Saturday, 25 July 2026

দিল্লি দূর নেহী

 ছবিতে এই যে ছেলেটাকে দেখছেন কমেডিয়ানের সাজে, ও এসেছে দিল্লিতে নিজের ভাগ্য গড়ে  নিতে। ও নিজের ভাগ্য আদৌ গড়তে পারবে কি না, না ভাগ্যও ওকে নিয়ে কমেডি করবে,  তা  বলতে  পারে কেবল সময়। এসেছে সেই সুদূর রাজস্থানের শিকার জিলার কোন এক অখ্যাত গ্রাম থেকে। আপাতত এক পাঞ্জাবী বার কাম রেস্ট্যুরেন্টের খদ্দের ধরার কাজ করে করোলবাগের এই সদা সরগরম বাজারে। সকাল ১১ থেকে রাত ১১টা অব্দি ওর ডিউটি। ওর কাজ খদ্দের ধরা ওই বার কাম রেস্টুর‍্যেন্টের জন্যে।  ১১টার পরে,  ওর বাসায় যাবে সেই দূর রজৌরী গার্ডেনে।  সকাল থেকেই আমার পেছনে লেগে ছিল, ওর রেস্ট্যুরেন্টে নিয়ে যাবার জন্যে। দারুণ সব অফার। পাঞ্জাবী হোটেল যখন দারুর প্রাধান্যটাই বেশী। এক পেগ হুইস্কী নিলে, এক পেগ ফ্রি। দুইয়ে দুই। তার সাথে দারুণ সব স্বাদিষ্ঠ খানা। কিন্তু পাঞ্জাবী খাবারে এতই বাল্লে বাল্লে মালাই আর দেশী ঘিওয়ের ছড়াছড়ি যা পেটরোগা বাঙালীর মোটেই সয় না। এর আগে সে শিক্ষে আমার হয়ে গেছে। সে সব যাইহোক, ওর সাথে কথা বলে আমার মন ভিজে গেছে। আমি কথা দিয়েছি একদিন আমি যাবই ওদের রেস্ট্যুরেন্টে গলা ভেজাতে।  অনুরোধে ঢেঁকীও গিলতে হয়। আর এ আর এমন কি। সামান্য ওয়ান প্লাস ওয়ান, কিই বা এমন। হয়তো দুপেগও নিয়ে নিতে পারি, ওর মুখ চেয়ে। দুই দুগুনি চার। সে ম্যানেজ করা যাবে। তবে ওই মালাই আর দেশী ঘিয়ের মহোৎসব কি ভাবে ম্যানেজ করব সেটা নিয়েই বড্ড চিন্তা ছিল। 

পুনশ্চ : দিল্লিতে সেবার চারদিন ছিলাম। তার পরের তিনদিন,  সেই রেস্টুর‍্যেন্টেই পরের তিনটি সন্ধ্যেই কেটেছিল। ইভিনিং ড্রিংক্স সে ডিনার তক। সেখানে ভালো চাইনিজ খাবারও পেয়ে গিয়েছিলাম। ওয়েটার যারা ছিল সব এই বাংলার। রোজ বসতো ,লাইভ গানের আসর।  লক্ষনৌর এক ওস্তাদ আর তার সঙ্গীনি দিল্লিরই এক সুন্দরী কন্যে ভারী সুন্দর গজল আরো সব গান গাইতেন।  একে দিল্লি, তাই করোলবাগের চত্তর, চারিদিকে সব লম্বাচওড়া সর্দারজী তাদের পরিবার সমেত, আর পাতিয়ালা পেগ। ভারী সুন্দর তিনটে সন্ধ্যে কেটেছিল সেবার দিল্লিতে। সাউথ আফ্রিকার এক বিরাট ব্যবসায়ী সর্দারজীর সাথেও ভারী ভাব হয়ে গিয়েছিল সেবার।


 ভারতবর্ষের কথা ভেবে, অবাকই লাগে। কি বিরাট বিচিত্র দেশ আমাদের, কি বিশাল তার সংস্কৃতি আর বৈচিত্র্য।  এমন ঐশ্চর্য্যময়ী বিচিত্র দেশ এই বিশ্বসংসারে আর দুটি নেই।  কি যেন এক অদৃশ্য সুরে বাঁধা।  গর্ব হয় নিজেকে  আরতবাসী ভেবে। 

