Wednesday, 21 August 2019

দশচক্রের আসর

আজ দিল্লি থেকে আমাদের বড় গোঁসাই মানে শেখর এয়েছে। এসেছে মানে প্যারোলে ছাড়া পেয়েছে তিহার থুড়ি গুরগাঁওএর জেলখানা থেকে। সেখানকার জেলার আবার ওরই গিন্নি।  বুঝুন কি সাংঘাতিক ব্যাপার। প্রাণ ওষ্ঠাগত। তাই প্রানের জ্বালা জুড়োতে আজ উড়ে এসে আলো করে বসেছে আমাদের মধ্যে,  অনন্ত তৃষ্ণা বুকে নিয়ে । বৃষ্টির কোন দরকার নেই,  সব বৃষ্টি বাদলা আমরা রেখেছি বোতল বন্দী করে। দশচক্র বললাম বটে,  তবে দশের হিসেব অল্পের জন্য ফস্কে গেল । আমাদের বড়ভাই, নটসূর্য বলরামকে নোটোর কমিটমেন্ট রাখতে গিয়ে এমন কড়া ডোজের ওষুধ নিতে হল,যে তাতেই ও বেকসুর বেমতলব  শয্যাশায়ী হয়ে গেল৷ তাতে আমাদের এই আড্ডার রঙ ফিকে হল অবশ্যই তবে ভিডিও কনফারেন্সে আমদের সঙ্গী হয়ে রইল বলরাম সর্বক্ষনই। দশচক্রের চক্রী হয়েও ,  আমাদের বিশ্বাস না আছে ভুতে না ভগবানে। আমার নিজেরাই ভূত বা বলুন কিম্ভুত,  বা নাই হোক কদাকারই। অন্তত আমরা অদ্ভুত বা নতুন যৌবনের দাবীদার তো মোটেই নয়। আমদের ভূত বলুন চাই ভগবান, সবই ছিল বোতল বন্দী হয়ে, শুধু ছিপি খোলার অপেক্ষায়।  তাই ছিপি খুলে উড়িয়ে দিলাম সব ভূত, ভবিষ্যৎকে। আর কিসেরই বা প্রয়োজন এই পড়ন্ত বেলায়? তখন রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল, থাকে শুধু অন্ধকার,  মুখোমুখি বসিবার নাটোরের  বনলতা সেন। তাকে খোঁজার দায়িত্ব  আমার,আপনার, আমাদের সবাইয়ের। আপনার খোঁজ তুমি নিজেই নাও খুঁজে ।

পরিশেষে ধন্যবাদ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে অরুণের তেনার ভিসার মেয়াদ আরও তিনমাস বাড়ানোর জন্য। এতে আমাদের নরক গুলজার আরও গুলে গুলজার হয়ে উঠবে, এই বিশ্বাস শুধু আমাদেরই নয়, আপনারও নিশ্চয় তার সঙ্গী।

