আলো করে ছিলো এই দোকানের সন্দেশ। এরা শুধু সন্দেশই বানান, রসের মিষ্টি নয়। ঠিক হেদোর উল্টোদিকে  রামদুলাল সরকার স্ট্রীটে  এই দোকান। পারলে যাবেন একদিন, এর সন্দেশের স্বাদের জবাব হয় না, হবে নাও কোনদিন।  কেননা এর পরতে পরতে ইতিহাসের গন্ধ মাখানো। মীর্জা গালিব কলকাতায় থাকাকালে, এই অঞ্চলেই ছিলেন অনেকদিন।  তখন কি এই দোকান ছিল? থাকলে তিনিও আসতেন ঠিকই, তাহলে সন্দেশ নিয়ে তার লেখা  কিছু শের শায়েরীতে অবশ্যই থাকতো। 


এ অনেকটা ধান ভানতে শিবের গীত হয়ে যাচ্ছে না? একদম। ভেবেছিলাম আজ শিল্প নিয়ে কিছু লেখালিখি হোক। কিন্তু, ' দিদির রাজ্যে পৃথিবী গদ্যময়।' শিল্প কোথায় যে লিখব? বাঙলা থেকে শিল্পটিল্প বহুদিন গেছে উঠে। কি করা যায়? আরে চপভাজাও তো ইদানীং শিল্পের মর্যাদা পাচ্ছে। তার বেলা? 'তেলের শিশি ভাঙলো বলে খুকুর উপর রাগ করো' ওটি চলবে না।

উত্তর কলকাতার অলিতে গলিতে চপ শিল্পের রমরমা। আর আজ তাদেরই কাউকে নিয়ে হয়ে যাক মেগাসিরিয়ালের শুরুবাত? ঠিক কি না? ঠিক ঠিক। আপনাদের অনুমোদন নিয়েই তাহলে চপ হোক, শিল্প।


আজকের এই শিল্পোদ্যোগী মহাশয়ের নাম অবশ্যই আদি অকৃত্তিম পটলা। আর দোকানের নাম,লোকমুখে পটলার তেলেভাজার দোকান। এর একটা পোশাকি নামও আছে, সেটা হলো, Patla's snacks. এই দোকানের সিগনেচার আইটেম কি বলুন দেখি? ' 'লড়াইয়ের চপ'।  এই চপ আর মুড়ি নিয়ে   কেউ কি লড়াই করতে যায়।

? যায় হয়তো, আমার জানা নেই। তবে এই ভোটের রাজ্যে, অলিতে গলিতে যখন লড়াই লড়াই, লড়াই চাই এইরকম একটা হাইপ চলছে। তখন সেই সব বীর যোদ্ধাদের কেউ কেউ যদি লড়াইয়ের চপ আর মুড়ি নিয়ে মিছিলে যায়  বা পথসভা করে, তাতে আমি তোকোন দোষ দেখিনা।

কিন্তু পটলা এই চপের নাম কেন 'লড়াইয়ের চপ' দিল? তারও ইতিহাস তো আছে কিছু। অবশ্যই আছে।


শুনুন তবে সেই ইতিহাস। এই লড়াইয়ের চপের জন্ম সেই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। তখন এই তেলেভাজার দোকানের মালিক ছিলেন, অমুল্যধন সাউ। যাকে সবাই পটলা নামেই চিনতেন। তখন যুদ্ধ চলছে জোর কদমে। তাই পটলার সেই বড় আকৃতির চপের নামও লোকমুখে ' লড়াইয়ের চপ' বলে চালু হয়ে গেল। সে যুদ্ধ কবে শেষ হয়ে। কিন্তু নিত্যনতুন যুদ্ধ তো চলছেই। আর সে সব আপনারা সবাই তো অবগত আছেন। তাই দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের 'লড়াইয়ের চপ' আজও লড়াইয়ের চপ। সেই ট্রাডিশন সমানে চলছে, চলবে। যুদ্ধ যতদিন চলবে, পটলার ' লড়াইয়ের চপ' ততদিনই থাকবে। ঠিক কি না? বলুন, 'ঠিক, ঠিক'।


লড়াইয়ের চপ আদতেই প্লেন & সিম্পল, আলুর চপ। আগে সাইজে বড় হতো। বেশ একটা লড়াই লড়াই ভাব থাকতো।  ইদানীং, ওতটা বড় হয়তো হয় না, তবে যত্নে ভাজা, কড়া করে।  যেটা অম্বলের রোগীদের সাথে বেশ যায় মানে খেলে আর কি। আমি তো প্রায়ই গিরীশ মঞ্চে নাটক দেখতে যায়। তখন মাঝেমধ্যেই পটলার দোকানে ঢুঁ মারি। ওদের রাধাবল্লভী আর আলুর দমটা মারাত্মক টাইপের টেস্টি। আমি ইদানীং আদি হরিদাস মোদকের নুচি ছেড়ে পটলাতেই মন দিয়েছি। তাছাড়া আছে অজস্র তেলেভাজার সম্ভার। চপ, বেগুনী , ধোঁকা,  ইত্যাদি ইত্যাদি।  আমি ওই রাধাবল্লভীতেই থেমে থাকি। আসলে আমার টাইপটাতো একটু কেষ্ট কেষ্ট , তাই রাধার সাথেই আমার ভাব আর ভালোবাসাও। 

এতো কথা যে বললাম, একবার যাবেন নিশ্চয়ই পটলার দোকানে। বাগবাজার বাটা দিয়ে ঢুকে গঙ্গামুখী হবেন। গঙ্গামুখী বলেছি,গঙ্গাযাত্রা নয়। মাইন্ড দ্যাট। বেশ কিছুটা  টোটো করে হেঁটে বা টোটোই চেপে এলেই ১৮ নম্বর বাগবাজার।  আরামসে চিনবেন।  সব তেলেভাজা প্রেমীরা ঘিরে রেখেছে,  পটলার স্নাক্স দোকান, মৌমাছিরা যেমন চাঁক ঘিরে থাকে। ভয় পাবেন না আরামসে খান। এক আধদিনই তো খাবেন। রোজ রোজ  তো নয়। জানি আপনি পেটরোগা বাঙালী,  তাই বলে লড়াই করবেন না? এবার, একটু হাঁটি হাঁটি করে গিরিশে ঢুকে পড়ুন। কোন না কোন নাটক চলবেই।দারুণ হিমশীতল একটা থিয়েটার হল। টিকিট পেয়েই যাবেন,বিরাট থিয়েটার হল। নাটক দেখার শেষে, ইচ্ছে হলে বাড়ী ফেরার পথে একটু বাণিজ্যও করতে পারেন। সব টাটকা শাকসবজি ওঠে সামনের রাস্তার দুধারেই। আর পাবেন বাগবাজার গঙ্গার ঘাট থেকে ধরা জ্যান্ত জ্যান্ত সব মাছ। টেসই আলাদা।  সীজনে ইলিশও পাবেন। গ্যারান্টি। কে না জানে বাগবাজারের গঙ্গার ঘাটের ইলিশ স্বাদে রুপে গন্ধে একেক একেকটা সব সেইকালের  'নুরজাহান',যা দুনিয়াকে আলো করে রাখে।