ছবির এই ছেলেটির সাথে আর দেখা হয়নি আমার। আমার বিশ্বাস, আজ নিশ্চয় সে নিজেকে প্রতিষ্টিত করতে পেরেছে। আজ হঠাৎই তার কথা মনে পরে গেল। সে যেন তার ঠিকানা খুঁজে পেয়ে থাকে দিল্লিতে।

Friday, 24 July 2026

বছর তিনেক আগে- রঘুরাজপুর


















আজ সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কেটে গেল রঘুরাজপুর গ্রামে।   অনেকে আবার একে শিল্পীগ্রাম বলেও থাকে। উৎকল ঘরানার ছবি আঁকাই এদের পেশা আর নেশাও। একজন দুজন নয় সারা গ্রামের লোকেরাই এই পেশায় যুক্ত। সারাবছর ট্যুরিষ্টরা আসে আর মেলায় মেলায় ঘুরেই এদের বিক্রিবাট্টা। তাছাড়া বিদেশেও এদের শিল্পসামগ্রীর চাহিদা আছে। মূলত ঘর সাজাবার ডেকর হিসেবে এগুলোর চাহিদা।সরকারি সাহায্যও প্রচুর মেলে। সাহায্য ছাড়া এদের টিঁকিয়ে রাখা যাবেনা। আমরাও ঘুরে ফিরে দেখলাম। আমি তো শিল্পের বুঝি,ঘেঁচু। কুন্তলাই ঘুরে ঘুরে দেখল, কিনলোও কিছু।হয়তো গিফট করবে কাউকে কাউকে। তবে রঘুরাজপুর গ্রামটা আমার বেশ লাগে। কি দারুণ সবুজ। একটা নৃত্যাঙ্গন ঘিরে ছোট্ট একটা স্টেডিয়াম। মাঝে জগন্নাথদেবের মন্দির। আর ওড়িশি নাচ তো জগতবিখ্যাত। গুরু কেলুচরন এই গ্রামেরই বাসিন্দা ছিলেন। তার সেই বাড়ী আজ ভগ্নস্তুপ। কেউ তার স্মৃতিটুকু বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টাই করেনি। এতদিন জানতাম বাঙালীই শুধু আত্মবিস্মৃত জাতি। আমাদের প্রতিবেশী রাজ্য ওড়িশাও কম নয়। সেসব যাইহোক, রঘুরাজপুর আমার বেশ পছন্দের গ্রাম।  আগে যদি জানতুম তাহলে এখানেই হয়তো বিয়েশাদি করে থিতু হতেম। তাম্বুল খাইতাম আর কি করতাম?  আঁকা আমার কম্ম নয়। হাতের লেখাই কাগের ঠ্যাং বগের ঠ্যাং, তার উপরে আঁকা? হবে নি? ওড়িশি নাচ, তাও নয়। তবে পান্ডাগিরিই করতাম। এটা আমায় ঠিক মানিয়ে যেতো। ভগবানের হয়ে দালালি সে কি কম হালালের কাজ? 


যাক, এসব। এর একটা দ্বিতীয় পর্বও আছে। পুরীর চ্যাঙ ওওয়া তে লাঞ্চ। চমৎকার ছিমছাম রেস্তোরাঁ। দুপুরে খুব লোকজন ছিলেন না। অনেকের রিকমেন্ডেশন ছিলো এখানে আসার জন্যে। তাই এলাম। আমি সেইরকম চীনে খাবারের ভক্ত নই। তবুও এসেই।গেলাম।  বেশ ভালো। আমিও রেকমেন্ড করছি আসার জন্যে। আমরা খেলাম থাই সুপ, কুং ফু চিকেন আর মিক্সড ফ্রায়েড রাইস। পরিমাণে যথেষ্ট আর স্বাদিষ্ঠ ।  টোটাল বিল ৮৪০ টংকা মাত্র। এটুকু এফোর্ড করাই চলে। তবে চাইনিজ হোক, চাই মুঘলাই আমার আসল পছন্দের খাবার ছ্যাঁচড়া। আমার স্বভাব চরিত্রের সাথে বেশ মেলে। শুধু আমি কেন, বাঙালী চরিত্রের আসল দিকই হলো, ছ্যাঁচড়ামি । ছ্যাঁচড়া আমাদের জাতীয় খাবার আর ছ্যাঁচড়ামি বাঙালীর জাতীয় চরিত্র। জয় জগন্নাথ।