Sunday, 18 August 2019

কদম কদম বাড়ায়ে যা
খুসী সে গীত গায়ে যা

আজ রোববার, ইংরেজি ১৮ই আগষ্ট, বাংলা ১লা ভাদ্র, ১৪২৬ দিবা ৬ ঘটিকা মাহেন্দ্রযোগ। এতসব সত্যিই কি লেখার দরকার? আমি শ্রীমও নই আর কোন কথামৃতও লিখতে বসিনি। নেহাৎই আমার প্রলাপ বচন। ইচ্ছে হলে শুনতেও পারেন না হলে কানে গুজুন তুলো।
আসলে এখন আমার রোজই রোববার। একই তিথি, একই নক্ষত্র আর যোগ রোজই মাহেন্দ্রযোগ। আসলে প্রতিদিনই যে ২৪ ঘন্টায় হয় সে হিসেব আগে করিনি। তখন মনে হত আরও কয়েকঘন্টা দিনের হিসেবে জুড়লে বেশ হত। একটু ফেলে ছড়িয়ে চলতে পারতুম। কিন্তু এখন ২৪ ঘন্টা মিনিট গুনে সেকেন্ড গুনে কাটাতে হয়। মোটামুটি দিনের বেশীর ভাগটাই ভরপুর টইটম্বুর করে রাখি। কিন্তু রোববারের এই দুপুরটায়  মন বড় উচাটন হয়৷ আজও তেমনই এক রোববার।  চার দেয়ালের এই বাঁধন থেকে মুক্তি চায় মন। ওই যে রবিবাবুর গানে আছে না, ' এই আকাশে মুক্তি আমার...' পাখা থাকলে উড়েও যেতাম। একবার সত্যি সত্যিই উড়েই গিয়েছিলাম।  সে অনেক অনেক দূরে। তখন আমি নিমতিতায় থাকি। বরদাচরণ মজুমদার, নাম শুনেছেন নিশ্চয়। বিরাট যোগী,সাধক। আমাদের দেশ, কাঞ্চনতলায় বাড়ী।  তার প্রত্যক্ষ শিষ্য ছিলেন নিমতিতা স্কুলের হেডমাস্টার মশায় অনিল সান্যাল্। তার কাছে আমার যোগ ধ্যানের প্রথম পাঠ। তো ধ্যানেই একদিন জাস্ট উড়ে গেলাম। সে এক বিরাট অনুভূতি।  পৃথিবী,চন্দ্র, গ্রহ, নক্ষত্র ছাড়িয়ে কোথায় যে যাচ্ছিলুম কি জানি। ভয় পেয়ে পিছিয়ে এলুম। তারপরে অনেক চেষ্টাই করিছি, কিন্তু আর ইঞ্চি ছয়েকের বেশী উঠতে পারিনি। এটুকু শুনেই আপনার হয়ত ভাবতেই পারেন এ বেটা ঠিক টেনীদার গলি ঘুরে এসেছে আর টেনীদা ভর করেছে এই বেআক্কেলের মাথায়।

সত্যি সত্যিই আজ মাহেন্দ্রযোগ ধরেই বেড়িয়েছি৷ বাসে ট্রামে নয় একেবারে পদব্রেজে। হাটতে আমার ভারী ভাল লাগে। আর আমার হাটার প্রিয় জায়গাও এই উত্তরে। ইচ্ছে ছিল দর্জীপাড়ার নতুনদার সাথে আড্ডা মেরে সন্ধ্যেটা কাটাব। কিন্তু হাজার ডাকাডাকিতেও তার সাড়া পেলুম না। হয়ত ভাগলপুরেই ভাগলবা হয়েছে শ্রীকান্তের খোঁজে। উত্তরের অলিগলি ঘুরতে ঘুরতে এগিয়ে চললুম। উত্তরের গলিতে গলিতে দেবদেবীর অবস্থান। এখানে সন্ধ্যে হলেই কাঁসরঘন্টার ভারী মিষ্টি আওয়াজ। মানুষের এখনও অচলা বিশ্বাস তাদের ঠাকুর দেবতায়। এই বিশ্বাসের আড়ম্বরহীন আয়োজনে আমারও নীরব সমর্থন।  ধর্ম থাকুক সে একক বা সমবেত বিশ্বাসে। কিন্তু দাঁতমুখ খিচিয়ে যেন তেড়ে না আসে। এইখানেই আবার রামকৃষ্ণ।  যত মত তত পথ। থাকুক না সব বিশ্বাস পাশাপাশি হাতে হাত রেখে তা হলে কি ভালই না হয়। আমারও খুব পছন্দের এই প্লুরালিস্টিক সমাজ। অনেক ধর্ম, অনেক ভাষা অনেক সংস্কৃতি সংসার সমাজ আলো করে এই প্রকৃতির মত তার নানা রঙ,রুপ, গন্ধ নিয়ে থাক। যাক সে সব ভাবের কথা। আমি নিতান্তই অ-ভাবী মানুষ। এসব নিয়ে বেশী কথা বলা আমায় মানায়ও না।
যাক নতুনদাকে ধরতে না পেরে এগিয়ে চললুম, শোভাবাজার রাজবাড়ীর পানে। ইচ্ছে আজকের সন্ধ্যেটা রাজামশায় স্বপন দেব মহাশয়ের সাথেই পানালাপেই কাটিয়ে দেব। কিন্তু মাহেন্দ্রক্ষণে বেরোলেও রাজামশাইকে ফোনে পেলুম না। রাজবাড়ীর ফটক ঠেলে ঢুকে পড়তেই পারতুম। কিন্তু আমিও তো নবাব বাদশার দেশেরই লোক। এরকম বেয়াদব আচরণ কি আমার শোভা পায়? তাই চরৈবতিই। শেষে নেতাজির দোরগোড়ায় এসে থামতেই হল। পাঁচমাথার মোড়ে কালীমার দর্শন সেরে নুচি সন্দেশ খেয়ে আবার সেই সংসার বিদেশে বিদেশীর বেশে পুর্নমুষিক ভব।

























