Wednesday, 31 July 2024

দিল্লি দূর নেহি

 এবার দিল্লি এসে অব্দি বেশ টোটো করে ঘোরা হচ্ছে। দিল্লি বিরাট শহর।  তার এস্পার ওস্পার করে যাচ্ছি এবেলা ওবেলা, যদি ভেবে থাকেন টোটো করে, তাহলে আপনার বোঝার গোঁড়াতেই গলদ। টোটোর সাধ্য নেইকো এতো লম্বা দৌড় দেওয়ার। অটোও এতটা পারবে না। সে আপনি যদি ওলা/উবের নেন, তাহলে অন্য কথা। কিন্তু মধ্যবিত্তের পকেটের এতো ক্ষ্যামতা নেই, যে দুবেলা ওলা/উবেরের খরচ সামাল দিতে পারবে। তাও আমি ঘুরছি, ঘুরেই চলেছি। ক্যামনে কও দেখি? আছে আছে সে উপায়ও আছে। এবার দিল্লিতে এসে উঠেছি করোলবাগে।  ওই যে দিদির কত রকমের পকল্প আছে না, দুয়ারে সরকার, দুয়ারে হ্যান, দুয়ারে ত্যান। তেমনটি ঠিক নয়। এটা দুয়ার ছাড়ার প্রকল্প। করোলবাগ মেট্রো এবার আমার দিল্লির আস্তানার ঠিক দোর গোড়ায়। তাই অটো, টোটো, উবের সবের সবাইকেই দিয়েছি তালাক। পুরো মেট্রোর পিঠে চেপে এপার ওপার দিল্লি হিল্লি কিছুই বাদ দিই নিকো। আর দিল্লি রাজধানী বলে কথা তার মেট্রোও রাজকীয়।  যেমন বিস্তিত এর নেটওয়ার্ক।  তেমনি ঘড়ি ধরে মেট্রো আসছেই মিনিটে মিনিটে। তাই নো তাড়াহুড়ো।  ট্রেন যদি মিসও করেন, জানবেন তার পরের মিনিটেই ট্রেন এসে যাবে। ৩৯৩ কিলোমিটারের নেটওয়ার্ক, ১২ টা লাইন আর ২৮৮ টা মেট্রো স্টেশন।  ভাবা যায়? আরো বেড়েই চলেছে। দিল্লির মেট্রোর এপটাও অসাধারণ।  শুধু কোথা থেকে কোথায় যাবেন, লিখে দিন।  নিমেষে আপনাকে রুট প্লান দিয়ে দেবে। যা দেখে আমার মতো আহাম্মকও পৌঁছে যাবে তার গন্তব্যে। সে যা হোক অনেক গুণকীর্তন তো হলো। এবার অন্য প্রসঙ্গেই আসি।


যাতায়াত যত ডানা মেলেই করি। খাওয়া দাওয়া নিয়ে বেশ কষ্ট। একে তো পাঞ্জাবী ডেন। তার খাওয়া দাওয়াও তেমনই বল্লে বল্লে টাইপ। ইতনা ঘিউ, ইতনা মালাই ওয়ালা খানা যে আমার মতো পেটরোগা বাঙালীর কাছে সক্রেটিসের হেমলক পানের তুল্য। এক আধবেলার বেশী সহ্য করা মুস্কিল। আর আছে সাউথ ইন্ডিয়ান খাবার।  ওদের সবেতেই ইমলি গোলা।  হায়দ্রাবাদে একবার বিরিয়ানি খেয়েছিলাম। তাতেও দেখি ছোট একটা বাটি ভর্তি তেঁতুল গোলা জল দিয়েছে। কি নিদারুণ পরিহাস। 


সে যাই হোক দিনে পাঞ্জাবি আর রাতে দক্ষিণীই চলছে। রাতে দক্ষিণী খাবার একটা এডভান্টেজ অবশ্য পাচ্ছি। সকালে উঠে পুরো ক্লেদমুক্ত শরীর। পুরো ফুরফুরে মন আর হাল্কাফুল্কা শরীর আর মন নিয়ে হিল্লি দিল্লি যেখানে ইচ্ছে উড়ে বেড়ান।