Wednesday, 15 July 2026

পুরুলিয়ায়

 

আমাদের শেকড়বাকড় স্বজন বন্ধুরা সবই রঘুনাথগঞ্জের । আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাস ২৫০ বছরেরও বেশী। তার আগে আমাদের আদিবাড়ী ছিল কাঞ্চনতলা গ্রাম, ফারাক্কা যাবার পথে। আগে আমার লেখা যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় জেনে গেছেন আমাদের পুর্বজরা পেশাতে ছিলেন ডাকাত। পরে নবাব নাজিমদের আনুকুল্যে প্রচুর ভুসম্পতির মালিক হন। সাঁওতাল পরগণা, মুর্শীদাবাদ, মীর্জাপুর আরো বহু অঞ্চলে জমিদারী বিস্মৃত করেন নবাবী পাট্টার জোরে।এর অনেকটাই আমার দেখা।তবে জমি যে বাপের হয়না দাপের এটা আমার জীবনেই পরীক্ষিত সত্য।পদ্মার গর্ভে আর অযোগ্য উত্তরপুরুষদের হাতে পরে তাই সবই হোল বেহাত আর বেশ কিছুটা গেল পদ্মার গর্ভে। পাপের শাস্তি বোধহয়। তবে আমার মাঝে মাঝে আফসোস হয় । যদি পূর্বপুরুষদের জীনের এককণাও পেতুম, তাহলে বেশ তোলাবাজ,রংবাজ হয়ে বেশ কাল কেটে যেত। হা করে বসে থাকতে হত না ডিএ বাড়ল না কমল সেই দিকে তাকিয়ে। 

বড্ড ধান ভানতে শীবের গীত হয়ে যাচ্ছে। আসল কথায় ফেরা যাক। আমার জন্ম, দেশ সবই রঘুনাথগঞ্জে। কিন্তু এখানে আমাদের খুব বেশীদিন থাকা হয়নি। বাবার বদলীর চাকরী। দুতিন বছর অন্তর অন্তর আমরাও পাঁচ ভাইবোন হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনখানে করে বেরিয়েছি। তাই আমার শৈশব কৈশোর কাল শুধু রঘুনাথগঞ্জে নয়, ছড়িয়ে আছে পুরুলিয়া, মেজিয়া, জিয়াগঞ্জ আর লালবাগের আকাশে বাতাসে। 

জিয়াগঞ্জে কেটেছে আমার পাঠশালা কাল। ভুজঙ্গ মাষ্টারের পাঠশালায়। আমার সেই সময়ের কথা আমি আগেই লিখেছি। তাতে যেমন ভুজঙ্গ মাষ্টার আছেন,হরিশ দাদু আছেন, আছে আমার বন্ধু কচু আর জিয়াগঞ্জের সেই তেনারা, সন্ধ্যের পর যাদের নাম নিতে মানা। এই তেনাদের সাথে আমার প্রায়ই মুলাকাত হয়েছে সে জিয়াগঞ্জের আধো অন্ধকার গলিতে বা লালবাগে নবাবী আমলের প্রাসাদে। তারা আমার কোন ক্ষতি তো করেনইনি হয়তবা স্বগোত্রীয় ভেবে কিছুই প্রশয়ই দিয়েছেন। 

যাক সেসব কথা তেনারা আছেন তেনাদের জায়গায়, তাদের বিরক্ত করার দরকার কি। তবে আছেন, এটা জেনে রাখুন। হচ্ছিল জিয়াগঞ্জের কথা হটাত তেনারা এসে পরলেন।বরং জিয়াগঞ্জকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। কারণ জিয়াগঞ্জের কথা আগেই লিখেছি। কারুর যদি ইচ্ছে হয় আমার টাইমলাইলে পড়ে নেবেন। 