Tuesday, 13 August 2019

বাই বাই মিস ডায়েটিশিয়ান
কাল ফির মিলেঙ্গি

আমি এমনিতে খুব নিয়মনিষ্ঠ লোক। সময়ের কাজ সময়ে করা, সুচারুভাবে নিয়মকানুন মেনে চলা। এগুলো সব আমার স্বভাবসিদ্ধ ব্যাপার।  মনে হয়না, কষ্ট করে নিয়ম করছি। সকালে যখন লেকে হাটি বা দোলনায় দোল খায়, সেও মনের আনন্দেই। সকালের গ্রীন টি থেকে, কম্পিউটারে ৪/৫ ঘন্টা পেশাদারী কাজে, বিকেলে বিষ্টু ঘোষের আখড়া সব চলে ঘড়ির কাঁটা মেনে। ইদানীং এতে যোগ করেছি এক ডায়েটিশিয়ান সুন্দরীকে। তার সব নির্দেশ মাথা পেতে মানি।
তবে,বাইরে যখন বেড়োয় সব নিয়ম নাস্তি। আজ অযোধ্যা পাহাড়ের চুড়োয় বসেই নিয়ম ভাঙার শুরু। নিয়মে থাকার জন্যই মাঝে মাঝে নিয়ম ভাঙাই যে দস্তুর।
তাই আজ সকালের আমন্ত্রণে,  দই আর চিয়া সিডসের বদলে থালাভর্তি লুচি, সবজি আর গরম গরম গুলাবজামুন। দুপুরে শুদ্ধ খাসির গড়গড়ে ঝোল, হ্যান ত্যান কত কি, ম্যায় আমসত্বের চাটনি পর্যন্ত্য।কোন কিছুইতেই নেই কোন বাঁধা। ক্যালরি মাপার খবরদারী, আজকে তোমায় দিলেম ছুটি। সন্ধ্যেয় তো জমজমাট এ হিন্দ, নদিয়া সে দরিয়া, দরিয়া সে সাগর, সাগর সে গেহরী যাম...ইমুইনিটির বিরাট পরীক্ষা আছে। পা টলমল থাকলেও যদি নিজের পায়েই থাকেন স্থির কিংবা অস্থির তবে আপনি ১০০/১০০! সব পরীক্ষায় সসস্মানে উত্তীর্ণ।  এই ভাবাবেশ চলবে আজ, কাল আর পরশুও। বলতে ভুলে গেছি রাত্রে কিন্তু দেশী কুক্কুটের নরম ঝাল ঝাল আর বেনারসী রাবড়ি।পছন্দ তো? 
এই আমার নিয়ম ভাঙার নিয়ম। বুধবার থেকে আমায় কিন্তু চিনবেন না। যদি দেখেন আনাপানা করতে করতে কোন বৌদ্ধ শ্রমনকে রামমোহন রায় রোড ধরে যেতে, সেও এই আমিই? এই সত্যি,ঔ সত্যি। আমি আমরা সবাই আদতে শ্রডিংগারের বেড়াল ছানা,জীবন মৃত্যু এক তাড়াজুতেই নিয়ে চলি। অহং ব্রম্মহাস্মি।  ধম্মেও আছি,জিরাফেও আছি। এই তো জীবন, ননীদা।



এক নরম অপরাহ্নে আমরা পাখী পাহাড়ে। কে যেন সব পাখীগুলোকে বন্দী করে রেখেছিল এই কঠিন পাথুরে বুকে। সবকটাকে দিলেম উড়িয়ে  আজ মুক্ত নীল আকাশে। এরপর যদি পাখি পাহাড়ে আসেন, পাথরের গায়ে আর কোন বন্দী পাখী দেখবেন না। এই পাহাড়ের নাম দিলাম এখন থেকে  মুক্তি পাহাড়।








