Saturday, 6 July 2019



ভূত না ভুতের গপ্প
আজকাল আমাদের ছোটবেলার ভুতেদের মত, আর ভুতেদের গপ্প প্রায় শোনায় যায় না। আসলে আজকালকার বাচ্চাদের মধ্যে ভুতেদের নিয়ে কোন উৎসাহই নেই।  তাই, আজকাল ভুতেদের বাজার বড়ই খারাপ। ভুতরাও আর এত আলো এত শব্দ চারিদিকে এত দৌড়ঝাঁপ আর গন্ডগোলের মধ্যে নিজেদের রুপই নিতে পারে না। তাদেরও তো সাজগোজের জন্য একটা ড্রেসিং রুম চায়। একটু আধো আলো, একটু আধো অন্ধকার, এট্টুখানি ভালবাসা, একটুখানি রোমাঞ্চ, মানে গা ছমছম। না হলে ভুত বেচারী আসেই বা কি করে? তারও তো একটা উপযুক্ত মঞ্চ চাই। তার আসা তো আসা নয়... রীতিমতো আবির্ভাব।
আমার ছোটবেলা আর কিশোরকালের অনেকটাই কেটেছে রঘুনাথগঞ্জ, জিয়াগঞ্জ আর লালবাগের আলো আঁধারী পরিবেশে। সেখানে যেমন ভালবাসা ছিল তেমনি ভালোবাসার মত ভুতেরাও ছিল। সেসব ভুতের গপ্প অনেক শুনেছি মার কাছে, ঠাকুরমার কাছে। গেছোভুত, মেছো ভুত, জমিদার ভুত, বেম্ভদত্যি কতকি। আমাদের জঙ্গীপুরের বাড়ীতেই একটা বেলগাছ ছিল। তাতে নাকি থাকত এক বেম্ভদত্যি।  আমার ঠাকুমা নাকি তাকে দেখেছিলেন একবার গাছ ছেড়ে আমাদের ছাদে এসে বসে থাকতে, ভারী দুখী মনে। এ আমার ঠাকুমার মুখে শোনা। তবে, সেসব ছিল ভারী মানুষঘেষা ভুত, কখনো কারুর ক্ষতি তো করেই নি বরং অনেকের উবগারেই এসেছেন বলে শুনে এসেছি। ছোটবেলায় ঠাকুমার কোলঘেষে অনেক ভুতের গল্পই শুনেছি। গা ছমছম করেছে  কিন্তু ভয় কি পেয়েছি? মোটেই না৷ বরং আজও যেটা মনে রয়ে গেছে সেটা ঠাকুরমার গায়ের ওম আর স্নেহ ভালোবাসা মিলে এক অদ্ভুত অনুভুতির অনুভব। যা আজও মিলিয়ে যায় নি। ভুত যদি বলেন সেটাও তো ভূত মানে আমাদের বিতে হুওয়া কাল।
তবে আমাদের কালে ভুতের অনেক উপাদানই ছিল। আমাদের কালে তো এত ত্রিফলা আর হাইমাস্ট চোখঝলসানো আলোর উপদ্রব ছিলনা। দূরে দূরে ল্যাম্পপোস্টের ওপরে টিমটিমে বালব জলত। হয়ত নির্জন রাস্তায় কেরোসিন লম্ফ জালিয়ে এক আধটা রিক্সা টুংটুং করে হঠাৎ পাশ কাটিয়ে যাবে। সন্ধ্যের পর আলো অন্ধকারে সে এক ভারী রোমাঞ্চকর পরিবেশ।  আমার তো তাই মনে হত।  আর সেখানে যদি আপনি আপনার কল্পনার রশিকে একটু লাগামছাড়া হতে দেন, তাহলে তেনাদের সাক্ষাৎ হতেই হবে।

