আমার ছোটবেলা-২
আমাদের শেকড়বাকড় স্বজন বন্ধুরা সবই রঘুনাথগঞ্জের । আমাদের রঘুনাথগঞ্জের বাস ২৫০ বছরেরও বেশী। তার আগে আমাদের আদিবাড়ী ছিল কাঞ্চনতলা গ্রাম, ফারাক্কা যাবার পথে। আগে আমার লেখা যারা পড়েছেন তারা নিশ্চয় জেনে গেছেন আমাদের পুর্বজরা পেশাতে ছিলেন ডাকাত। পরে নবাব নাজিমদের আনুকুল্যে প্রচুর ভুসম্পতির মালিক হন। সাঁওতাল পরগণা, মুর্শীদাবাদ, মীর্জাপুর আরো বহু অঞ্চলে জমিদারী বিস্মৃত করেন নবাবী পাট্টার জোরে।এর অনেকটাই আমার দেখা।তবে জমি যে বাপের হয়না দাপের এটা আমার জীবনেই পরীক্ষিত সত্য।পদ্মার গর্ভে আর অযোগ্য উত্তরপুরুষদের হাতে পরে তাই সবই হোল বেহাত আর বেশ কিছুটা গেল পদ্মার গর্ভে। পাপের শাস্তি বোধহয়। তবে আমার মাঝে মাঝে আফসোস হয় । যদি পূর্বপুরুষদের জীনের এককণাও পেতুম, তাহলে বেশ তোলাবাজ,রংবাজ হয়ে বেশ কাল কেটে যেত। হা করে বসে থাকতে হত না ডিএ বাড়ল না কমল সেই দিকে তাকিয়ে।
বড্ড ধান ভানতে শীবের গীত হয়ে যাচ্ছে। আসল কথায় ফেরা যাক। আমার জন্ম, দেশ সবই রঘুনাথগঞ্জে। কিন্তু এখানে আমাদের খুব বেশীদিন থাকা হয়নি। বাবার বদলীর চাকরী। দুতিন বছর অন্তর অন্তর আমরাও পাঁচ ভাইবোন হেথা নয় হোথা নয় অন্য কোথা অন্য কোনখানে করে বেরিয়েছি। তাই আমার শৈশব কৈশোর কাল শুধু রঘুনাথগঞ্জে নয়, ছড়িয়ে আছে পুরুলিয়া, মেজিয়া, জিয়াগঞ্জ আর লালবাগের আকাশে বাতাসে।
জিয়াগঞ্জে কেটেছে আমার পাঠশালা কাল। ভুজঙ্গ মাষ্টারের পাঠশালায়। আমার সেই সময়ের কথা আমি আগেই লিখেছি। তাতে যেমন ভুজঙ্গ মাষ্টার আছেন,হরিশ দাদু আছেন, আছে আমার বন্ধু কচু আর জিয়াগঞ্জের সেই তেনারা, সন্ধ্যের পর যাদের নাম নিতে মানা। এই তেনাদের সাথে আমার প্রায়ই মুলাকাত হয়েছে সে জিয়াগঞ্জের আধো অন্ধকার গলিতে বা লালবাগে নবাবী আমলের প্রাসাদে। তারা আমার কোন ক্ষতি তো করেনইনি হয়তবা স্বগোত্রীয় ভেবে কিছুই প্রশয়ই দিয়েছেন।
যাক সেসব কথা তেনারা আছেন তেনাদের জায়গায়, তাদের বিরক্ত করার দরকার কি। তবে আছেন, এটা জেনে রাখুন। হচ্ছিল জিয়াগঞ্জের কথা হটাত তেনারা এসে পরলেন।বরং জিয়াগঞ্জকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে যায়। কারণ জিয়াগঞ্জের কথা আগেই লিখেছি। কারুর যদি ইচ্ছে হয় আমার টাইমলাইলে পড়ে নেবেন।