পুনরদর্শনায় চ
 পুরুলিয়া

আজ  ছদশকেরও পরে পুরুলিয়ার মাটিতে পা দিলাম।
আমার খুব ছোটবেলার স্মৃতিতে পুরুলিয়া একটা বেশ উজ্জ্বল জায়গা নিয়ে আছে। ফেসবুকের পাতায় সেই স্মৃতিচারণও করেছি আগে। আবার লিখতে গেলে তা নিছকই হবে পুনোরক্তি । তবে লিখতেই যখন বসেছি কিছু কথা তো এসে যাবেই । আর এ যে নেহাৎই আমার শিশুকালেরই কথা। পুরুলিয়ায় নীলকুঠিডাঙায়, হুচুকপাড়ায়  এই দুজায়গাতেই ছিল আমাদের বাসাবাড়ি।  যেখানে আমাদের বাসাবাড়ির বাগান থেকে অযোধ্যা পাহাড়ের দেখা মিলত। আর ছিল ছোটবেলার বন্ধু কাশীনাথ ভকত আর কৃষ্ণপ্রসাদ ভকত।  কৃষ্ণপ্রসাদ পরে এমএলএ হয়েছিল বলে শুনেছিলাম।  দিনের অনেকটা সময়ই ওদের বাগানের গাছে গাছেই কেটে যেত। আর আমার প্রথম স্কুল 'শিশুশিক্ষা'। প্রথম আবৃত্তি  ' এই দেখ নোটবুক, পেন্সিল এইহাতে'! তখন নেহাৎই শিশু ছিলাম তো। পরে অবশ্য জেলা স্কুলে আসি। সাহেব বাঁধ,  সাহেব বাঁধের লাল নীল মাছ, ভিক্টোরিয়া স্কুলের মাঠে ফুটবল পেটানো, প্রথম ছৌ নাচ দেখা। আড্ডা স্যার, দাদার জেকে কলেজ, দিদিদের শান্তিময়ী গার্লস স্কুল মায় সেখানকার হেড দিদিমণির চেহারাটাও জ্বলজ্বল করছে মনের মধ্যে। শুধু সেদিনের সেই বাচ্চা ছেলেটাই আর নেই। তাই পুরুলিয়া যাবার ইচ্ছে, ইচ্ছে হয়ে ছিল মনের মাঝারে।  আর সেই খোঁজে সঙ্গী এবার ননী। আজ প্রায় ছ দশকের পরে চলেছি পুরুলিয়ার পথে দেখি খোঁজ পায় কিনা  স্মৃতির অতলে লুকিয়ে থাকা সেই পুরুলিয়ার। দেখি আগামী কদিন কিসের দেখা মেলে। তবে গন্তব্য এবার অযোধ্যা পাহাড়। যার সাথে আমার দুরের বন্ধুত্ব। দেখি দুরের বন্ধুকে সে চিনতে পারে কি না?