আর বিকেলে সামোসা আর জিলিপি আমার অলটাইম ফেভারিট তো আছেই। আমার ডায়েটিশিয়ান আমাকে পাঁচ পাতার ডুস এন্ড ডোন্টস দিয়েছে। তাতে সিঙ্গারা আর জিলিপি নৈব নৈব চ।  ডায়েটিশিয়ানকে মারো গোলী। পৃথিবীতে কে বা কবে অমর হতে পেরেছে? আর যারা জিলিপির স্বাদ নিতে অপারগ। তারা যে জীবন্মৃত।  তাদের কথা ভেবে আমার বড্ড মায়া হয়।

Thursday, 11 July 2024

ইলিশ ও সুন্দরী

 



ইলিশ ও সুন্দরী

তখন ১৯৭৯-৮০।  লেকটাউনে থাকতাম,  আমার অফিস তখন আমহার্স্ট স্ট্রীটে। স্কুটার চালিয়ে  ব্যাংকে আসতাম, গায়ে লাল সার্ট, চোখে সানগ্লাস  মানিকতলা হয়ে আমহার্স্ট স্ট্রীটে ধরে সিটি কলেজ পেরিয়ে রোজ ছিল আমার আসা যাওয়া।  ফেরার পথে মানিকতলা বাজার পরত। মানিকতলা বাজারের মাছ মানে কলকাতার সেরা মাছ। চওড়া চওড়া ইলিশ  কিনে নিয়ে যেতাম প্রায়ই। তখন ইলিশের এত আকাল ছিল না। বর্ষাকালে খিচুড়ি আর ইলিশ মাছ ভাজা তখন ঘন ঘন রাতের মেনুতে থাকত। তো আরও অনেক কিছুর মতই সে সব দিনও আজ শুধুই অতীত, বিষন্ন অতীত।

তবে এত ভুমিকা নেহাৎ ইলিশের জন্য নয়। সে ছিল একজন। আজ হঠাৎই মনের পর্দায় ভেসে উঠল তারই জলছবি, মনের কোন গভীর গহন কোণে সে এতদিন অশোকবনে সীতার মতই বন্দী হয়ে ছিল।  সেইসময়,আমার চেহারার জৌলুশও ছিল খুব৷ মধুমেহ আসতে তখন অনেক বাকী।  সিটি কলেজের অনেক মেয়েই তখন দাঁড়িয়ে থাকত যেন আমারই প্রতীক্ষায়। এক সুন্দরীর সাথে নিত্য হত চোখাচোখি। স্কুটারের গতি হয়তো কমে আসত কিন্তু থামতে পারিনি কোনদিনও। আজ ৪০ বছর বাদে সেইরকমই এই মেয়ের সাথে দেখা। তাই তার কথা আজ চকিতে মনে পরল। এই মেয়ে, হয়তবা সেই মেয়েরই মেয়ে,যে মেয়ে এতদিন লুকিয়ে ছিল আমারই মনের গভীরে। আজ যেন সে মুক্তি পেল তার বন্দীদশা থেকে। আর আমাকেও মুক্ত করে দিয়ে গেল।

