Monday, 3 March 2025

বিলে

 বিলে


আজ সকাল সকাল যেতে হয়েছিল বিষ্টু ঘোষের পাড়ায়। কি দরকারে সেটা না হয় নাই বললাম। আর সবকিছুই যে ঢেরা পিটিয়ে বলতে হবে এমন পেটপাদলা আমি নয়। আর সে সব শুনেও আপনাদের এমন কিছু বেম্মজ্ঞান হবেনি। আখড়ার কাছেই বিলের সাথে দেখা। বিলে কে চেনেনা এ তল্লাটে এমন কেউ নেই। বিরাট শিশু বলতে যা বোঝায় তাই। যেমন বিশাল দেহ তার তেমনি বিশাল মন। একদমই অল্প বয়স।  তবে এ পৃথিবীতে বিলে জানেনা বা চেনেনা এমন জিনিস নেই। যেখানে গপ্পের গন্ধ পাবে, বিলে ঠিক সেঁধিয়ে যাবে। তখন তাকে নড়াই কার সাধ্যি। মোহনবাগান অন্ত প্রান৷ ক্লাবের দুঃখে বিলের চোখ দিয়ে জল গড়ায়। খাঁটি ঘটির বাচ্চা। ক্লাবের হয়ে




জান লড়িয়ে দেবে। যেখানে মো'নবাগান সেখানেই বিলে হাজির সে শিলিগুড়ি হোক বা চেন্নাইই। সেই বিলের বড় দুঃখ।  কবে বিএ পাস দিয়েছে আজ পর্যন্ত একটা ভদ্রস্থ চাকরি জুটল না। যে কথা বলছিলাম।  বিলে ধরল গে ঠিক শ্রীমাণির বাজারের মুখটাতে। ও আমাকে জ্যেঠু বলে ডাকে। বলল জ্যেঠু, শুনেছ, শম্ভু কাকা তোমায় কিছু বলেছে? আমি বলি না তো রে বিলে,কি হয়েছে? বলে  বলেনি? তাহলে থাক, জানলে শম্ভু কাকা আমার উপর রাগ করবে। আমি বলি বলে ফেল না আমি আর শম্ভুকাকা কি কিছু আলাদা। এক মুহুর্তেই বিলে সব উগরে দিল ওর ক্ষোভ দুঃখের কথা। শম্ভুকাকা যে কাজটা ওকে যোগাড় করে দিয়েছে, সেটা ওর মোটেই পছন্দ নয়। ও তাই ঠিক করেছে, চাগরীটা ছেড়েই দেবে। 

আপনারা শুনলেন তো বিলের কথা। ভারী ভাল,সরল, সৎ ছেলে। দেখুন না যদি ওর জন্যে ভদ্রস্থ কিছু চাকরীর জোগাড় হয়। আমার অনুরোধ রইল। 


বিলের সাথে গপ্পে কেটে গেল অনেকটা সময়। একটু মার্কেটিংও করলাম, জানেন। বিরাট কিছু নয়। আমার পছন্দের ধুলো শাক,সজনের ফুল আর মাছের মধ্যে কাঁচকি আর ফলি। আমার বাজারের সওদা শুনে জানি অনেকেই মৃদু মৃদু হাসবেন। হাসুন। তাতে আমার বয়েই গেল। আমার আজকের মেনু সজনে ফুলের বড়া,ধুলোর শাক, কাচকি র চচ্চড়ি আর বড়ি দিয়ে ফলি মাছের ঝোল। ইচ্ছেটা পেশ করলাম। জানিনা শেষ পর্যন্ত পাতে পড়বে কিনা।

Friday, 21 February 2025

জিলিপি আর চায়ে গরম




লাভা থেকে সুন্দর সুন্দর তিনটে কফি মগ নিয়ে এসেছি। দুটো আমার দুই নাতি নাতনির। আর একটা আমার৷ নাতি নাতনি পছন্দ করে লাল আর নীল রঙের দুটো নিয়ে নিয়েছে। আর এই হলুদ মাগ টা আমার।  সকালের চা টা আমি বেশ আয়েশ করে খাই। ঘুমের পরে বেশ বিশ্রামের মতন। আগেকার জমিদার বাবুদের মতন। তামুকে গুড়ুক গুড়ুক আওয়াজ তুলে অধো নিমীলিত চোখে। আর হবে নাই বা কেন। আমাদের দাদু ঠাকুর্দারাও একসময় জমিদারই তো ছিলেন, ঢুলিপাহাড়ী আর কাঞ্চনতলার । সে যাকগে,  সেসব গেছে চুকেবুকে। তবে স্বভাবটা রয়ে গেছে মৌজ করে চা খাওয়ার। এক মাগ ভর্তি সবুজ সবুজ চা৷ আর সঙ্গে অবশ্যই জিলিপি। জিলিপির কোন বিকল্প হয় নাকি? জিলিপির বিকল্প উন্নততর জিলিপি। আজ যেমন খাচ্ছি। প্যাঁচে প্যাঁচে রস। হচ্ছিল কফি মাগের কথা। জিলিপি এসে দিকভ্রষ্ট করে দিয়ে গেল। 