Saturday, 6 July 2019



ভূত না ভুতের গপ্প
আজকাল আমাদের ছোটবেলার ভুতেদের মত, আর ভুতেদের গপ্প প্রায় শোনায় যায় না। আসলে আজকালকার বাচ্চাদের মধ্যে ভুতেদের নিয়ে কোন উৎসাহই নেই।  তাই, আজকাল ভুতেদের বাজার বড়ই খারাপ। ভুতরাও আর এত আলো এত শব্দ চারিদিকে এত দৌড়ঝাঁপ আর গন্ডগোলের মধ্যে নিজেদের রুপই নিতে পারে না। তাদেরও তো সাজগোজের জন্য একটা ড্রেসিং রুম চায়। একটু আধো আলো, একটু আধো অন্ধকার, এট্টুখানি ভালবাসা, একটুখানি রোমাঞ্চ, মানে গা ছমছম। না হলে ভুত বেচারী আসেই বা কি করে? তারও তো একটা উপযুক্ত মঞ্চ চাই। তার আসা তো আসা নয়... রীতিমতো আবির্ভাব।
আমার ছোটবেলা আর কিশোরকালের অনেকটাই কেটেছে রঘুনাথগঞ্জ, জিয়াগঞ্জ আর লালবাগের আলো আঁধারী পরিবেশে। সেখানে যেমন ভালবাসা ছিল তেমনি ভালোবাসার মত ভুতেরাও ছিল। সেসব ভুতের গপ্প অনেক শুনেছি মার কাছে, ঠাকুরমার কাছে। গেছোভুত, মেছো ভুত, জমিদার ভুত, বেম্ভদত্যি কতকি। আমাদের জঙ্গীপুরের বাড়ীতেই একটা বেলগাছ ছিল। তাতে নাকি থাকত এক বেম্ভদত্যি।  আমার ঠাকুমা নাকি তাকে দেখেছিলেন একবার গাছ ছেড়ে আমাদের ছাদে এসে বসে থাকতে, ভারী দুখী মনে। এ আমার ঠাকুমার মুখে শোনা। তবে, সেসব ছিল ভারী মানুষঘেষা ভুত, কখনো কারুর ক্ষতি তো করেই নি বরং অনেকের উবগারেই এসেছেন বলে শুনে এসেছি। ছোটবেলায় ঠাকুমার কোলঘেষে অনেক ভুতের গল্পই শুনেছি। গা ছমছম করেছে  কিন্তু ভয় কি পেয়েছি? মোটেই না৷ বরং আজও যেটা মনে রয়ে গেছে সেটা ঠাকুরমার গায়ের ওম আর স্নেহ ভালোবাসা মিলে এক অদ্ভুত অনুভুতির অনুভব। যা আজও মিলিয়ে যায় নি। ভুত যদি বলেন সেটাও তো ভূত মানে আমাদের বিতে হুওয়া কাল।
তবে আমাদের কালে ভুতের অনেক উপাদানই ছিল। আমাদের কালে তো এত ত্রিফলা আর হাইমাস্ট চোখঝলসানো আলোর উপদ্রব ছিলনা। দূরে দূরে ল্যাম্পপোস্টের ওপরে টিমটিমে বালব জলত। হয়ত নির্জন রাস্তায় কেরোসিন লম্ফ জালিয়ে এক আধটা রিক্সা টুংটুং করে হঠাৎ পাশ কাটিয়ে যাবে। সন্ধ্যের পর আলো অন্ধকারে সে এক ভারী রোমাঞ্চকর পরিবেশ।  আমার তো তাই মনে হত।  আর সেখানে যদি আপনি আপনার কল্পনার রশিকে একটু লাগামছাড়া হতে দেন, তাহলে তেনাদের সাক্ষাৎ হতেই হবে।