 সত্যি বলতে কি রঘুনাথগঞ্জ বা লালবাগে আমি অন্তত কোন ভুতেদের সাথে কোন এফেয়ার্সে জড়িয়ে পরিনি। অন্তত লালবাগে সে সম্ভাবনা তো ছিল বিস্তর। নবাব, বাদশাহ, হাতী ঘোড়া অস্ত্রের ঝনঝনানি, তোপের আওয়াজ, হত্যা, ষড়যন্ত্র,  সবই কি হাওয়ায় মিলিয়ে যাবে? এত অসুখী আত্মার অস্তিত্ব সব কি হাওয়ায় মিলিয়ে গেছে। হয়ত না।  তবে আমার অনুভবে তারা আসেননি কেউই। তবে সাপের সাথে দেখা হয়েছে বিস্তর।  লালবাগে তোপখানায় রাস্তার উপর শুয়ে থাকা খরিস সাপের লেজের উপর দিয়ে সাইকেল চালিয়ে চলে গিয়েছি। ফণা তুলে দাঁড়িয়ে পরেছিল ঠিকই কিন্তু ছোবল মারেনি। অবশ্য মারলে এই গপ্প শোনাতে আমার বদলে অন্য কেউ আসত। হাজারদুয়ারীর সামনের মাঠে আমাদের আড্ডার পেছনে এক ফণাধারী ফণা তুলে আমাদের রসালাপও শুনতে এসেছিলেন।  সময় মত আমরা সরে গিয়েছিলাম।  তাছাড়া এখানে ওখানে, ফুটো মসজিদের ফাটল থেকে তেনারাও আমাদের কুল কুড়োনোর সাক্ষী হয়েছিলেন।  চোখাচোখি হয়েছিল কিন্তু তেড়ে আসেন নি।
আমার ভুতের অভিজ্ঞতা বলুন বা যাই বলুন, সবই কিন্তু জিয়াগঞ্জের ভট্টপাড়ায়। জিয়াগঞ্জও কিন্তু অনেক পুরনো কালের শহর। বিরাট বিরাট বাড়ি।  সন্ধ্যের পর সে শহরও বড় ছায়াময়।
এবার শুনুন তবে গপ্প নয় হলফ করা সত্যি।
আমার পুরো শৈশবকালটা কেটেছে মুরশিদাবাদের জিয়াগঞ্জে। আমার প্রথম পাঠশালায় ভর্তি, ওখানেই, ভুজঙ্গ মাষ্টার মশায়ের পাঠশালায়। আমরা তখন ভাড়া থাকতাম, জিয়াগঞ্জের স্টীমারঘাটে হরিশবাবুর বাড়ীতে।পাড়ার লোকেরা তাকে ডাকত হরিশবুড়ো বলে। আমাদের কাছে অবশ্য তিনি ছিলেন হরিশ দাদু। আমার তখন পাঁচ, দাদুর বয়স ৭৫এর কমতো নয়ই। তো হরিশদাদু আর দিদিমা ছিলেন নিঃসন্তান। তাই আমার উপর তার স্নেহ ঝরে পরত অঝরধারে। বাড়ীর বাইরের ঘরে দাদু একটা ছোট মুদিখানার দোকান দিয়েছিলেন। তাতে অনেক লাল নীল লবেঞ্ছুসও থাকত। তার বেশ কিছু যে আমার পাওনা ছিল, সে কথা আর আলাদা করে বলার নয়। যাহোক, বাবা কিছুদিন পরে আমাকে পাঠশালায় ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু আমি কেঁদেকেটে একশা, কে আমাকে নিয়ে যাবে সেই পাঠশালায়। শেষে হরিশদাদু আমাকে দিয়ে এলেন, সঙ্গে দিলেন লবেঞ্ছুস পকেট ভর্তি করে। কিন্তু তাও আমার কান্না থামে না। বাড়ীর কাছেই পাঠশালা, দাদু মাঝে মধ্যেই আমাকে দেখে যেতেন। আর বাড়ীতে গিয়ে বাবাকে বলতেন, রায়মশাই, নীলমনির কান্না এখন থেমেছে। এইরকম ছিল আমাদের সময়। কে আপন আর কে পর সে বোধই জন্মায়নি। সবাইকে নিজের লোক মনে হত। কেউ যেন পর নয়।