মাগটা তো দেখলেন।  সুন্দর না। মাত্র ২৫০ টাকা দাম। ঢাকনিতে সুন্দর আয়না লাগানো।  ইচ্ছে করলে চা খেতে খেতে নিজের মুখও দেখে নিতে পারেন। আমিও চেষ্টা করেছিলুম দেখতে। কিন্তু যতবারই দেখি, এক বুড়ো শেয়ালের মুখ ভেসে ওঠে। ছি ছি অশোক রায়, তোমার এতো অধঃপতন?  সত্যিই তো বাঘ যখন হতে পারিনি, শেয়াল ছাড়া আর কিই বা হতে পারি? আপনারা একটু কনফার্ম করবেন তো, আমাকে  কি সত্যি সত্যিই শেয়াল শেয়াল দেখতে?

Friday, 14 February 2025

হলং

 কাল ছিল আমাদের ডুয়ার্স সফরের দ্বিতীয় দিন। এর আগে জলপাইগুড়িতে কোনদিন রাত্রিবাস করিনি। এবারও সে অপূর্ণতাও পূর্ণ হয়ে গেল। কারণ এবার নিউজলপাইগুড়ি থেকে আমাদের যাত্রার ট্রেন খুব সকালে। রাত্রিবাস জরুরী ছিল। স্টেষনের কাছেই হোটেল। ঝকঝকে  হোটেল। ননী কোন অপূর্ণতা রাখে নি। ওই রাত্রে তরুণ যখন চিতল মাছের পেটি খোঁজে, তখন বুঝে নিন, আথিতেয়তার কোন পর্য্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে। 


সে সব যাই হোক, ওই সকালে সবাই স্নান সেরে আলুর পরোটা প্যাকেট নিয়ে উঠলুম ট্যুরিস্ট স্পেশাল ভিস্তাডোমে। চারিদিকে কাঁচ ঘেরা ট্রেন। ভিস্তাডোম। ভারী সুন্দর।  ছবি দিয়েছি কয়েকটা দেখবেন। বেশ লাগে এসব ট্রেনে সফর করতে। ট্রেন লাইনের দুপাশের প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে। সেই নিশ্চিন্তপুরের অপু, দুর্গারও ভালো লাগতো।  আমরা যারা এই যুগের, কেউ কেউ যারা আজো অপু রয়ে গেছি, তারাও আজো জানালার ধারে বসে এই ডুয়ার্সের নদী পাহাড় অরণ্য আজও অবাক বিস্ময়ে দেখেই চলে। অপুরা চিরকালই পৃথিবীতে রয়ে যায়। একসময় এই ভিস্তাডোম সফর শেষ হল। ট্রেন যেন তাজগী ঘোড়ার সওয়ার করে নিমেষে পৌঁছে দিল, মাদারীহাট স্টেশনে৷ মাদারীহাট, হলংএ ঢোকার সিংহদ্বারই বলা যায়।এবার তিনদনের মৌরসীপাট্টা আমাদের এই হলং ইকো রিসোর্টেই। কটেজ টাইপের বাড়ী। পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।  আমাদের গুলতানি মারার আদর্শ জায়গা। তবে আমাদের কটেজের মালিক বিশ্বনাথদা৷ বিশ্বনাথবাবুর পরিচয় যদি এককথায় দিতেই হয়৷ তবে তার পরিচয় প্রেমিক আর বিপ্লবী।  বিপ্লব করতে করতে প্রেম। বিপ্লবের সর্বনাশ। প্রেমের জয়। আর কেই বা না চায় প্রেমের জয়, বলুন? আমিও তাই। আপনিও নিশ্চয় দলছাড়া হতে চাইবেন না৷ 