এখন বরং আমার সঙ্গে চলুন পুরুলিয়া।পুরুলিয়াও আমার মনে ছাপ রেখে গেছে। পুরুলিয়ায় আমরা ছিলাম প্রথমে নীলকুঠিডাঙায়। বেশ সুন্দর পাড়া, ছিমছাম।আমাদের বাড়ীর সামনেই ছিল এক্ জজসাহেবের বাড়ী। তার নাম আজ আর মনে নেই। তবে জজসাহেবের বাড়ীর সুন্দরী মেয়ে বউরা রোজ বিকেলেই আমার মা বা দিদির কাছে আসতেন গল্প করতে। এতসব কথার মধ্যে মার কথা বলাই হয়নি। মা ছিল বেশ গপ্পে মানুষ। তাই আসর জমজমাটই হত। তবে আমি ছিলাম মুখচোরা। মিশতে পারতাম না মোটেই। আমার দিদিরা তাই আমাকে বলত ‘মিচকে শয়তান’। আমার ফেবুর বন্ধুরা অনেকেই খুশী হবে। আর শান্তি নিশ্চয় হাততালি দিচ্ছে এতক্ষনে। আমার দাদা ওখানে ভর্তি হয়েছিল জেকে কলেজে, দিদি নিস্তারিনী কলেজে,অলকা দিদি শান্তিময়ী গার্লস স্কুলে।

আমি ভর্তি হলাম শিশুশিক্ষা বলে একটা স্কুলে এক ক্লাস উপরে। ওখানে তখন ওইরকম নিয়ম ছিল, বাংলা থেকে গেলেই একক্লাস ওপরে ভর্তি করে নেওয়া। আসলে পুরুলিয়া সবে তখন বিহার থেকে বাংলায় এসেছে। সেই স্কুলের কিছু স্মৃতি আজও মনে আছে। মনে আছে ওখানে আমাকে একটা নাটকে নিয়েছিল, রাজপুত্রের চরিত্রে। কিন্তু রাজপুত্র যে কারনে অকারনে শুধু হাসে। তাই পদচ্যুত হয়ে পেলাম মরা সৈনিকের পার্ট। তাতে হাসি তো বন্ধ হল না। মরা সৈনিক যে শুয়ে শুয়েও হাসে। অতএব আবার বাদ। এবার দেওয়া হল খাবার দেওয়ার কাজ, আবার বাদ,এবার এত বেশী বেশী করে দিতে থাকলাম, যে খাবারে টান পরে গেল। শিশুশিক্ষা থেকে এবার ভর্তি হলাম পুরুলিয়া জেলা স্কুলে। বিরাট স্কুল, বিরাট মাঠ। আড্ডা স্যার বলে একজনকে মনে আছে। খুব রাশভারী। ইংরেজী পড়াতেন প্রমথস্যার , তিনিও বেশ চড়া মেজাজের। ক্লাসে গন্ডগোল করার কোন উপায় ছিলনা। আর মনে আছে প্রথম ছৌ নাচ দেখার কথা। ভারী আশ্চর্য্য লেগেছিল। আমার ছোট্ট মনে বড় ছাপ ফেলে গিয়েছিল ওইসব ঝলমলে পোষাক আর নাচ। আমার ক্লাসে এক বন্ধু হয়েছিল, জেলা স্কুলের সামনেই বাড়ী।আমাকে নিয়ে যেত ওদের বাড়ী। ওদের বাড়ীতেই প্রথম একোয়ারিয়াম দেখেছিলাম। এর মধ্যে আমরা নীলকুঠীডাঙার বাসা ছেড়ে একটা বড় বাড়ী নিয়েছি হুচুকপাড়ায়। বাড়ীর পেছনে বাগান থেকে অযোধ্যা পাহাড় দেখা যেত দুরে।তবে সেই পাহাড়তলী থেকে কোন দইওয়ালা আসে নি, আসে নি কোন গোয়ালাদের মেয়েও আমার খোঁজে । এই হুচুকপাড়ার মুখে একটা বড় বাড়ী ছিল। সম্ভবত কোন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্তের। সেই বাড়ীতেই আমি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদকে দেখেছিলাম।

আর একজনের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তিনি জীমুতবাহন সেন। বিরাট সমাজসেবী,প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ত। পুরুলিয়ার অনেক স্কুল কলেজই ওর আনুকল্যে গড়া। সেই সেনসাহেবের বাড়ীতে সন্ধ্যেয় আড্ডা বসত। আমার বাবা সেখানে প্রায়ই যেতেন কখন কখনো আমিও গিয়েছি। যতদুর মনে পরে একটা পোর্টিকোর মত একটা জায়গা পেরিয়ে ঢুকতে হত। আর গেটের ওপরে সম্ভবত বোগেনভালিয়া বা ঝুমকোলতার গাছ ছিল। জীমুতবাহন সেন কে আপনারা নাই চিনতে পারেন। কিন্তু ফেবুর দীপক সেন কে অনেকেই চেনেন নিশ্চয়। দীপক সেন ওনারই ভাইপো। ছোটবেলায় দেখেছি নিশ্চয় পাত্তা দেয়নি মোটেই। এখনও যে দেয় এমনটি নয়।