 সত্যি বলতে কি রঘুনাথগঞ্জ বা লালবাগে আমি অন্তত কোন ভুতেদের সাথে কোন এফেয়ার্সে জড়িয়ে পরিনি। অন্তত লালবাগে সে সম্ভাবনা তো ছিল বিস্তর। নবাব, বাদশাহ, হাতী ঘোড়া অস্ত্রের ঝনঝনানি, তোপের আওয়াজ, হত্যা, ষড়যন্ত্র,  সবই কি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে? এত অসুখী আত্মার অস্তিত্ব সব কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। হয়ত না।  তবে আমার অনুভবে তারা আসেননি কেউই। তবে সাপের সাথে দেখা হয়েছে বিস্তর।  লালবাগে তোপখানায় রাস্তার উপর শুয়ে থাকা খরিস সাপের লেজের উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গিয়েছি। ফণা তুলে দাঁড়িয়ে পরেছিল ঠিকই কিন্তু ছোবল মারেনি। অবশ্য মারলে এই গপ্প শোনাতে আমার বদলে অন্য কেউ আসত। হাজারদুয়ারীর সামনের মাঠে আমাদের আড্ডার পেছনে এক ফণাধারী ফণা তুলে আমাদের রসালাপও শুনতে এসেছিলেন।  সময় মত আমরা সরে গিয়েছিলাম।  তাছাড়া এখানে ওখানে, ফুটো মসজিদের ফাটল থেকে তেনারাও আমাদের কুল কুড়োনোর সাক্ষী হয়েছিলেন।  চোখাচোখি হয়েছিল কিন্তু তেড়ে আসেন নি।
আমার ভুতের অভিজ্ঞতা বলুন বা যাই বলুন, সবই কিন্তু জিয়াগঞ্জের ভট্টপাড়ায়। জিয়াগঞ্জও কিন্তু অনেক পুরনো কালের শহর। বিরাট বিরাট বাড়ি।  সন্ধ্যের পর সে শহরও বড় ছায়াময়।
এবার শুনুন তবে গপ্প নয় হলফ করা সত্যি।
আমার পুরো শৈশবকালটা কেটেছে মুরশিদাবাদের জিয়াগঞ্জে। আমার প্রথম পাঠশালায় ভর্তি, ওখানেই, ভুজঙ্গ মাষ্টার মশায়ের পাঠশালায়। আমরা তখন ভাড়া থাকতাম, জিয়াগঞ্জের স্টীমারঘাটে হরিশবাবুর বাড়ীতে।পাড়ার লোকেরা তাকে ডাকত হরিশবুড়ো বলে। আমাদের কাছে অবশ্য তিনি ছিলেন হরিশ দাদু। আমার তখন পাঁচ, দাদুর বয়স ৭৫এর কমতো নয়ই। তো হরিশদাদু আর দিদিমা ছিলেন নিঃসন্তান। তাই আমার উপর তার স্নেহ ঝরে পরত অঝরধারে। বাড়ীর বাইরের ঘরে দাদু একটা ছোট মুদিখানার দোকান দিয়েছিলেন। তাতে অনেক লাল নীল লবেঞ্ছুসও থাকত। তার বেশ কিছু যে আমার পাওনা ছিল, সে কথা আর আলাদা করে বলার নয়। যাহোক, বাবা কিছুদিন পরে আমাকে পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু আমি কেঁদেকেটে একশা, কে আমাকে নিয়ে যাবে সেই পাঠশালায়। শেষে হরিশদাদু আমাকে দিয়ে এলেন, সঙ্গে দিলেন লবেঞ্ছুস পকেট ভর্তি করে। কিন্তু তাও আমার কান্না থামে না। বাড়ীর কাছেই পাঠশালা, দাদু মাঝে মধ্যেই আমাকে দেখে যেতেন। আর বাড়ীতে গিয়ে বাবাকে বলতেন, রায়মশাই, নীলমনির কান্না এখন থেমেছে। এইরকম ছিল আমাদের সময়। কে আপন আর কে পর সে বোধই জন্মায়নি। সবাইকে নিজের লোক মনে হত। কেউ যেন পর নয়।পাড়াপ্রতিবেশী,তারা যত উঁচু মর্যাদার লোক হন না কেন, তারা সবাই খুব কাছের মানুষ ছিলেন।
আমার পাঠশালার পাঠও একদিন চুকল, আমি ভর্তি হলাম উঁচু ক্লাসে।এবার হল আমার পাড়াবদল। আমরা এবার এলাম জিয়াগঞ্জের আর এক প্রান্তে একটা বড় বাড়ীতে । পাড়ার নাম ভট্টপাড়া।ভট্টপাড়া বেশ পুরনো।অনেক বড়বড় বাড়ী। শ্রীপতসিইং দের বিশাল বিশাল প্রাসাদ, রাস্তার দুধারে।মফস্বল শহরে রাস্তার দুধারে তখন এত আলোর বাহার ছিলনা। অনেক দূরে দূরে একটা করে লাইট পোষ্ট থাকত আর তার অনেক ওপরে একটা টিমেটিমে বাল্ব জ্বলত।তার মধ্যে চারিদিকে বড় বড় প্রাসাদের ছায়ায় একটা আলোআন্ধকার গা ছমছমে পরিবেশের সৃষ্টি করত।ভুতদের জন্য আদর্শ পরিবেশ। তো আমাদের নতুন বাড়ীতেও ভুত ছিল। কিন্ত ভারী ভব্যসভ্য এক বিধবা মহিলা।আমরা দিদি,ভাইরা যে ঘরে শুতাম, সেই ঘরেই তিনি থাকতেন। আমাদের বিরক্ত করতেন না মোটেই। শুধু রাত্রে হঠাৎ , ঘুম ভেঙ্গে গেলে, তার বিলাপের শব্দ শোনা যেত। হয়ত তার পার্থিব জীবন তেমন সুখের ছিলনা, হয়ত কোন বঞ্ছনা ছিল, আশাভঙ্গ ছিল, যার রেশ তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনেও থেকে গিয়েছিল। তার সঙ্গে আমাদের প্রত্যক্ষ ভাবসাব না হলেও, অসদ্ভাব কোনদিন হয়নি।দিনের বেলাও তার দেখা পেয়েছি। আমরা ঘরে ঢুকলে , তিনি চট করে বেরিয়ে যেতেন।তার চলে যাবার সঙ্কেত আমরা বেশ বুঝতে পারতাম। একঝলক সাদা শাড়ীর ঝলক আমরা বহুদিন দেখেছি। অবশেষে একদিন জিয়াগঞ্জ থাকার মেয়াদ শেষ হল। বাবা বদলী হলেন অন্যত্র। শুধু মনে আছে, আমরা যেদিন মালপত্র নিয়ে গাড়ীতে উঠে চলে যাচ্ছি, সেদিন তাকে দেখেছিলাম আর একবার। এক সাদাশাড়ী অশরীরী দাঁড়িয়ে ছিলেন বাড়ীর গেটে। হয়ত, আমাদের বিদায় জানাবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন।দেখুন এ কথা লিখতে গিয়ে আমার চোখ জলে ভরে গেছে। তাকে যে আমরা ভালবেসে ফেলেছিলাম। আজ এই চোখের জলে মনে হল, সে ভালবাসা তো আজও মরেনি। হয়ত ভালবাসা মরেওনা কোনদিন।