এক সময়ের নকশাল। সেই স্কুলের দশম ক্লাস থেকেই, গলায় ইন্টারন্যাশনাল, আর রবীন্দ্রনাথের, 'ওদের বাঁধন যতই শক্ত হবে, মোদের বাঁধন ততই টুটবে" গলায় নিয়ে মুর্শিদাবাদের গ্রামে গ্রামে ক্যাম্প। সেসব ছিল একদিন। তবে বিপ্লবের বারুঁদে ভেজাল ছিল। বেশীওপরে উঠতে পারেনি। কমদামি হাওয়াইয়ের মতো পপাতধরণীতলে হতে সময় লাগেনি মোটেই। আর প্রেমও তো ছিল অনেক। মঞ্জু,ডলি, মলি, জ্যোতিকণার দল। সবাই কিন্তু রুপসী কন্যা। প্রেমটা একতরফাই ছিল৷ মুখফুটে বলা হয়নিকো আর৷ বিপ্লব, প্রেম সবই শেষ।  এবার ফিরে আসুন জলদাপাড়ায়। শিং বেঁকানো গন্ডারের আড্ডায়৷ এখানে প্রেমের প্রবেশ নিষেধ।  বেশী ট্যাঁফোঁ করলে, গণ্ডারের গুতোয় এফোঁড ওফোঁড় হয়ে যাবার শঙ্কা৷ 

আপাতত প্রেমে ইতি দিয়ে চলুন, জঙ্গলে যাই। বন্যেরা বনে সুন্দরের খোঁজে। 


হলং রিসার্ভ ফরেস্ট৷ ১৮ জনের দল৷ মহিলাও বেশ কয়েকজন আছেন। ক্যাচোর ম্যাচর চলছেই সারাক্ষণ।  এদের নিয়েই জঙ্গলে।  হলংএ ননীর সাথে আগেও এসেছি। সেবার কপালে এক ভারী গরীব ধরণের গণ্ডার ছাড়া আর কিছুই জোটেনি। তবে এবার ননীর কপাল একেবারে তুঙ্গে বৃহস্পতি।  জন্তু জানোয়ার আর পাখী, ময়ুরের মেলা। একটা দুটো নয়৷ দলে দলে আর পালে পালে৷ আর ময়ুরেরা  তো সারাক্ষণ পেখম মেলে আমাদের মনোরঞ্জন করেই চলল। বিশালাকায় হাতীর দল, ষণ্ডামার্কা সব শিং বেঁকানো শম্বরের দল, দৈতাকায় সব বাইসন বা গৌড়, যাই বলুন। দারুণ জমজমাট এক জাঙ্গল সাফারি হলো। 


কিন্তু আসল আড্ডা তো হবে ভর সন্ধ্যে বেলায়। হাম তুম আর ব্যাগপাইপার। ও কিছু নয়। একটু ক্যাটালিটিক এজেন্ট মাত্র৷ দু এক পেগ পেটে পড়লেই সব এক একজন আঁতেল মার্কা হয়ে ওঠেন। আর এই আড্ডাটার জন্যেই আমরা বারবার ফিরে আসি ননীগোপালের দলে। দুতিনঘন্টা নিমেষে কেটে যায়। ফরাসী বিপ্লব, নাজিম হিকমত, চে গুয়েভারা, সত্যজিত, সুনীল শক্তি আরো সব নামী অনামী হস্তীদের চুলচেরা বিশ্লেষণে৷ দারুণ জমজমাট আড্ডা। ঘড়ির কাঁটা এগিয়ে চললেও আড্ডা থামতে চায় না৷ দুপেগ তিনপেগের পড়ে আবার শুরু হয় অনুরোধের আসর। অনারের খেলা তখন৷ এ খেলা ননীর তৈরি আমরা তখন একে অন্যকে সম্মান জানায়,  খাদা দিয়ে নয় পেগ দিয়ে। এ খেলাও একসময়ে থেমে যায়। খালাসীটোলার আলোও  নিভে যায়। 

"তখন থাকে শুধু অন্ধকার, মুখোমুখি বসিবার বনলতা সেন। "

অথবা

" ভ্রুপল্লবে যদি ডাক দিয়ে থাক, 

চন্দনবনে দেখা হতে পারে।"