Saturday, 29 June 2024

যোধপুর টু জয়শলমীর

 ফেলুদারা পুরনো হয় না


যোধপুর টু জয়সলমীর 


তখন সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা সবে দেখেছি। একে জাতিস্মর মুকুল সঙ্গে ফেলুদা, গ্লোব ট্রটার কামু মুখার্জি, লালমোহন বাবু, সর্বোপরি সোনার কেল্লা। সে এক জমজমাট ব্যাপার।  কামু মুখার্জি আমার খুব চেনা। দাপুটে অভিনেতা তো বটেই। তবে বাস্তবেও তিনি খুব দাপুটে ছিলেন। প্রায়দিনই সন্ধ্যাবেলায় তার সঙ্গে দেখা হত।  থাকতেন  ফুলবাগানের মোড়ে। তবে টপভূজঙ্গ অবস্থায়।  বাংলায় পুরো নিবেদিত। তখন যে সব সংলাপে গমগম  করতেন, তা লেখায় অসুবিধে আছে।  আর লালমোহন বাবু মানে সন্তোষ দত্ত থাকতেন  মানিকতলায়।  ছায়া সিনেমার পাশের গলিতেই তার বাড়ী। অনেকবারই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে৷ দুএকবার তার সঙ্গে যেচে গিয়ে কথাও বলেছি। ভারী বিনয়ী ভদ্রলোক ছিলেন। বাকী রইল তপসে। তপসে কিন্তু শেয়ার বিশেষজ্ঞ। শেয়ারের উপর অনেক বইও আছে।  তো, তার কাছে ক্লাসও করেছি কিছুদিন।  ওই শেয়ার নিয়েও। যদিও সুবিধে করতে পারিনি মোটেই। তবে এসবই  নেহাৎই পরের কথা।   আর আমার এই যাত্রা অনেক আগের,  প্রায় বছর ত্রিশেক কি তারও আগে। শুধু জয়সলমীর অবশ্য নয়। পুরো রাজস্থানই। রাজস্থান  বরাবরই আমার প্রিয় রুট, আগ্রা হয়ে ভরতপুর ছুঁয়ে জয়পুর দিয়ে ঢোকা। এর উল্টোটাও অবশ্য হয়। তবে আগ্রার তাজমহল আর ফতেপুর সিক্রি ছুঁয়ে না ঢুকলে রাজস্থান দেখার রোমান্সের ভিতই তৈরি হয় না। রাজস্থান রাজারাজড়ার জায়গা। তাই সেখানে রাজার মতই যেতে হয়। না হলে আর রাজার মত সম্মান পাবেন কি করে? তো আমিও প্রথমবারে গিয়েছিলাম ওই প্রায় রাজার মতই। রাজত্ব ছিলনা ঠিকই  কিন্তু সঙ্গে সেঁটে ছিল দুই শালী।  রাজা শালীবাহন, ছিলেন না একজন?  


রাজস্থান  লম্বা ট্যুর। অনেক ঘোরা,অনেক খাওয়া আর অনেক গপ্প। কাজ কি ওতসবে।তার চেয়ে চলুন একেবারে জাম্পকাট করে চলে যায়, যোধপুর। যোধপুরের কথা মনে পড়ে নিশ্চয়ই।  এখানেই সার্কিট হাউসেই ফেলুদা ছিলেন না? আমরা অবশ্য উঠেছিলুম একটা হোটেলে।  কোন সে হোটেল,  সে নাম আর মনে নেই। তবে যোধপুর ষ্টেশনের কাছে একটা হোটেলে খাবার কথা মনে আছে। পুরো শাকাহারী। গরমাগরম রুটির উপর দরাজ হাতে দেশী ঘিউ মাখিয়ে, সবজী, আচার, অড়হর ডাল আর শেষে লস্যির গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনে হল, জীবনে আর চাওয়ার কিছুই নেই।

যোধপুরের ক্লোকরুমে মালপত্র রেখে উঠে বসলুম জয়সলমীর এক্সপ্রেসে। রিজার্ভেশন করাই ছিল প্রায় ঝাড়া হাত পা। ভোরে পৌঁছবে জয়সলমীর। অভিজ্ঞতার অভাব যে কি নিদারুণ তা বুঝলুম ট্রেন কিছু রাস্তা চলার পরেই। সব শীতবস্ত্র তো ক্লোকরুমে রেখে এসেছি। আর এদিকে ট্রেন  যত মরুভূমিতে ঢুকছে ততই শীত যেন জাপটে ধরছে। শোয়া থেকে উঠেবসা, দাঁড়ানো, শেষে কামরার এ মাথা ও মাথা পায়চারি করতে করতেই ভোরভোর  পৌঁছে গেলুম জয়সলমীর।  ট্রেন থেকেই নেমেই,  সামনেই সেই সোনার কেল্লা। সেইসব দিনে বাঙালির মনে ফেলুদা, সোনার কেল্লা,লালমোহন বাবুকে নিয়ে যে রোমান্টিসিজম ছিল, তা আজকে আর বলে বোঝানো যাবে না। তবে আমরা জমে গেলাম দস্তুরমতন। শীতে আর রোমান্সেও। 


