Tuesday, 25 August 2026

লালপরী আর নীলপরীরা

 লালপরী,নীলপরী আর বাখরখানি 


লালবাগ যারা গেছেন, তারা নিশ্চয়ই পাঁচরাহার মোড় চেনেন। পাঁচরাহা কি নিশ্চয়ই বুঝেছেন। পাঁচ রাস্তার মোড়। এক রাহা চলে গেল ভাগীরথীর পানে যেখানে থাকত ছোটখাটো চেহারার জ্যোতিকণা। ভারী সুন্দর, বিষন্নও যেন। হটাৎ ওর মুখটা ভেসে উঠল মনের কোনে। ভারী দুঃখী মেয়ে। আর এর একদিকে কেল্লা নিজামত।  যার দক্ষিণ দরজা পেরিয়েই আমাদের রাজত্ব। আমাদের আড্ডার জায়গা, রোমান গথিক স্টাইলের প্রাচীরের গায়ে গঙ্গার ধার ঘেষে আমাদের আড্ডা। সামনে সুমহান হাজারদুয়ারী।  সেছিল এক স্বপ্নের দিন। রইল বাকী তিন রাহা। একদিক গেছে হাতীশাল। আর একদিকে বিরাট আস্তাবল। আজ আর ঘোড়া নেই। দোকানে দোকানে ভরে আছে। আর একদিক গেছে খাগড়ার দিকে, মাঝে মহারাজ নন্দকুমারের বাড়ী, কাশিমবাজারের মহারাজের বাড়ী পেরিয়ে বহরমপুর শহর। যেখানে আমরা হরহামেশাই সাইকেল চালিয়ে সিনেমা দেখতে যেতাম। আশা পারেখের সিনেমা। আমাদের কালের বুক ঢিপঢিপ করা হিরোইন। তার ছলছলে চোখ আমাদের বুকে উথালপাতাল ঝড় তুলে যেত। আর সন্ধ্যেবেলা গাছমছম অন্ধকারের মধ্যে বটপাকুড়ের অন্ধকার ছায়া পেরিয়ে ফিরে আসতাম এই ছোট্ট শহরেই। পাঁচরাহা, এই ছোট্ট ঐতিহাসিক শহরেরই প্রাণকেন্দ্র। ছোট্টই বা বলি কি করে? এককালে বাংলা,বিহার, ওড়িশার রাজধানী। কম কথা তো নয়। সেকালের লন্ডনের থেকেও জাঁকে জমকে ভারী ওজনদার শহর। আজও তো তার কিছু চিহ্ন রয়েই গেছে। নবাব,বাদশাহ, হাতীশালে হাতী, আস্তাবলে সব বড় বড় ঘোড়া, এসব তো আমরাই দেখেছি। তবে নবাব আমাদের কালে হয়ে রইল ছোটে নবাব। আমাদের এক ক্লাসের বন্ধু। রাজত্ব হারিয়ে সেও মিশে গেল আমজনতার মাঝে। মতিঝিলের মসজিদের পাশের আমবাগানের ডালে বসে বিড়ি ফোঁকা ছোটে নবাব আমাদের মত পাত্র মিত্র অমাত্যদের সাথে,রাজকার্য ভুলে মশগুল হয়ে আড্ডায় মেতে রইত।


পাঁচরাহার দোকান, হাটবাজার বাস স্টপ, নবাবের আস্তাবল, হাতীশাল। কুঁড়াদার সেলুন, ঝুমুর চপের দোকান, অমল মোদকের মিষ্টির দোকান, নীরোদবাবুর বেকারি,জামাইয়ের মিষ্টির দোকান, আজ হয়ত আর নেই।  রয়ে গেছে স্মৃতিতে।  ইতিহাস আর বর্তমানে হাত ধরাধরি করে চলা এক ভারী মনখারাপের জায়গা। কেল্লায় আড্ডা ফেরত আমরা জামাইয়ের মিষ্টির দোকানের ধাপিতে বসতাম কিছুটা সময়। অপেক্ষায় থাকতাম কখন যাবে লালপরী আর নীলপরির দল । এরা সব লালবাগের সেরা সুন্দরীদের ঝাঁক। পৃথিবীর সেরা সুন্দরী সব। আমাদের সামনে দিয়ে সদর্পে বেড়িয়ে যেত। আড়চোখে দেখত অবশ্যই। সেটাই ছিল তখন বিরাট প্রাপ্তি। আর ছিল বেকারির গরম গরম বাখরখানি। তার তুল্য স্বাদ আর কোথাও  পাইনি। আসলে কৈশোরের স্বাদ কি আর ফিরে পাওয়া যায়?

এটা কোন গপ্প নই,স্মৃতিকথা তো নয়ই। আজ জ্বরের ঘোরে আধেক ঘুমে আধেক জাগরণে এসে ফিরে গেল লালপরী আর নীলপরীদের দল। বাখরখানির স্বাদ এখনো যে মুখে লেগে আছে। সে-তো মিথ্যে নয়। এসেছিল তারা, ফিরেও গেল। কোথায় কে জানে?