এখন বরং আমার সঙ্গে চলুন পুরুলিয়া।পুরুলিয়াও আমার মনে ছাপ রেখে গেছে। পুরুলিয়ায় আমরা ছিলাম প্রথমে নীলকুঠিডাঙায়। বেশ সুন্দর পাড়া, ছিমছাম।আমাদের বাড়ীর সামনেই ছিল এক্ জজসাহেবের বাড়ী। তার নাম আজ আর মনে নেই। তবে জজসাহেবের বাড়ীর সুন্দরী মেয়ে বউরা রোজ বিকেলেই আমার মা বা দিদির কাছে আসতেন গল্প করতে। এতসব কথার মধ্যে মার কথা বলাই হয়নি। মা ছিল বেশ গপ্পে মানুষ। তাই আসর জমজমাটই হত। তবে আমি ছিলাম মুখচোরা। মিশতে পারতাম না মোটেই। আমার দিদিরা তাই আমাকে বলত ‘মিচকে শয়তান’। আমার ফেবুর বন্ধুরা অনেকেই খুশী হবে। আর শান্তি নিশ্চয় হাততালি দিচ্ছে এতক্ষনে। আমার দাদা ওখানে ভর্তি হয়েছিল জেকে কলেজে, দিদি নিস্তারিনী কলেজে,অলকা দিদি শান্তিময়ী গার্লস স্কুলে।
আমি ভর্তি হলাম শিশুশিক্ষা বলে একটা স্কুলে এক ক্লাস উপরে। ওখানে তখন ওইরকম নিয়ম ছিল, বাংলা থেকে গেলেই একক্লাস ওপরে ভর্তি করে নেওয়া। আসলে পুরুলিয়া সবে তখন বিহার থেকে বাংলায় এসেছে। সেই স্কুলের কিছু স্মৃতি আজও মনে আছে। মনে আছে ওখানে আমাকে একটা নাটকে নিয়েছিল, রাজপুত্রের চরিত্রে। কিন্তু রাজপুত্র যে কারনে অকারনে শুধু হাসে। তাই পদচ্যুত হয়ে পেলাম মরা সৈনিকের পার্ট। তাতে হাসি তো বন্ধ হল না। মরা সৈনিক যে শুয়ে শুয়েও হাসে। অতএব আবার বাদ। এবার দেওয়া হল খাবার দেওয়ার কাজ, আবার বাদ,এবার এত বেশী বেশী করে দিতে থাকলাম, যে খাবারে টান পরে গেল। শিশুশিক্ষা থেকে এবার ভর্তি হলাম পুরুলিয়া জেলা স্কুলে। বিরাট স্কুল, বিরাট মাঠ। আড্ডা স্যার বলে একজনকে মনে আছে। খুব রাশভারী। ইংরেজী পড়াতেন প্রমথস্যার , তিনিও বেশ চড়া মেজাজের। ক্লাসে গন্ডগোল করার কোন উপায় ছিলনা। আর মনে আছে প্রথম ছৌ নাচ দেখার কথা। ভারী আশ্চর্য্য লেগেছিল। আমার ছোট্ট মনে বড় ছাপ ফেলে গিয়েছিল ওইসব ঝলমলে পোষাক আর নাচ। আমার ক্লাসে এক বন্ধু হয়েছিল, জেলা স্কুলের সামনেই বাড়ী।আমাকে নিয়ে যেত ওদের বাড়ী। ওদের বাড়ীতেই প্রথম একোয়ারিয়াম দেখেছিলাম। এর মধ্যে আমরা নীলকুঠীডাঙার বাসা ছেড়ে একটা বড় বাড়ী নিয়েছি হুচুকপাড়ায়। বাড়ীর পেছনে বাগান থেকে অযোধ্যা পাহাড় দেখা যেত দুরে।তবে সেই পাহাড়তলী থেকে কোন দইওয়ালা আসে নি, আসে নি কোন গোয়ালাদের মেয়েও আমার খোঁজে । এই হুচুকপাড়ার মুখে একটা বড় বাড়ী ছিল। সম্ভবত কোন রাজনৈতিক ব্যাক্তিত্তের। সেই বাড়ীতেই আমি বাবু রাজেন্দ্রপ্রসাদকে দেখেছিলাম।