পুরুলিয়ায় আমি একটু গালিও শিখেছিলুম। অদ্ভুত রকমের। ওখানকার ডায়ালেক্ট অনেকেই জানেন। বটেক, কিন্তুক কিন্তু সব কথার মধ্যে মিশে থাকে। ওখানে ভিক্টোরিয়া স্কুলের মাঠে খেলার সময় মারামারিতে একটা ছেলে আমাকে বলল, “তোকে পুলি  ছুড়ে মারবক কিন্ত।“ পুলি যে একটা অশ্লীল শব্দ পরে তা জানলাম।

ভাবছি আমার ধেড়ে বয়সের বন্ধুদের মধ্যে এটা চালু করে দেব আজ থেকেই। আজ আমাদের গেট্টু আছে। আজ পল্টাকেই ছুড়ে মারব প্রথম পুলিটা।

পুরুলিয়ার সাহেব বাঁধ তার লাল নীল মাছ, সুন্দর মানুষজন সবই গেথে আছে মনের মধ্যে। আর মনে আছে একটা বাচ্চা ছেলের কথা। যাকে রোজ হুচুকপাড়া থেকে চটের ব্যাগ আর পকেটে এক টাকা নিয়ে জজকোর্ট ছাড়িয়ে বাজার করতে আসতে হত। এক টাকায় তখন ব্যাগভর্তি বাজার। ফেরার সময় টানতে পারত না।পুরুলিয়ার গরমে তার ফর্সামুখ লাল হয়ে যেত। বসে পরত কোর্টের সামনে এক বেলগাছের নিচে। ভারী ব্যাগ এবার গলায় ঝুলিয়ে সে হাঁটতে শুরু করত, হাতে যে বড় ব্যাথা করত। আরে  সে বাচ্চা তো আমিই ছিলাম আজ তো মনে হয় সে অন্য কেউ। তাই তার জন্য ব্যাথায় মন টনটন করত। আজ পুরুলিয়া কান্ড এখানেই ইতি। এরপর পুরুলিয়া নিয়ে লিখবে দীপক। এবার আমি ফিরে যাব রঘুনাথগঞ্জে। সেখানে সুকুমারী ঠাকরুন, অলকাদিদি( আমি অবশ্য ওকে দিদি বলে কোনদিন মানিই নি, কিন্তু ওর চলে যাবার দিন কেন আজও ওর কথা মনে করে দুচোখ ছেপে জল নামে) আর ভোলা আরও অনেকে। এর পরের সংখ্যায়।


Thursday, 2 July 2026

ডিমের মিহিদানা

 ডিমের মিহিদানা 


কেউ শুনেছেন? আমি তো দুদিন আগেও এর কোন নাম শুনিনি। কিন্তু শুনতেই হলো।


ডিম শুনেছি, মিহিদানার সাথেও বেশ মাখামাখি সেই ছোটবেলা থেকেই।  কিন্তু এইরকম যে কিছু হতে পারে, তা আমার জানাশোনার বাইরে ছিল।

আমাদের ছোটোবেলায় ডিম সে একটা মহার্ঘ্য ব্যাপার ছিল। আসলে তখন তো এতো পোল্ট্রিও হয়নি। তাই ডিমের জোগান ছিল বেশ বেশ কম। মুরগির ডিম তখনো হিন্দুবাড়িতে নিষিদ্ধই ছিল। 

আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাড়ীতে ছিল কাজের মাসী চিন্তা আর তার বর ভরত, সে ছিল জলের ভারী। মিউনিসিপালিটির কল থেকে আমাদের খাবার জলের যোগান দিত। চিন্তার বাড়ি ছিল মাল পাড়ায়, আমাদের ফাঁসিপাড়ার বাড়ীর খুব কাছেই। তার দুদশটা হাঁস ছিল। সেই হাঁসের ডিম আমাদের দিত মাঝে মাঝে , সেদিন মনে হত খুব স্পেশাল একটা দিন। তবে সুতোয় কাঁটা হাফ ডিমই ছিল বরাদ্দ। তাই খেতাম তারিয়ে তারিয়ে, কুসুম ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কুসুমকে নিয়েই কেটে যেত বহুক্ষন। মানে খাওয়ার শেষে কুসুমে কুসুমে কুসুমময়। স্বাদটা বহুক্ষণ ধরে রাখতাম। আসলে সেইসময়কার মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতীক ছিল এই হাফ ডিমের গপ্প। আমাদের প্রজন্মের সবাই এই হাফ ডিম সমাজ থেকেই উঠে আসা। তবে সেই ডিম কিন্তু আজকের ডিমের থেকে অনেক আলাদা। দেশী হাঁসের নীলাভ ডিম, হোক হাফ তবু তার স্বাদ, আজও মনে গেঁথে আছে আর সেই যৌথ পরিবারের সুখী সুখী ছবিটাও বড় স্পষ্ট। সে ছিল বড় বড় সুখ আর ছোট ছোট দুঃখের দিন। 