পাড়াপ্রতিবেশী,তারা যত উঁচু মর্যাদার লোক হন না কেন, তারা সবাই খুব কাছের মানুষ ছিলেন।
আমার পাঠশালার পাঠও একদিন চুকল, আমি ভর্তি হলাম উঁচু ক্লাসে।এবার হল আমার পাড়াবদল। আমরা এবার এলাম জিয়াগঞ্জের আর এক প্রান্তে একটা বড় বাড়ীতে । পাড়ার নাম ভট্টপাড়া।ভট্টপাড়া বেশ পুরনো।অনেক বড়বড় বাড়ী। শ্রীপতসিইং দের বিশাল বিশাল প্রাসাদ, রাস্তার দুধারে।মফস্বল শহরে রাস্তার দুধারে তখন এত আলোর বাহার ছিলনা। অনেক দূরে দূরে একটা করে লাইট পোষ্ট থাকত আর তার অনেক ওপরে একটা টিমেটিমে বাল্ব জ্বলত।তার মধ্যে চারিদিকে বড় বড় প্রাসাদের ছায়ায় একটা আলোআন্ধকার গা ছমছমে পরিবেশের সৃষ্টি করত।ভুতদের জন্য আদর্শ পরিবেশ। তো আমাদের নতুন বাড়ীতেও ভুত ছিল। কিন্ত ভারী ভব্যসভ্য এক বিধবা মহিলা।আমরা দিদি,ভাইরা যে ঘরে শুতাম, সেই ঘরেই তিনি থাকতেন। আমাদের বিরক্ত করতেন না মোটেই। শুধু রাত্রে হঠাৎ , ঘুম ভেঙ্গে গেলে, তার বিলাপের শব্দ শোনা যেত। হয়ত তার পার্থিব জীবন তেমন সুখের ছিলনা, হয়ত কোন বঞ্ছনা ছিল, আশাভঙ্গ ছিল, যার রেশ তার মৃত্যুপরবর্তী জীবনেও থেকে গিয়েছিল। তার সঙ্গে আমাদের প্রত্যক্ষ ভাবসাব না হলেও, অসদ্ভাব কোনদিন হয়নি।দিনের বেলাও তার দেখা পেয়েছি। আমরা ঘরে ঢুকলে , তিনি চট করে বেরিয়ে যেতেন।তার চলে যাবার সঙ্কেত আমরা বেশ বুঝতে পারতাম। একঝলক সাদা শাড়ীর ঝলক আমরা বহুদিন দেখেছি। অবশেষে একদিন জিয়াগঞ্জ থাকার মেয়াদ শেষ হল। বাবা বদলী হলেন অন্যত্র। শুধু মনে আছে, আমরা যেদিন মালপত্র নিয়ে গাড়ীতে উঠে চলে যাচ্ছি, সেদিন তাকে দেখেছিলাম আর একবার। এক সাদাশাড়ী অশরীরী দাঁড়িয়ে ছিলেন বাড়ীর গেটে। হয়ত, আমাদের বিদায় জানাবার জন্য দাঁড়িয়ে ছিলেন।দেখুন এ কথা লিখতে গিয়ে আমার চোখ জলে ভরে গেছে। তাকে যে আমরা ভালবেসে ফেলেছিলাম। আজ এই চোখের জলে মনে হল, সে ভালবাসা তো আজও মরেনি। হয়ত ভালবাসা মরেওনা কোনদিন।