আপনারাও আসুন। 

আজ আমরা বনে নয়, সবাই মিলে যাব চন্দনবনে।


ছবি ঃ সৌজনেঃ ননীগোপাল।

Saturday, 23 November 2024

এ শ্যাম এ মস্তানি

 এ শ্যাম এ মস্তানী


আজকের সন্ধ্যেটা সত্যিই মনে রাখার মতই। আজ ছিল আমাদের সিটং যাবার প্রি-ওয়েডিং বা ওয়ার্মিং পার্টি। এই সবে সীসামারা জলদপাড়া ঘুরে এসেছি গত মাসেই। সীসামারার সবুজ বনানী, পাহাড়ি নদীর কুলুকুলু ঠান্ডা ঠান্ডা জলে অবগাহন স্নান আর নদীর পাড়ে ময়ুর ময়ুরীর  নাচ এখনও ফিকে হয়নি স্মৃতি থেকে। সীসামারার হ্যাংওভারের রেশ এখনও কাটেনি । এমনকি জলদাপাড়ার সেই গন্ডারের কাতর চাহনি এখনো বিহ্বল করে রেখেছে। 

এর মধ্যেই নতুনের আমন্ত্রণ।  এবার সিটং থেকে। মংপু ছাড়িয়ে আরো ওপরে। মংপু নিশ্চয় সবার চেনা,সবার জানা। সে যান আর নাই যান। মৈত্রিয়ী দেবীর 'মংপুতে রবীন্দ্রনাথ ' কে না পড়েছেন বা নাম শুনেছেন।  তারও ওপরে সিটং কমলা লেবুর বাগান ঘেরা এক অপুর্ব সুন্দর পাহাড়ি উপত্যকা।  যার সৌন্দর্য নাকি বহুগুণ বাড়িয়ে রেখেছে কাঞ্চনজঙ্ঘা।  সেখানেই আমাদের কাটবে আগামী চারটে দিন। এবারের দল সীসামারার থেকেও আড়ে বহরে ভারী। মোট ২১ জন।  সবাই আমরা ননীচোরার দলে। ননীকে নিশ্চয়ই আলাদা করে চেনাতে হবে না। এই যে আমাদের ঘোরাফেরা সবই ননীর নিয়ন্ত্রণে।  আজকের আসর ছিল পার্ক স্টীটে Bar-B-Que. উদ্দেশ্য একটাই ওই যে বললাম ওয়ার্ম আপ মানে একটু গা ঘেষাঘেষি করে ভাইচারার ওমের উত্তাপ নেওয়া। আজকের উদ্যোক্তা ছিলেন সুব্রতদা। তারই রিফ্রেশার কোর্স হল আজ বারবিকিউ এ। যথেষ্ট পরিমাণ শান্তি বারির আয়োজন ছিল উপাচার সমেত। এর মধ্যে গৌতমের ফোন এল রাঁচি থেকে। গৌতমকে মনে নেই?  ননীর সহকর্মী আর আমার সহযাত্রী ছিল টাইগার্স নেস্টের চূড়া পর্যন্ত।ওর স্ত্রীর কথা মনে পড়ে খুব। যেমন গান গান তেমনি ট্রেকিং এ পারদর্শী।  ওনার সাহসে সাহসী হয়ে আমার মত ভীতু লোকও বাঘের পিঠে চাপতে পেড়েছিলাম শেষ পর্যন্ত।  আর অক্ষত শরীরে নেমে আসার পেছনেও তারই অসীম সাহস৷ গৌতমের ভারী অনুযোগ,আমি কথা দিয়েও কথা রাখিনি৷ অর্থাৎ এবার গৌতমের রাঁচির বাড়িতে যেতেই হবে। না এবার সত্যি সত্যিই যেতে হবে রাঁচি। যদিও মাথা এখন পর্যন্ত সাফই আছে।  ভারী ভালো মানুষ এই গৌতম আর তার স্ত্রী। এবার পুরোন কথা থাক। ফিরে চলি সেই সিটং য়েই।


সিটং এর এডভান্স পার্টি বেরিয়ে পড়ছে এই সাত তারিখেই দার্জিলিং মেলে। আমরা এবার ট্রেনের টিকিট পাইনি। তাই আমি সুব্রতদা আর সুজিত যাচ্ছি এরোফ্লোটে বাগডোগরা।  ননীরা আমাদের তুলে নেবে ওখান থেকেই। ২১ জনের দল। বুঝতেই পারছেন হবে একদম নরক গুলজার। সে খবর যথাসময়ে দেব। আজ এখানেই থাক৷ আমার আবার বড় লেখা লিখতে ইচ্ছে করে না এমনকি পড়তেও। আপনিও নিশ্চয় আমারই দলে।