Saturday, 8 August 2026

ভবানীদার গল্প

কতই বা বয়স হবে আমাদের  তখন ১৪/১৫,  তার বেশী নয়। এমন কিছু আগের নয়। আসলে এখন ৫৫/৬০ বছর সময় আমার কাছে কোন সময়ই নয়। নেহাৎই কালকের কথা। সময়ের হিসেব একেবারে পালটে গেছে। আর পালটানোর আসল হোতা হচ্ছে ছোটকা। ছোটকা কিন্তু আমার কাকা বা জ্যাঠা কেউ নয়। ছোটকা আমাদের ফ্যামিলির সবচেয়ে ছোট সদস্য। তাই আমার কাছে কখনও ও ছোটকা, কখনও বা টুটুম। ওর আর একটা নাম আছে যেটা আমার এক্কেবারে পছন্দ নয়। আর সেইজন্য সেটা নিয়ে আমি পাঁচ কান করতেও চাইনা। তবে যা বলছিলাম ৫৫/৬০ বছর কেন আমার কাছে, কোন সময়ই নয়? কারণ আমার সাথে টুটুমের যা কিছু গপ্পসপ্প, সব আলোকবর্ষের হিসেবে।  এই মহাবিশ্ব নিয়ে ওর ভারী আকর্ষণ। রাত্রে ও আমার পাশে শুয়ে ওর প্রশ্নের ঝাঁপি খুলে বসে।আর ওর সব কিছু প্রশ্নই এই আকাশ  আর বিশাল মহাবিশ্ব ঘিরে। ও ওর দাদুকে ভাবে ভারী পন্ডিত গোছের কিছু।তাই আমাকেও ওর প্রশ্নের উত্তর নিয়ে তৈরি থাকতে হয়। চন্দ্র, সূর্য্য, তারা শুধু নয়। ওর আকর্ষণ আরো গভীরে।  নোভা,সুপারনোভা, নিউট্রন, নেবুলা আর এখন শুধু ব্ল্যাকহোল।  আর এ সবের মূলে কিন্তু ইউটিউব। কম্পিউটারের পর্দায় ওর দেখার বিষয় হল এই সব মহাজাগতিক বিষ্ময়। ওটা নিয়ে ওর ভয় ও ভাবনা দুটোই আছে। ব্ল্যাকহোল কতদুরে? সব আলোকবর্ষের হিসেব। কত মিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে সেটা বুঝতে, বোঝাতে আমার ভারী মাথা খাটাতে হয়। তবে আমরা দুজনেই একসময় পৌঁছে যায় ব্ল্যাকহোলের দোরগোড়ায়। ওর ভারী ভয়, ওর দাদু যেন হারিয়ে না যায় ব্ল্যাকহোলের অতল গভীরে। আমি বোঝায় ভয় কিসের, ব্ল্যাকহোল দিয়ে ঢুকে ঠিক বেরিয়ে আসব হোয়াইট হোল দিয়ে।  জীবনও তো তাই। জীবনের অজস্র ফুটোফোটার ব্লাকহোল পেরিয়ে বাঁচবার পন্থা নিশ্চয়ই আছে। শুধু পথটা চিনে নেওয়া চাই। হোয়াইট হোল তো আছেই, আমাদের সবার অপেক্ষায়। 

বলতে যাচ্ছিলাম আমাদের নবাব বাহাদুর স্কুলের ল্যাব এসিস্ট্যান্ট ভবানীদার কথা, চলে এলাম বহুদুরে। তবে এ পথ পেরোতে আমার সময় লাগবে না মোটেই।  কল্পনার দৌড় থাকলে অতীত, বর্তমান আর ভবিষ্যতের ভারী হাত ধরাধরি ভাব। তাহলে শুরু করি? সে একটা দুষ্টু মিষ্টি গল্প। ভবানীদা ছিলেন আমাদের কেমিষ্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ল্যাব এসিস্ট্যান্ট।  আর আমার বয়সী ছেলেদের হাত দেখতে তার বেশ আগ্রহ। বেশি কিছু লাগত না। স্কুল ক্যানটিনে এক কাপ চা, বিস্কুট খাওয়ালেই ভবানীদা ভারী মনোযোগ সহকারে  আমাদের হাত নিয়ে বসে পরতেন তা নিরীক্ষণ করতে। আর আমাদের বয়সী ছেলেদের মনের গতি প্রকৃতি তার ভারী জানা। বিড়িতে একটা লম্বা টান দিয়ে বলতেন, 'বুঝলে নিলু, একজন তোমাকে খুব পছন্দ করে।" ১৫ বছরের নবীন হৃদয়,  সে অচেনা ত্রয়োদশী বা চতুর্দশীর সম্ভাবনায় ধড়ফড় করে ওঠে। ' স্কুলে আসার পথে দেখবে তো ভাল করে, একটা বিনুনী দোলানো মিষ্টি মেয়ে তোমার দিকে আড়চোখে তাকায় কিনা?' যদি তাকায় তবে জানবে ওই সেই মেয়ে। আতিপাতি করে খুঁজে ফিরি? কে সেই মেয়ে। ডলি,মঞ্জু, চায়না?  কে সে? 


সেটা যে আড়চোখে তাকিয়েই জীবন নদীতে অবগাহনের সময়।  সেই অবগাহন আজও তো শেষ হয়নি। যদিও জানি, ব্ল্যাকহোলের দোরগোড়ায় পৌঁছে গেছি প্রায়, তবুও হোয়াইট হোলের রাস্তা? সেও তো আমার জানা৷ ঠিক পৌঁছে যাব জানি একদিন। জীবন মরণেরও ঊর্দ্ধে,অন্য কোন ঠিকানায়। জীবন যে অনন্ত এক পথচলা।