 উটের দুধের ঘন চা সেও পেয়ে গেলাম স্টেশন চত্তরেই। তখন জয়সলমীরে এত হোটেল ছিলনা। ট্যুরিস্ট লজে জায়গাও হয়ে গেল। তখন হলিউডের এক সিনেমার শুটিং চলছিল।  তাদের লোকেই গোটা লজ ভর্তি। তো হল জয়সলমীর দর্শন ইত্যাদি।  সে সব সাতসতেরোতে যাচ্ছিনা। আসল চমক বা চমৎকার ফেরার পথেই। ট্রেনেই ফিরছি যোধপুর।  এবার অবশ্য দিনে দিনেই।  পোখরানের নাম তো সবার জানা। তখন অবশ্য এ নাম খুব পরিচিত ছিলনা। ছোট্ট স্টেশন।  স্টেশনের বাইরেও যে খুব জমজমাট, তা নয়। তবে আমাদের ট্রেনের স্টপেজ ছিল এক ঘন্টা।  একটু হেটে বাইরে আসতেই চোখে পরল ছোট্ট একটা মিষ্টির দোকান।  চমচম বানাচ্ছে একজন। সাদা গুড়ো ক্ষীরের আস্তরণ মাখা। এক একটা প্রায় কোলবালিশের মতই। আর স্বাদ। ব্যাস পুছিয়ে মত। পোখরানের  আনবিক বোমা বিস্ফোরণের বহু আগেই পোখরানের চমচমের স্বাদের বিস্ফোরণ, সে শুধু আমিই জানি, আর আজও সে স্বাদের অনুরনন আমার অনুভবের পরতে পরতে।  এ তো প্রায় ৩০/৩৫ বছর আগের ঘটনা। এই বছর কয়েক আগেই আবার জয়সলমীর গিয়েছিলুম। ফেরার পথে পোখরানেও থেমেছি। শুধু  চমচমেরই জন্যেই। কিন্তু সেই স্বাদ আর ফিরে আসেনি। ৩০/৩৫ বছর আগে জীবনের যে স্বাদ ছিল তা আর ফিরবেই বা কি করে?

Wednesday, 26 June 2024

ভুবন সোম

 আজ নবমী

আজকের ছবি

ভুবন সোম


ন'দিন পেরোতে চললো। এখনো মৃনাল সেনের কোন ছবির কথাই আসেনি। তাই কি হয়? আজকের ছবি আমার বিশেষ ভালোলাগার ছবি মৃনাল সেনের, 'ভুবন সোম'!

এ ছবিও অনেক আগের দেখা। বোধহয় তখন কলেজের ফার্স্ট ইয়ারের ছোকরা। প্রায় ফাঁকা হলে আমি আর আমার পিসতুতো ভাই বাবলু বহরমপুরের কল্পনা সিনেমা হলে দেখেছিলুম। অনেকটাই ভুলে গিয়েছিলাম।  কিন্তু ভালো লাগাটা মনে বেশ ছাপ রেখে গিয়েছিল। তাই আজ আবার ইউ টিউবে এই ছবি দেখে নিলাম। ছোট ছবি। সাদা কালোয় ঝকঝকে ছবি,বোর হবেন না মোটেই, মুগ্ধ যে হবেন এ কথা বলতেই পারি। সেই সময়ে তিন তিনটে ন্যাশনাল এওয়ার্ড পেয়েছিল এই ছবি। শ্রেষ্ঠ ফিচার ফিল্ম, শ্রেষ্ঠ পরিচালক আর শ্রেষ্ঠ অভিনেতা। আর ভুবন সোম কে জানেন? উৎপল দত্ত।  তার অসাধারণ অভিনয়ের জন্য তিনি সে বছরের শ্রেষ্ঠ অভিনেতা হয়েছিলেন। আর ছিলেন সুহাসিনী মূলে।ভারী মিষ্টি এক গুজরাটি গাঁয়ের বধুর চরিত্রে।


এ ছবি ভারতীয় চলচ্চিত্রে ন্যু ওয়েভের পথিকৃৎ। শ্যাম বেনেগাল তো তার অনেক পরে এসেছেন। যদিও ফিল্ম বোদ্ধা নয়, তবু্ও এ ছবির ট্রিটমেন্ট মুগ্ধ করেছিল।জাম্প কাট কি তা প্রথম এই ছবি দেখেই জানলাম।  ভারী মুগ্ধ করেছিল আমার মত আনপড় আদমীকেও। এ ছবির সরলতা, নিপুণ বুননী আবিষ্ট করে রাখবে যে কাউকে। এ ছবির থিম কিন্তু জীবনের একঘেয়েমি, সরলতা,সমবেদনা আর সহভাতৃত্বকে কে ঘিরেই।