Saturday, 17 August 2024

কদম কদম বাড়ায়ে যা

 


কদম কদম বাড়ায়ে যা

খুসী কে গীত গায়ে যা


আজ রোববার, ইংরেজি ১৮ই আগষ্ট, বাংলা ১লা ভাদ্র, ১৪২৬ দিবা ৬ ঘটিকা মাহেন্দ্রযোগ। এতসব সত্যিই কি লেখার দরকার? আমি শ্রীমও নই আর কোন কথামৃতও লিখতে বসিনি। নেহাৎই আমার প্রলাপ বচন। ইচ্ছে হলে শুনতেও পারেন না হলে কানে গুজুন তুলো।

আসলে এখন আমার রোজই রোববার। একই তিথি, একই নক্ষত্র আর যোগ রোজই মাহেন্দ্রযোগ। আসলে প্রতিদিনই যে ২৪ ঘন্টায় হয় সে হিসেব আগে করিনি। তখন মনে হত আরও কয়েকঘন্টা দিনের হিসেবে জুড়লে বেশ হত। একটু ফেলে ছড়িয়ে চলতে পারতুম। কিন্তু এখন ২৪ ঘন্টা মিনিট গুনে সেকেন্ড গুনে কাটাতে হয়। মোটামুটি দিনের বেশীর ভাগটাই ভরপুর টইটম্বুর করে রাখি। কিন্তু রোববারের এই দুপুরটায়  মন বড় উচাটন হয়৷ আজও তেমনই এক রোববার।  চার দেয়ালের এই বাঁধন থেকে মুক্তি চায় মন। ওই যে রবিবাবুর গানে আছে না, ' এই আকাশে মুক্তি আমার...' পাখা থাকলে উড়েও যেতাম। একবার সত্যি সত্যিই উড়েই গিয়েছিলাম।  সে অনেক অনেক দূরে। তখন আমি নিমতিতায় থাকি। বরদাচরণ মজুমদার, নাম শুনেছেন নিশ্চয়। বিরাট যোগী,সাধক। আমাদের দেশ, কাঞ্চনতলায় বাড়ী।  তার প্রত্যক্ষ শিষ্য ছিলেন নিমতিতা স্কুলের হেডমাস্টার মশায় অনিল সান্যাল্। তার কাছে আমার যোগ ধ্যানের প্রথম পাঠ। তো ধ্যানেই একদিন জাস্ট উড়ে গেলাম। সে এক বিরাট অনুভূতি।  পৃথিবী,চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র ছাড়িয়ে কোথায় যে যাচ্ছিলুম কি জানি। ভয় পেয়ে পিছিয়ে এলুম। তারপরে অনেক চেষ্টাই করিছি, কিন্তু আর ইঞ্চি ছয়েকের বেশী উঠতে পারিনি। এটুকু শুনেই আপনার হয়ত ভাবতেই পারেন এ বেটা ঠিক টেনীদার গলি ঘুরে এসেছে আর টেনীদা ভর করেছে এই বেআক্কেলের মাথায়। 


সত্যি সত্যিই আজ মাহেন্দ্রযোগ ধরেই বেড়িয়েছি৷ বাসে ট্রামে নয় একেবারে পদব্রেজে। হাটতে আমার ভারী ভাল লাগে। আর আমার হাটার প্রিয় জায়গাও এই উত্তরে। ইচ্ছে ছিল দর্জীপাড়ার নতুনদার সাথে আড্ডা মেরে সন্ধ্যেটা কাটাব। কিন্তু হাজার ডাকাডাকিতেও তার সাড়া পেলুম না। হয়ত ভাগলপুরেই ভাগলবা হয়েছে শ্রীকান্তের খোঁজে। উত্তরের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে চললুম। উত্তরের গলিতে গলিতে দেবদেবীর অবস্থান। এখানে সন্ধ্যে হলেই কাঁসরঘন্টার ভারী মিষ্টি আওয়াজ। মানুষের এখনও অচলা বিশ্বাস তাদের ঠাকুর দেবতায়। এই বিশ্বাসের আড়ম্বরহীন আয়োজনে আমারও নীরব সমর্থন।  ধর্ম থাকুক সে একক বা সমবেত বিশ্বাসে। কিন্তু দাঁতমুখ খিচিয়ে যেন তেড়ে না আসে। এইখানেই আবার রামকৃষ্ণ।  যত মত তত পথ। থাকুক না সব বিশ্বাস পাশাপাশি হাতে হাত রেখে তা হলে কি ভালই না হয়। আমারও খুব পছন্দের এই প্লুরালিস্টিক সমাজ। অনেক ধর্ম, অনেক ভাষা অনেক সংস্কৃতি সংসার সমাজ আলো করে এই প্রকৃতির মত তার নানা রঙ,রুপ, গন্ধ নিয়ে থাক। যাক সে সব ভাবের কথা। আমি নিতান্তই অ-ভাবী মানুষ। এসব নিয়ে বেশী কথা বলা আমায় মানায়ও না।