Saturday, 29 June 2019

যোধপুর টু জয়সলমীর

তখন সত্যজিৎ রায়ের সোনার কেল্লা সবে দেখেছি। একে জাতিস্মর মুকুল সঙ্গে ফেলুদা, গ্লোব ট্রটার কামু মুখার্জি, লালমোহন বাবু, সর্বোপরি সোনার কেল্লা। সে এক জমজমাট ব্যাপার।  কামু মুখার্জি আমার খুব চেনা। দাপুটে অভিনেতা তো বটেই। তবে বাস্তবেও তিনি খুব দাপুটে ছিলেন। প্রায়দিনই সন্ধ্যাবেলায় তার সঙ্গে দেখা হত।  থাকতেন  ফুলবাগানের মোড়ে। তবে টলমলে অবস্থায়।  বাংলায় পুরো নিবেদিত। তখন যে সব সংলাপে গমগম  করতেন, তা লেখায় অসুবিধে আছে।  আর লালমোহন বাবু মানে সন্তোষ দত্ত থাকতেন  মানিকতলায়।  ছায়া সিনেমার পাশের গলিতেই তার বাড়ী। অনেকবারই তার সঙ্গে দেখা হয়েছে৷ দুএকবার তার সঙ্গে যেচে গিয়ে কথাও বলেছি। ভারী বিনয়ী ভদ্রলোক ছিলেন। বাকী রইল তপসে। তপসে কিন্তু শেয়ার বিশেষজ্ঞ। শেয়ারের উপর অনেক বইও আছে।  তো, তার কাছে ক্লাসও করেছি কিছুদিন।  ওই শেয়ার নিয়েও। যদিও সুবিধে করতে পারিনি মোটেই। তবে এসবই  নেহাৎই পরের কথা।   আর আমার এই যাত্রা অনেক আগের,  প্রায় বছর ত্রিশেক কি তারও আগে। শুধু জয়সলমীর অবশ্য নয়। পুরো রাজস্থানই। রাজস্থান ঢুকতে বরাবরই আমার প্রিয় রুট, আগ্রা হয়ে ভরতপুর ছুঁয়ে জয়পুর দিয়ে ঢোকা। এর উল্টোটাও অবশ্য হয়। তবে আগ্রার তাজমহল আর ফতেপুর সিক্রি ছুঁয়ে না ঢুকলে রাজস্থান দেখার রোমান্সের ভিতই তৈরি হয় না। রাজস্থান রাজারাজড়ার জায়গা। তাই সেখানে রাজার মতই যেতে হয়। না হলে আর রাজার মত সম্মান পাবেন কি করে? তো আমিও প্রথমবারে গিয়েছিলাম ওই প্রায় রাজার মতই। রাজত্ব ছিলনা ঠিকই  কিন্তু সঙ্গে সেঁটে ছিল দুই শালী।  রাজা শালীবাহন, ছিলেন না একজন?