মূল গল্পটা এইরকম। 

ভুবন সোম রেলের এক উচ্চপদস্থ অফিসার। সৎ, ভীষণ কড়া, কোন দুর্নীতিই তিনি বরদাস্ত করেন না।  রেলের কর্মীরা তাই তাকে নিয়ে সন্ত্রস্ত।  এই পরিচয় নিয়েই ভুবন সোমের প্রবেশ গুজরাটের কোন  এক গ্রামে পাখি শিকারের জন্যে। এখানেই তার দেখা গ্রামের বধু গৌরীর সাথে। গৌরীর সাহায্যেই তিনি পরিচিত হলেন প্রকৃতির মাঝে, পাখিদের সাথে। শহুরে জীবনের ধরাচূড়া ছেড়ে গ্রামের পোষাকে তিনি মিশে গেলেন  প্রকৃতির সাথে, পাখীদের সাথে, জীবনের সাথে। চিনতে পারলেন জীবনের সরলতাকে, বুঝতে পারলেন সমবেদনা, সহভাতৃত্বের মূল্য। ভুবন সোম পাখি শিকার করতে পারলেন কি, না, সেটা কোন প্রসঙ্গই নয়। তবে শহরে ফিরে এলেন এক অন্য ভুবন সোম। বড় সমব্যথী, মানুষের প্রতি জীবনের প্রতি।  দুর্নীতির দায়ে এক রেলের কর্মীকে তিনি দিয়ে দিলেন বেকসুর খালাস৷ জাম্পকাট করে যেন ফিরে এলেন তিনি জীবনের মূলস্রোতে।

Tuesday, 25 June 2024

চারুলতা

 কোন এক পূজোর সময় লেখা


আজ অষ্টমী

আজকের ছবি 

চারুলতা 


এবার পুজো হবে কি হবেনা,  তার ঠিক নেই আর আমি অষ্টমীর ঢাকে কাঠি দিয়ে দিলাম। এ অবশ্য আমার কৃতিত্ব নয়। এই অকাল বোধনের দায়  দায়িত্ব সবই দীপকের। আমি শুধু হুকুম তামিল করে গেছি। এর পাপ পূন্য কোন কিছুই আমি চাইনে, শুদ্ধা ভক্তি, সেও আমার নয়। ভক্তি তো unconditional surrender. আমরা মুকসুদাবাদের লোক, চিরকালের ঘাড়টেঁড়া। শির নেহারি নতশির ওই...  আর যার হয় হোক, ও আমাদের নয়। ভক্তির বদলে ভালোবাসা বরং ঢের ঢের ভালো।  তিরতিরে হাওয়ার মত ছুঁয়ে যাবে,বয়ে যাবে কিন্তু বেঁধে রাখবে না।


আজকের ছবি চারুলতা। একদিকে রবীন্দ্রনাথের 'নষ্টনীড়' আর তাকে নিয়ে সত্যজিতের আঁকা কবিতা সেলুলয়েডে। আমরা এ ছবি দেখেছি স্কুলে পড়তে৷ তখন বোধহয় ক্লাস টেনে লালবাগের নবাব বাহাদুর স্কুলে। ছোটবেলা থেকেই আমাদের ধুম আড্ডা চলত। কখনও মতিঝিলে কখনো হাজারদুয়ারীর সিঁড়িতে  আর কখনো বা আমাদের স্কুলের বিরাট হোস্টেলে। আরও অজস্র কতো জায়গায়ই যে ছিল,তবে এতসব জেনে কাজ নেই আপনাদের। মূল কথা আড্ডা হত জমজমাট।নবাব ওমরাহ থেকে হরিপদ কেরাণীর ছেলে সবাই আমরা বন্ধু। বন্ধুদের মধ্যে কি কোন ওপর নীচ থাকে। বন্ধু সবাই এক একজন হীরের টুকরো। আড্ডার কিন্তু কোনদিনও ছুটি নেই। বরং ছুটির দিনে সকাল বিকেল দুবেলায়। ওই বয়সেই সিগারেট ফোঁকা শিখে নিয়েছিলাম। আমাদের প্রথম প্রেম চারমিনার। আমার বা আমাদের এই ব্যসনের গুরু ছিল, পাপ্পু নবাব। নবাব হলে কি হবে, এক নম্বরের বয়াটে ছোকরা।  শুধু সিগারেট ফোঁকাই নয় কত সব দুষ্টু দুষ্টু  ছড়াই যে শিখিয়েছিল, তা আর কহতব্য নয়।

তবে , চারুলতা দেখার পরেই কিন্তু চারমিনার হয়ে গেলো আমাদের আদরের  'চারু'! চারমিনার কে আদর করে এই নামেই ডাকতাম আমরা। এখন আর আমাদের সেই চারমিনারও নেই, নেই সেই আদরের ডাক, "আমার চারু আছে'!