যাক নতুনদাকে ধরতে না পেরে এগিয়ে চললুম, শোভাবাজার রাজবাড়ীর পানে। ইচ্ছে আজকের সন্ধ্যেটা রাজামশায় স্বপন দেব মহাশয়ের সাথেই পানালাপেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু মাহেন্দ্রক্ষণে বেরোলেও রাজামশাইকে ফোনে পেলুম না। রাজবাড়ীর ফটক ঠেলে ঢুকে পড়তেই পারতুম। কিন্তু আমিও তো নবাব বাদশার দেশেরই লোক। এরকম বেয়াদব আচরণ কি আমার শোভা পায়? তাই চরৈবতিই। শেষে নেতাজির দোরগোড়ায় এসে থামতেই হল। পাঁচমাথার মোড়ে কালীমার দর্শন সেরে নুচি সন্দেশ খেয়ে আবার সেই সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে পুর্নমুষিক ভব।

Wednesday, 31 July 2024

দিল্লি দূর নেহি

 এবার দিল্লি এসে অব্দি বেশ টোটো করে ঘোরা হচ্ছে। দিল্লি বিরাট শহর।  তার এস্পার ওস্পার করে যাচ্ছি এবেলা ওবেলা, যদি ভেবে থাকেন টোটো করে, তাহলে আপনার বোঝার গোঁড়াতেই গলদ। টোটোর সাধ্য নেইকো এতো লম্বা দৌড় দেওয়ার। অটোও এতটা পারবে না। সে আপনি যদি ওলা/উবের নেন, তাহলে অন্য কথা। কিন্তু মধ্যবিত্তের পকেটের এতো ক্ষ্যামতা নেই, যে দুবেলা ওলা/উবেরের খরচ সামাল দিতে পারবে। তাও আমি ঘুরছি, ঘুরেই চলেছি। ক্যামনে কও দেখি? আছে আছে সে উপায়ও আছে। এবার দিল্লিতে এসে উঠেছি করোলবাগে।  ওই যে দিদির কত রকমের পকল্প আছে না, দুয়ারে সরকার, দুয়ারে হ্যান, দুয়ারে ত্যান। তেমনটি ঠিক নয়। এটা দুয়ার ছাড়ার প্রকল্প। করোলবাগ মেট্রো এবার আমার দিল্লির আস্তানার ঠিক দোর গোড়ায়। তাই অটো, টোটো, উবের সবের সবাইকেই দিয়েছি তালাক। পুরো মেট্রোর পিঠে চেপে এপার ওপার দিল্লি হিল্লি কিছুই বাদ দিই নিকো। আর দিল্লি রাজধানী বলে কথা তার মেট্রোও রাজকীয়।  যেমন বিস্তিত এর নেটওয়ার্ক।  তেমনি ঘড়ি ধরে মেট্রো আসছেই মিনিটে মিনিটে। তাই নো তাড়াহুড়ো।  ট্রেন যদি মিসও করেন, জানবেন তার পরের মিনিটেই ট্রেন এসে যাবে। ৩৯৩ কিলোমিটারের নেটওয়ার্ক, ১২ টা লাইন আর ২৮৮ টা মেট্রো স্টেশন।  ভাবা যায়? আরো বেড়েই চলেছে। দিল্লির মেট্রোর এপটাও অসাধারণ।  শুধু কোথা থেকে কোথায় যাবেন, লিখে দিন।  নিমেষে আপনাকে রুট প্লান দিয়ে দেবে। যা দেখে আমার মতো আহাম্মকও পৌঁছে যাবে তার গন্তব্যে। সে যা হোক অনেক গুণকীর্তন তো হলো। এবার অন্য প্রসঙ্গেই আসি।


