ডিমের মিহিদানা
কেউ শুনেছেন? আমি তো দুদিন আগেও এর কোন নাম শুনিনি। কিন্তু শুনতেই হলো।
ডিম শুনেছি, মিহিদানার সাথেও বেশ মাখামাখি সেই ছোটবেলা থেকেই। কিন্তু এইরকম যে কিছু হতে পারে, তা আমার জানাশোনার বাইরে ছিল।
আমাদের ছোটোবেলায় ডিম সে একটা মহার্ঘ্য ব্যাপার ছিল। আসলে তখন তো এতো পোল্ট্রিও হয়নি। তাই ডিমের জোগান ছিল বেশ বেশ কম। মুরগির ডিম তখনো হিন্দুবাড়িতে নিষিদ্ধই ছিল।
আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাড়ীতে ছিল কাজের মাসী চিন্তা আর তার বর ভরত, সে ছিল জলের ভারী। মিউনিসিপালিটির কল থেকে আমাদের খাবার জলের যোগান দিত। চিন্তার বাড়ি ছিল মাল পাড়ায়, আমাদের ফাঁসিপাড়ার বাড়ীর খুব কাছেই। তার দুদশটা হাঁস ছিল। সেই হাঁসের ডিম আমাদের দিত মাঝে মাঝে , সেদিন মনে হত খুব স্পেশাল একটা দিন। তবে সুতোয় কাঁটা হাফ ডিমই ছিল বরাদ্দ। তাই খেতাম তারিয়ে তারিয়ে, কুসুম ছিল সবচেয়ে প্রিয়। কুসুমকে নিয়েই কেটে যেত বহুক্ষন। মানে খাওয়ার শেষে কুসুমে কুসুমে কুসুমময়। স্বাদটা বহুক্ষণ ধরে রাখতাম। আসলে সেইসময়কার মধ্যবিত্ত সমাজের প্রতীক ছিল এই হাফ ডিমের গপ্প। আমাদের প্রজন্মের সবাই এই হাফ ডিম সমাজ থেকেই উঠে আসা। তবে সেই ডিম কিন্তু আজকের ডিমের থেকে অনেক আলাদা। দেশী হাঁসের নীলাভ ডিম, হোক হাফ তবু তার স্বাদ, আজও মনে গেঁথে আছে আর সেই যৌথ পরিবারের সুখী সুখী ছবিটাও বড় স্পষ্ট। সে ছিল বড় বড় সুখ আর ছোট ছোট দুঃখের দিন।
আমার পিসি থাকতেন বহরমপুরের রাধারঘাটে। বেশ অবস্থাপন্ন। সেই সব দিনে যখন মোটরগাড়ি ছিল খুব হাতেগোনা তখন পিসির ঝা চকচকে গাড়ী। বহরমপুর থেকে প্রায়ই ছেলে মেয়েকে নিয়ে চলে আসতেন। পিসির আসাটা ছিল এক উৎসব। যে কদিন থাকতেন যেন দুগগা পূজোর আমেজ মাখা। পিসি আমার ডিম প্রীতির কথা জেনে করে দিলেন গোটা গোটা ডিমের ডালনা। এর পরে আর কি কোন কথা থাকতে পারে? ডিম পর্বের এখানেই শেষ।
এবার আসি মিহিদানায়। দুএকবার খেয়েছি ঠিকই। কিন্তু কোনদিনই খুব ভালো লেগেছে বলে মনে পড়েনা। ট্রেনে যাওয়ার পথে বর্ধমান ষ্টেশনে দেখতাম খুব মিহিদানা আর সীতাভোগ বিক্রি করত। মিহিদানা আর সীতাভোগের সাথে আমার নিবিড় পরিচয় এই বর্ধমানেই। বর্ধমানের ব্র্যাণ্ড এমবাসাডর কিন্তু এখনো এই মিহিদানা আর সীতাভোগ। আর এই স্পেশালিটি মিষ্টির এক নম্বর দোকান গণেশের দোকান। আগে কার্জন গেটের অনেক ভেতরে ছিল গণেশের দোকান। এখন বড় রাস্তায় তিনকোনিয়া বাস স্ট্যান্ডের কাছে বিরাট দোকান করেছে। রমরমে ব্যাবসা। লোকের যতই সুগার হোক, এর চাহিদা বেড়েছে বই কমেনি।
তবে আমার কিন্তু সীতাভোগই বেশী পছন্দের। তাও বর্ধমানের নয়, এই কলকাতারই। আমি তিনবছর স্টেট ব্যাঙ্কের ক্যালকাটা ইউনিভার্সিটির চার্জে ছিলুম।সেই সময় বহুগুণীজনের সান্নিধ্য পেয়েছিলাম। সুরঞ্জন দাস, চিন্ময় গুহ আরো বহু বহু জনের। এদের সাথে আজ আর যোগাযোগ নেই। কিন্তু পুঁটিরামের সীতাভোগের সাথে আজও আমার অন্তরঙ্গ যোগাযোগ রয়ে গেছে। সেরা সীতাভোগ অবশ্যই কলেজ স্কোয়ারের পুঁটিরামের দোকানের। পেতে পারেন যদি সকাল সকাল যান। খুব চাহিদা, আস্তে না আসতেই উধাও হয়ে যায়।
ডিম হলো, মিহিদানাও হলো। সীতাভোগও পরিবেশন করলাম অতিরিক্ত। এবার তাহলে তৈরি থাকুন ডিমের মিহিদানার জন্যে। এটা বাংলাদেশী রেসিপি৷ এই বাংলায় এই পদের পদকর্তা আমার কন্যাসমা রাধিকা,শ্যালিকা কন্যা। যা আমাদেরও বিনোদিত করছে কখনো কখনো । দারুণ লাগলো খেতে। সাধারণ মিহিদানা নয়। মিষ্টি মিষ্টি ডিম ডিম। It’s different. সঙ্গে ডিমের মিহিদানা তৈরির ভিডিও দেখে নিন ইউ টিউবে। মেয়ে বা বউমাকে বলুন একদিন তৈরি করে খাওয়াবে। ভাল লাগলে রাধিকাকে ধন্যবাদ দেবেন। না লাগলে চেপে যান।😁
No comments:
Post a Comment