এমন একটা ধ্রুপদী ছবির আলোচনায় শুধু ফক্কুড়ি করে গেলাম। আসলে এতো সব জ্ঞানগর্ভ আলোচনার রসদ মানে জ্ঞানই নেই আমার। দীপককে ট্যাগ করে দিলাম, আমি নিশ্চিত ও সেই খামতি টুকু ঠিক পূরণ  করে দেবে। দীপকে আমার ভারী বিশ্বাস।  তবে পরীক্ষার খাতায় কিছুই কি লিখতে পারব না। সাদা খাতা? কভি নেহি।


  এ ছবি সবাই দেখেছেন,

 কি? না দেখলে দেখে নিন ইউটিউবে। সুন্দর এক কবিতার মত।একাকিত্বের ছবি,ভালোবাসার ছবি। হয়ত নিরুচ্চার। শীতের নদীর মত, যার ছলছলে স্বচ্ছ জলের মতই, সব দেখা যায় কিন্তু ছোঁয়া যায়না। এ ছবি তেমনই অন্তত তাই আমার অনুভবে ধরা দেয়। ফিল্ম বোদ্ধারা কি বলবেন, তা জানি না। তবে ভারী well crafted, meticulous. এবার যখন আবার দেখলাম,মনে হল এতটা নিঁখুত হবার কি কোন প্রয়োজন ছিল? এ ছবির দুটো দৃশ্য কিন্তু ভারী মনে রাখার মত। শুরুতে মাধবীর বায়নাকুলার হাতে বাড়ীর জানালায় জানালায় ছুটে বেড়ানো, যা তার অসহায় একাকীত্বের প্রতিচ্ছবি।  আর শেষ দৃশ্য চারু আর ভূপতি এক ফ্রেমে হঠাৎ ফ্রিজ হয়ে যাওয়া।  ক্রমশ লং শট। নষ্টনীড় বোঝাতে আর কিছুর দরকারই ছিল না। এর বেশী কিছু বুঝে থাকলে আমাকে জানাবেন কিন্তু। অষ্টমীর পূজো শেষ,  এবার সন্ধি পূজার আয়োজনে লেগে পড়ি?

রিয়া

 গত কয়েকদিন ধরেই  ফেসবুক মেতেছিল ননীগোপালের দোলখেলা নিয়ে। সে যে কি রঙ্গ তামাসা হয়েছে, তা দুচোখ দিয়ে না দেখলে পেত্যয় হবে না। ফেসবুকেও তার কিছু আভাস দিয়েছি আমরা সবাই। অনেকেই দেখেছেন বুড়ো ধামড়াদের লীলাকীর্তন। 

তবে দোলের দোলন এবার শেষ হয়েছে। যে যার ঘরে গিয়েছে ফিরে। তবু মনে হলো এ সবের সামনে যারা আসেনি, পেছন থেকে এই বুড়োদের আবদার, চাহিদার জোগান যারা দিয়ে গেছে মুখে ম্লান হাসি নিয়ে, তাদেরও সামনে আসা দরকার।

প্রথমেই যার কথা মনে এলো সে রিয়া। রিয়া কিন্তু বেশ আধুনিক নাম। বড়লোকের আদুরে মেয়েরাই যে শুধু রিয়া হবে এমনতো নয়। আমাদের আজকের চরিত্র, রিয়া কিন্তু পিতৃমাতৃহীন। কোথায় না কোথায় অনাদরে অবহেলায় বেড়ে উঠেছে, সে কে বা জানে? রিয়া কিন্তু বাঙালী কোন মেয়ে নয়। রিয়া তামাং।  তামাং উত্তরবঙ্গের এক আদিবাসী প্রজাতির মেয়ে। যে দুদিন আমরা রেনীতে ছিলাম, আমাদের সব চাহিদার জোগান দিয়ে গিয়েছে  নিরন্তর।ভারী দু:খী মেয়ে, মুখ দেখলেই বড় মায়া জাগে। ওর সম্মন্ধে আমি এতকিছু জানতে পারতাম না যদি না ননী বলতো। রিয়া ননীর সাথে দীর্ঘ পথ হেঁটে গিয়েছিল রেলী বাজারে আমাদেরই কারুর এক জরুরী ওষুধের প্রয়োজনে। ননীর একটা বড় গুণ সবার সাথেই সহজভাবে মিশতে জানে। ওই দীর্ঘপথে ও রিয়ার ছোট্ট জীবনের বড় বড় দু:খের অংশীদার হয়ে গিয়েছিল।ননীর পিতৃহৃদয় সে দু:খের কথা শুনে উদ্বেলিত হয়ে উঠেছিল। ওই ছোট্ট বাজারে কি আর পাওয়া যায়? রিয়ার ছোট্ট দুটি হাত অজস্র চকোলেট দিয়ে সে ভরিয়ে দিয়েছিল।