যাতায়াত যত ডানা মেলেই করি। খাওয়া দাওয়া নিয়ে বেশ কষ্ট। একে তো পাঞ্জাবী ডেন। তার খাওয়া দাওয়াও তেমনই বল্লে বল্লে টাইপ। ইতনা ঘিউ, ইতনা মালাই ওয়ালা খানা যে আমার মতো পেটরোগা বাঙালীর কাছে সক্রেটিসের হেমলক পানের তুল্য। এক আধবেলার বেশী সহ্য করা মুস্কিল। আর আছে সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার।  ওদের সবেতেই ইমলি গোলা।  হায়দ্রাবাদে একবার বিরিয়ানি খেয়েছিলাম। তাতেও দেখি ছোট একটা বাটি ভর্তি তেঁতুল গোলা জল দিয়েছে। কি নিদারুণ পরিহাস। 


সে যাই হোক দিনে পাঞ্জাবি আর রাতে দক্ষিণীই চলছে। রাতে দক্ষিণী খাবার একটা এডভান্টেজ অবশ্য পাচ্ছি। সকালে উঠে পুরো ক্লেদমুক্ত শরীর। পুরো ফুরফুরে মন আর হাল্কাফুল্কা শরীর আর মন নিয়ে হিল্লি দিল্লি যেখানে ইচ্ছে উড়ে বেড়ান।


আর বিকেলে সামোসা আর জিলিপি আমার অলটাইম ফেভারিট তো আছেই। আমার ডায়েটিশিয়ান আমাকে পাঁচ পাতার ডুস এন্ড ডোন্টস দিয়েছে। তাতে সিঙ্গারা আর জিলিপি নৈব নৈব চ।  ডায়েটিশিয়ানকে মারো গোলী। পৃথিবীতে কে বা কবে অমর হতে পেরেছে? আর যারা জিলিপির স্বাদ নিতে অপারগ। তারা যে জীবন্মৃত।  তাদের কথা ভেবে আমার বড্ড মায়া হয়।

Thursday, 11 July 2024

ইলিশ ও সুন্দরী

 



ইলিশ ও সুন্দরী

তখন ১৯৭৯-৮০।  লেকটাউনে থাকতাম,  আমার অফিস তখন আমহার্স্ট স্ট্রীটে। স্কুটার চালিয়ে  ব্যাংকে আসতাম, গায়ে লাল সার্ট, চোখে সানগ্লাস  মানিকতলা হয়ে আমহার্স্ট স্ট্রীটে ধরে সিটি কলেজ পেরিয়ে রোজ ছিল আমার আসা যাওয়া।  ফেরার পথে মানিকতলা বাজার পরত। মানিকতলা বাজারের মাছ মানে কলকাতার সেরা মাছ। চওড়া চওড়া ইলিশ  কিনে নিয়ে যেতাম প্রায়ই। তখন ইলিশের এত আকাল ছিল না। বর্ষাকালে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা তখন ঘন ঘন রাতের মেনুতে থাকত। তো আরও অনেক কিছুর মতই সে সব দিনও আজ শুধুই অতীত, বিষন্ন অতীত।

তবে এত ভুমিকা নেহাৎ ইলিশের জন্য নয়। সে ছিল একজন। আজ হঠাৎই মনের পর্দায় ভেসে উঠল তারই জলছবি, মনের কোন গভীর গহন কোণে সে এতদিন অশোকবনে সীতার মতই বন্দী হয়ে ছিল।  সেইসময়,আমার চেহারার জৌলুশও ছিল খুব৷ মধুমেহ আসতে তখন অনেক বাকী।  সিটি কলেজের অনেক মেয়েই তখন দাঁড়িয়ে থাকত যেন আমারই প্রতীক্ষায়। এক সুন্দরীর সাথে নিত্য হত চোখাচোখি। স্কুটারের গতি হয়তো কমে আসত কিন্তু থামতে পারিনি কোনদিনও। আজ ৪০ বছর বাদে সেইরকমই এই মেয়ের সাথে দেখা। তাই তার কথা আজ চকিতে মনে পরল। এই মেয়ে, হয়তবা সেই মেয়েরই মেয়ে,যে মেয়ে এতদিন লুকিয়ে ছিল আমারই মনের গভীরে। আজ যেন সে মুক্তি পেল তার বন্দীদশা থেকে। আর আমাকেও মুক্ত করে দিয়ে গেল।