Saturday, 29 June 2019

যোধপুর টু জয়সলমীর

তখন সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা সবে দেখেছি। একে জাতিস্মর মুকুল সঙ্গে ফেলুদা, গ্লোব ট্রটার কামু মুখার্জি, লালমোহন বাবু, সর্বোপরি সোনার কেল্লা। সে এক জমজমাট ব্যাপার।  কামু মুখার্জি আমার খুব চেনা। দাপুটে অভিনেতা তো বটেই। তবে বাস্তবেও তিনি খুব দাপুটে ছিলেন। প্রায়দিনই সন্ধ্যাবেলায় তার সঙ্গে দেখা হত।  থাকতেন  ফুলবাগানের মোড়ে। তবে টলমলে অবস্থায়।  বাংলায় পুরো নিবেদিত। তখন যে সব সংলাপে গমগম  করতেন, তা লেখায় অসুবিধে আছে।  আর লালমোহন বাবু মানে সন্তোষ দত্ত থাকতেন  মানিকতলায়।  ছায়া সিনেমার পাশের গলিতেই তার বাড়ী। অনেকবারই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে৷ দুএকবার তার সঙ্গে যেচে গিয়ে কথাও বলেছি। ভারী বিনয়ী ভদ্রলোক ছিলেন। বাকী রইল তপসে। তপসে কিন্তু শেয়ার বিশেষজ্ঞ। শেয়ারের উপর অনেক বইও আছে।  তো, তার কাছে ক্লাসও করেছি কিছুদিন।  ওই শেয়ার নিয়েও। যদিও সুবিধে করতে পারিনি মোটেই। তবে এসবই  নেহাৎই পরের কথা।   আর আমার এই যাত্রা অনেক আগের,  প্রায় বছর ত্রিশেক কি তারও আগে। শুধু জয়সলমীর অবশ্য নয়। পুরো রাজস্থানই। রাজস্থান ঢুকতে বরাবরই আমার প্রিয় রুট, আগ্রা হয়ে ভরতপুর ছুঁয়ে জয়পুর দিয়ে ঢোকা। এর উল্টোটাও অবশ্য হয়। তবে আগ্রার তাজমহল আর ফতেপুর সিক্রি ছুঁয়ে না ঢুকলে রাজস্থান দেখার রোমান্সের ভিতই তৈরি হয় না। রাজস্থান রাজারাজড়ার জায়গা। তাই সেখানে রাজার মতই যেতে হয়। না হলে আর রাজার মত সম্মান পাবেন কি করে? তো আমিও প্রথমবারে গিয়েছিলাম ওই প্রায় রাজার মতই। রাজত্ব ছিলনা ঠিকই  কিন্তু সঙ্গে সেঁটে ছিল দুই শালী।  রাজা শালীবাহন, ছিলেন না একজন?