এখানেই কিন্তু গল্পের শেষ নয়। ওপরে রিয়ার পাশে যাকে দেখছেন, সে রোনাল্ড। রোনাল্ড লেপচা। লেপচারাই দার্জিলিং এর আদত আদিবাসী। রোনাল্ড কি এমন করলো, যাতে রিয়ার দু:খের দিনের অবসান হলো? স্রেফ রোনাল্ড রিয়াকো ভাগাকে লে গিয়া থা। দুজনেই সাদী করেছে। কাজ করছে দুজনেই ওই রিসোর্টেই। আর উপরে যে পুঁচকেটার ছবি দেখছেন, ও জাস্টিন লেপচা। রিয়ার দেওর। রিয়ার শ্বশুরও ভারী ইয়োং আর ভালোমানুষ। আমাদের জন্যে পাহাড়ী নদীর মাছ ধরে এনেছিল। রিয়া আর জাস্টিন মিলে সে মাছও রান্না করে খাইয়েছিল এই ধেড়ে খোকাদের।  সেই রান্না ওদের ভালোবাসার গন্ধ আর ওমে ভরপুর। তার তুলনা শহরের নামী দামী রেঁস্তোরার  সাথে হতেই পারে না।  

আজ রিয়া সুখী।  ভালো বর ও ঘর পেয়েছে। রিয়ার শ্বশুরবাড়ীও রিয়াকে মেনে নিয়েছে। ওরা সবাই মিলে নিটোল এক ভালোবাসার ছবি। আপনারাও সবাই ওদের আশীর্বাদ করুন যাতে ওদের আগামী দিনের পথ প্রশস্ত হয়। হয়ত অভাব আছে, থাকবেও, তাও ওরা সবাই মিলে একসাথে এগিয়ে চলুক। এর বেশী জীবনে আর কি বা, চাই?

Thursday, 20 June 2024

চলতে চলতে

 পুরনো  লেখা


চলতে চলতে


আজ কলেজ স্ট্রীট যেতে হয়েছিল একটি জরুরী কাজে।  জরুরী আবার জরুরী নয়ও।  ওই শ্রডিঙ্গারের বেড়ালের মতই অনেকটা। একটু বেরিয়ে পরার ছুতো। কিন্ত বাটার মোড়ে নেমে মনে হল এর থেকে জরুরী একটা কাজ বাকী রয়ে গেছে। দীপকবাবুর খবর নেওয়া। দীপক বাবুকে নিশ্চয় ভুলে জাননি এরমধ্যে। দীপক গুপ্ত, রামকৃষ্ণ কথামৃতের,কথাকার শ্রীম, মহেন্দ্র গুপ্তের প্রপৌত্র। কর্মজীবনে তিনি ছিলেন বিদ্যাসাগর কলেজের অর্থনীতির বিভাগীয় প্রধান। বহুদিন অবসর নিয়েছেন। আমার সাথে তার বিশেষ ভালবাসার/স্নেহের সম্পর্ক । কিন্তু বেশ কিছুদিন তার সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়নি।দোষ একতরফা আমারই। আজ তাই আমার জরুরী কাজ ছিল আগে তার খবর নেবার, তার সঙ্গে দেখা করার।