আর একজনের কথা বলতে ইচ্ছে করছে। তিনি জীমুতবাহন সেন। বিরাট সমাজসেবী,প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ত। পুরুলিয়ার অনেক স্কুল কলেজই ওর আনুকল্যে গড়া। সেই সেনসাহেবের বাড়ীতে সন্ধ্যেয় আড্ডা বসত। আমার বাবা সেখানে প্রায়ই যেতেন কখন কখনো আমিও গিয়েছি। যতদুর মনে পরে একটা পোর্টিকোর মত একটা জায়গা পেরিয়ে ঢুকতে হত। আর গেটের ওপরে সম্ভবত বোগেনভালিয়া বা ঝুমকোলতার গাছ ছিল। জীমুতবাহন সেন কে আপনারা নাই চিনতে পারেন। কিন্তু ফেবুর দীপক সেন কে অনেকেই চেনেন নিশ্চয়। দীপক সেন ওনারই ভাইপো। ছোটবেলায় দেখেছি নিশ্চয় পাত্তা দেয়নি মোটেই। এখনও যে দেয় এমনটি নয়।
পুরুলিয়ায় আমি একটু গালিও শিখেছিলুম। অদ্ভুত রকমের। ওখানকার ডায়ালেক্ট অনেকেই জানেন। বটেক, কিন্তুক কিন্তু সব কথার মধ্যে মিশে থাকে। ওখানে ভিক্টোরিয়া স্কুলের মাঠে খেলার সময় মারামারিতে একটা ছেলে আমাকে বলল, “তোকে পুলি ছুড়ে মারবক কিন্ত।“ পুলি যে একটা অশ্লীল শব্দ পরে তা জানলাম।
ভাবছি আমার ধেড়ে বয়সের বন্ধুদের মধ্যে এটা চালু করে দেব আজ থেকেই। আজ আমাদের গেট্টু আছে। আজ পল্টাকেই ছুড়ে মারব প্রথম পুলিটা।
পুরুলিয়ার সাহেব বাঁধ তার লাল নীল মাছ, সুন্দর মানুষজন সবই গেথে আছে মনের মধ্যে। আর মনে আছে একটা বাচ্চা ছেলের কথা। যাকে রোজ হুচুকপাড়া থেকে চটের ব্যাগ আর পকেটে এক টাকা নিয়ে জজকোর্ট ছাড়িয়ে বাজার করতে আসতে হত। এক টাকায় তখন ব্যাগভর্তি বাজার। ফেরার সময় টানতে পারত না।পুরুলিয়ার গরমে তার ফর্সামুখ লাল হয়ে যেত। বসে পরত কোর্টের সামনে এক বেলগাছের নিচে। ভারী ব্যাগ এবার গলায় ঝুলিয়ে সে হাঁটতে শুরু করত, হাতে যে বড় ব্যাথা করত। আরে সে বাচ্চা তো আমিই ছিলাম আজ তো মনে হয় সে অন্য কেউ। তাই তার জন্য ব্যাথায় মন টনটন করত। আজ পুরুলিয়া কান্ড এখানেই ইতি। এরপর পুরুলিয়া নিয়ে লিখবে দীপক। এবার আমি ফিরে যাব রঘুনাথগঞ্জে। সেখানে সুকুমারী ঠাকরুন, অলকাদিদি( আমি অবশ্য ওকে দিদি বলে কোনদিন মানিই নি, কিন্তু ওর চলে যাবার দিন কেন আজও ওর কথা মনে করে দুচোখ ছেপে জল নামে) আর ভোলা আরও অনেকে। এর পরের সংখ্যায়।
No comments:
Post a Comment