রাজস্থান  লম্বা ট্যুর। অনেক ঘোরা,অনেক খাওয়া আর অনেক গপ্প। কাজ কি ওতসবে।তার চেয়ে চলুন একেবারে জাম্পকাট করে চলে যায়, যোধপুর। যোধপুরের কথা মনে পরে নিশ্চয়ই।  এখানেই সার্কিট হাউসেই ফেলুদা ছিলেন না? আমরা অবশ্য উঠেছিলুম একটা হোটেলে।  কোন সে হোটেল,  সে নাম আর মনে নেই। তবে যোধপুর ষ্টেশনের কাছে একটা হোটেলে খাবার কথা মনে আছে। পুরো শাকাহারী। গরমাগরম রুটির উপর দরাজ হাতে দেশী ঘিউ মাখিয়ে, সবজী, আচার, অড়হর ডাল আর শেষে লস্যির গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনে হল, জীবনে আর চাওয়ার কিছুই নেই।
যোধপুরের ক্লোকরুমে মালপত্র রেখে উঠে বসলুম জয়সলমীর এক্সপ্রেসে। রিজার্ভেশন করাই ছিল প্রায় ঝাড়া হাত পা। ভোরে পৌঁছবে জয়সলমীর। অভিজ্ঞতার অভাব যে কি নিদারুণ তা বুঝলুম ট্রেন কিছু রাস্তা চলার পরেই। সব শীতবস্ত্র তো ক্লোকরুমে রেখে এসেছি। আর এদিকে ট্রেন  যত মরুভূমিতে ঢুকছে ততই শীত যেন জাপটে ধরছে। শোয়া থেকে উঠেবসা, দাঁড়ানো, শেষে কামরার এ মাথা ও মাথা পায়চারি করতে করতেই ভোরভোর  পৌঁছে গেলুম জয়সলমীর।  ট্রেন থেকেই নেমেই,  সামনেই সেই সোনার কেল্লা। সেইসব দিনে বাঙালির মনে ফেলুদা, সোনার কেল্লা,লালমোহন বাবুকে নিয়ে যে রোমান্টিসিজম ছিল, তা আজকে আর বলে বোঝানো যাবে না। তবে আমরা জমে গেলাম দস্তুরমতন। শীতে আর রোমান্সেও।

 উটের দুধের ঘন চা সেও পেয়ে গেলাম স্টেশন চত্তরেই। তখন জয়সলমীরে এত হোটেল ছিলনা। ট্যুরিস্ট লজে জায়গাও হয়ে গেল। তখন হলিউডের এক সিনেমার শুটিং চলছিল।  তাদের লোকেই গোটা লজ ভর্তি। তো হল জয়সলমীর দর্শন ইত্যাদি।  সে সব সাতসতেরোতে যাচ্ছিনা। আসল চমক বা চমৎকার ফেরার পথেই। ট্রেনেই ফিরছি যোধপুর।  এবার অবশ্য দিনে দিনেই।  পোখরানের নাম তো সবার জানা। তখন অবশ্য এ নাম খুব পরিচিত ছিলনা। ছোট্ট স্টেশন।  স্টেশনের বাইরেও যে খুব জমজমাট, তা নয়। তবে আমাদের ট্রেনের স্টপেজ ছিল এক ঘন্টা।  একটু হেটে বাইরে আসতেই চোখে পরল ছোট্ট একটা মিষ্টির দোকান।  চমচম বানাচ্ছে একজন। সাদা গুরো ক্ষীরের আস্তরণ মাখা। এক একটা প্রায় কোলবালিশের মতই। আর স্বাদ। ব্যাস পুছিয়ে মত। পোখরানের  আনবিক বোমা বিস্ফোরণের বহু আগেই পোখরানের চমচমের স্বাদের বিস্ফোরণ, সে শুধু আমিই জানি, আর আজও সে স্বাদের অনুরনন আমার অনুভবের পরতে পরতে।  এ তো প্রায় ৩০/৩৫ বছর আগের ঘটনা। এই বছর কয়েক আগেই আবার জয়সলমীর গিয়েছিলুম। ফেরার পথে পোখরানেও থেমেছি। শুধু  চমচমেরই জন্যেই। কিন্তু সেই স্বাদ আর ফিরে আসেনি। ৩০/৩৫ বছর আগে জীবনের যে স্বাদ ছিল তা আর ফিরবেই বা কি করে?