রাজস্থান  লম্বা ট্যুর। অনেক ঘোরা,অনেক খাওয়া আর অনেক গপ্প। কাজ কি ওতসবে।তার চেয়ে চলুন একেবারে জাম্পকাট করে চলে যায়, যোধপুর। যোধপুরের কথা মনে পরে নিশ্চয়ই।  এখানেই সার্কিট হাউসেই ফেলুদা ছিলেন না? আমরা অবশ্য উঠেছিলুম একটা হোটেলে।  কোন সে হোটেল,  সে নাম আর মনে নেই। তবে যোধপুর ষ্টেশনের কাছে একটা হোটেলে খাবার কথা মনে আছে। পুরো শাকাহারী। গরমাগরম রুটির উপর দরাজ হাতে দেশী ঘিউ মাখিয়ে, সবজী, আচার, অড়হর ডাল আর শেষে লস্যির গ্লাসে চুমুক দিয়ে মনে হল, জীবনে আর চাওয়ার কিছুই নেই।
যোধপুরের ক্লোকরুমে মালপত্র রেখে উঠে বসলুম জয়সলমীর এক্সপ্রেসে। রিজার্ভেশন করাই ছিল প্রায় ঝাড়া হাত পা। ভোরে পৌঁছবে জয়সলমীর। অভিজ্ঞতার অভাব যে কি নিদারুণ তা বুঝলুম ট্রেন কিছু রাস্তা চলার পরেই। সব শীতবস্ত্র তো ক্লোকরুমে রেখে এসেছি। আর এদিকে ট্রেন  যত মরুভূমিতে ঢুকছে ততই শীত যেন জাপটে ধরছে। শোয়া থেকে উঠেবসা, দাঁড়ানো, শেষে কামরার এ মাথা ও মাথা পায়চারি করতে করতেই ভোরভোর  পৌঁছে গেলুম জয়সলমীর।  ট্রেন থেকেই নেমেই,  সামনেই সেই সোনার কেল্লা। সেইসব দিনে বাঙালির মনে ফেলুদা, সোনার কেল্লা,লালমোহন বাবুকে নিয়ে যে রোমান্টিসিজম ছিল, তা আজকে আর বলে বোঝানো যাবে না। তবে আমরা জমে গেলাম দস্তুরমতন। শীতে আর রোমান্সেও।

 উটের দুধের ঘন চা সেও পেয়ে গেলাম স্টেশন চত্তরেই। তখন জয়সলমীরে এত হোটেল ছিলনা। ট্যুরিস্ট লজে জায়গাও হয়ে গেল। তখন হলিউডের এক সিনেমার শুটিং চলছিল।  তাদের লোকেই গোটা লজ ভর্তি। তো হল জয়সলমীর দর্শন ইত্যাদি।  সে সব সাতসতেরোতে যাচ্ছিনা। আসল চমক বা চমৎকার ফেরার পথেই। ট্রেনেই ফিরছি যোধপুর।  এবার অবশ্য দিনে দিনেই।  পোখরানের নাম তো সবার জানা। তখন অবশ্য এ নাম খুব পরিচিত ছিলনা। ছোট্ট স্টেশন।  স্টেশনের বাইরেও যে খুব জমজমাট, তা নয়। তবে আমাদের ট্রেনের স্টপেজ ছিল এক ঘন্টা।  একটু হেটে বাইরে আসতেই চোখে পরল ছোট্ট একটা মিষ্টির দোকান।  চমচম বানাচ্ছে একজন। সাদা গুরো ক্ষীরের আস্তরণ মাখা। এক একটা প্রায় কোলবালিশের মতই। আর স্বাদ। ব্যাস পুছিয়ে মত। পোখরানের  আনবিক বোমা বিস্ফোরণের বহু আগেই পোখরানের চমচমের স্বাদের বিস্ফোরণ, সে শুধু আমিই জানি, আর আজও সে স্বাদের অনুরনন আমার অনুভবের পরতে পরতে।  এ তো প্রায় ৩০/৩৫ বছর আগের ঘটনা। এই বছর কয়েক আগেই আবার জয়সলমীর গিয়েছিলুম। ফেরার পথে পোখরানেও থেমেছি। শুধু  চমচমেরই জন্যেই। কিন্তু সেই স্বাদ আর ফিরে আসেনি। ৩০/৩৫ বছর আগে জীবনের যে স্বাদ ছিল তা আর ফিরবেই বা কি করে?