 লাহাদের বাড়ীগুলো পাশে রেখে এগোলাম, কথামৃত ভবনের দিকে। এই অঞ্চল আমার খুবই পরিচিত এবং প্রিয়।লাহাবাড়ী, দেবদের বাড়ী, মিত্রদের বাড়ী, দত্তদের বাড়ী এককালের বনেদীয়ানার কেষ্টবিষ্টু সব। আমাদের সাথে এদের যোগাযোগ ছিল খুবই নিবিড়।  পথে পরল ঠনঠনিয়া কালীবাড়ী। যদিও অবিশ্বাসী মানে বিশ্বাসের জোর খুজে পাইনে।  দেবদেবতা, গুরুস্থানীয়দের নিয়ে মস্করা করতে ছাড়ি না, তবুও অভ্যাস বসে একটা পেন্নামই ঠুকে দিলাম  মায়ের পায়ে।যতটা না দেবতা জ্ঞানে,তার থেকে পাশের বাড়ীর ঠাকরুন ভেবে। ঠনঠনিয়া কালীবাড়ীতে ঘোষেদের অংশীদারি আছে। ঘোষবাড়ীর বউ কল্যাণী আমার বিশেষ প্রিয়পাত্রী ছিলেন এককালে।  মাকালীর প্রসাদী শাড়ী, প্রসাদ অনেক পেয়েছি হাত ভর্তি করে। আসলে ঠনঠনিয়াই তে তার ডাব চিনি দিয়ে মানত, কখনো কেশবের জন্য কখনো বা মথুরের তরে। যুক্তির জালে যতই তাদের উড়িয়ে দিই, হৃদয়ের টানে কি ভাবে যেন বাঁধা পরে যায় তাদের কাছে। তাই এই উত্তরেই আমার সব প্রশ্নের উত্তর আর সব ভালবাসা এই উত্তরকে ঘিরেই। এযে বেঙ্গল রেঁনেসার আতুড়ঘর, এর প্রতিটি ধুলিকণায় যে পবিত্র সেই সব মহাপুরুষদের নিত্য আসা যাওয়া। কে সেখানে নেই? রামমোহন, রবি ঠাকুর, বিবেকানন্দ, কেশব। তাই এই উত্তর কলকাতার বাড়ীঘর, স্থাপত্য, রাস্তাঘাটে সবেতেই বাঙালি ঐতিহ্যের সোঁদা গন্ধ আমার প্রাণ মনকে আবিষ্ট করে রাখে।


শংকর ঘোষ লেনে ঢুকে , রঞ্জিতের সাথে দেখা হল। রঞ্জিত সিং, ব্যাবসায়ী। পানের দোকান থেকে আজ বিরাট ব্যবসার মালিক। এর পেছনে অবশ্য স্টেট ব্যাংকের একটা ভুমিকা আছে । রঞ্জিতের দোকান থেকে বেশী দূরে নয় কথামৃত ভবন। বিদ্যাসাগর কলেজ পেরিয়েই,পৌছে গেলাম কথামৃত ভবনে। চেনা বাড়ী,বহুবার এসেছি। একইরকম আছে। সিঁড়ি পেরিয়ে দোতলায় উঠেই তার দেখা। তার চওড়া হাসি দেখেই মনে হল, আমাকে চিনতে তার একটুও সময় লাগেনি


দীপকবাবুর কথা শুনলেই বুঝবেন, ইনি কথামৃতর জীবন্ত সংস্করণ।  তিনি বলেন,আমি শুনি।  আমার আজেবাজের প্রশ্নের সন্দেহের  সস্নেহ উত্তর থাকে তার ভাঁড়ারে। তিনি মোটেই রামকৃষ্ণের চৌকিদারি বা খবরদারির মধ্যে নেই। তার এই সহজ ভাবটা আমার বেশ লাগে। আমিও কথা বলে আরাম পাই।কথায় কথায় কেটে গেল দুটি ঘন্টা। এবার রওনা দিলাম ইউনিভার্সিটির দিকে। তবে আসার আগে কথা দিতে হল, আবার আসব এবং খুব শিগ্রিই। এবার যখন যাব তোমাদেরও সঙ্গে নিয়ে যাব, একলা যাবনা। পরিচয় হবে বাঙ্গালীর ইতিহাসের সঙ্গে।  ফেরার পথে এক চলতি ট্রামে লাফিয়ে উঠে পরলাম।ট্রামে চড়ার সাথে পুরোন কলকাতার ভারি মিলমিশ। আমার মেজাজের সাথে বেশ টুংটাং করে হেলেদুলে চলে। অযথা এত তাড়াহুড়োর কিই বা দরকার?  চলুক না এইভাবেই।