আমার পিসি থাকতেন বহরমপুরের রাধারঘাটে। বেশ অবস্থাপন্ন। সেই সব দিনে যখন মোটরগাড়ি ছিল খুব হাতেগোনা তখন পিসির ঝা চকচকে গাড়ী। বহরমপুর থেকে প্রায়ই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চলে আসতেন। পিসির আসাটা ছিল এক উৎসব।  যে কদিন থাকতেন যেন দুগগা পূজোর আমেজ মাখা। পিসি আমার ডিম প্রীতির কথা জেনে করে দিলেন গোটা গোটা ডিমের ডালনা। এর পরে আর কি কোন কথা থাকতে পারে? ডিম পর্বের এখানেই শেষ। 


এবার আসি মিহিদানায়। দুএকবার খেয়েছি ঠিকই। কিন্তু কোনদিনই খুব ভালো লেগেছে বলে মনে পড়েনা। ট্রেনে যাওয়ার পথে বর্ধমান ষ্টেশনে দেখতাম খুব মিহিদানা আর সীতাভোগ বিক্রি করত। মিহিদানা আর সীতাভোগের সাথে আমার নিবিড় পরিচয় এই বর্ধমানেই।  বর্ধমানের ব্র‍্যাণ্ড এমবাসাডর কিন্তু এখনো এই মিহিদানা আর সীতাভোগ।  আর এই স্পেশালিটি মিষ্টির এক নম্বর দোকান গণেশের দোকান। আগে কার্জন গেটের অনেক ভেতরে ছিল গণেশের দোকান।  এখন বড় রাস্তায় তিনকোনিয়া বাস স্ট্যান্ডের কাছে বিরাট দোকান করেছে। রমরমে ব্যাবসা। লোকের যতই সুগার হোক, এর চাহিদা বেড়েছে বই কমেনি।

তবে আমার কিন্তু সীতাভোগই বেশী পছন্দের। তাও বর্ধমানের নয়, এই কলকাতারই। আমি তিনবছর স্টেট ব্যাঙ্কের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির চার্জে ছিলুম।সেই সময় বহুগুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম।  সুরঞ্জন দাস, চিন্ময় গুহ আরো বহু বহু জনের। এদের সাথে আজ আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু পুঁটিরামের সীতাভোগের সাথে আজও আমার অন্তরঙ্গ যোগাযোগ রয়ে গেছে। সেরা সীতাভোগ অবশ্যই কলেজ স্কোয়ারের পুঁটিরামের দোকানের। পেতে পারেন যদি সকাল সকাল যান। খুব চাহিদা,  আস্তে না আসতেই উধাও হয়ে যায়।


ডিম হলো, মিহিদানাও হলো। সীতাভোগও পরিবেশন করলাম অতিরিক্ত।  এবার তাহলে তৈরি থাকুন ডিমের মিহিদানার জন্যে। এটা বাংলাদেশী রেসিপি৷ এই বাংলায় এই পদের পদকর্তা আমার কন্যাসমা রাধিকা,শ্যালিকা কন্যা।  যা আমাদেরও বিনোদিত করছে কখনো কখনো । দারুণ লাগলো খেতে।  সাধারণ মিহিদানা নয়। মিষ্টি মিষ্টি ডিম ডিম। It’s different. সঙ্গে ডিমের মিহিদানা তৈরির ভিডিও দেখে নিন ইউ টিউবে। মেয়ে বা বউমাকে বলুন একদিন তৈরি করে খাওয়াবে। ভাল লাগলে রাধিকাকে ধন্যবাদ দেবেন। না লাগলে চেপে যান।😁