Tuesday, 25 June 2019

নিপাতনে সিদ্ধ

সেদিন হঠাৎই এক বন্ধুর কাছে শুনলাম ' নিপাতনে সিদ্ধ' কথাটি। কথাটা শোনা শোনা লাগল। যদ্দুর মনে পরে, ছোটবেলায় ব্যাকরনের কেলাসে শোনা। তবে আমার আবার ব্যকরণে কোন উৎসাহই ছিলনা কোনদিন।  তাই বাংলা ব্যাকরণের পুরো পিরিয়ডই হাই তুলে আর জানলার বাইরে দিয়ে চলমান জীবন দেখতেই বেশী ভাল লাগত। তাতে আমার ক্ষতি কি কিছুই হয়নি? হয়ত তবে তার রেশ তো রয়ে গেছে। আজও নিয়ম মানার থেকে নিয়ম ভাঙ্গাতেই আমার  উৎসাহটাই বেশী,জীবনের এই ভর সনঝে বেলাতেও। মাঝে মধ্যে দেখি এই ফেসবুকের পাতাতেই লাইক মাইন্ডেড বন্ধুত্তের সগর্ব ঘোষণা।  এরকম সত্যিই কি হয়? কি জানি?  অনেক কিছুই তো জানিনা। যেমন জানিনা নিপতনে সিদ্ধর ব্যাপারটাও।  আমাদের অবশ্য একটা বন্ধুদের গ্রুপ আছে, তবে সেটা একেবারেই লাইক মাইন্ডেড নয়। পুরোপুরি হেট্রোজেনাস বডি। আমাদের সব কিছুই আনলাইক। তাই মাঝে মাঝেই তুলকালাম বেধে যায়। তিল কে তাল বানিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা গদাযুদ্ধ চলে। অবশ্য আমনে সামনে নয়্। ওই হোয়াইটস আপের পাতায়। তাতে অবশ্য কোন দুর্যোধনের উরুভঙ্গ হয় না। ঘন্টাদুয়েক এই যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা চলে, ধুলো ঝেড়ে উঠে পরে হাত মিলিয়ে নি। আসলে আমরা কেউই উঠতেই চাই না, ডুবতেও চাই না। পুরোটাই উইন উইন সিচুয়েশন। জিতলেও সবাই মিলে তার সাতরং নিয়েই। আমার তো মনে হয় এটা একটা নিপাতনে সিদ্ধর মতই মহৎ কিছু।

সে সব যাকগে। আসলে জানতে হবে, নিপাতনে সিদ্ধ ব্যাপারটা কি। একটু খোঁজখবর তাহলে নি? অবশ্য মেঘের আড়ালে ইন্দ্রজিৎ বসে আছে৷ আমার এই প্রলাপ ওর চোখে পড়লেই, ঝাঁকঝাঁক তীর নিক্ষেপ করবে। আমার নিপাতনে সিদ্ধি হবে না মোটেই। তাই যা বলবার তা ঝটপট আর চুপিচুপি বলে নেওয়াই শ্রেয়। তবে আমার গুগল জ্ঞান কি বলে শুনুন, স্বরবর্নের অসম সন্ধি মাত্রই নিপাতনে সিদ্ধ। সেটা ব্যঞ্জনবর্ণও হতে পারে। কিন্তু স্বর আর ব্যঞ্জনের সন্ধি কি হয়? সেটা আমার জানা নেই। আপনারা কেউ জেনে থাকলে এট্টু জানিয়ে দেবেন৷ এটা নাকি মতের অমতে বিয়ের মত।  ভাবা যায় কি সাংঘাতিক কান্ড। এখানে কেউ আছেন, যার মতের অমতে বিয়ে। বা বিয়ের কিছুদিন পরেই প্যান্ডোরার বক্স খুলে ভয়াবহ সত্য উপলব্ধি।  কেই কি আছেন? সাড়া নেই।  মনে হচ্ছে সবাই ছোড়দি ভাইয়ের প্রেসক্রিপশন মেনে ৯৯.৯৯৯৯৯ শতাংশই সৎ চরিত্রের মানুষজন। হাজার প্ররোচনাতেই মুখ খুলবেন না। তবে আপনার কিন্তু সিদ্ধ হবার বেশ সুযোগ ছিল। সে নিপাতনে হলেও। সিদ্ধিলাভ তো মনুষ্য জীবনের চরম প্রাপ্তি। তবে আবার কিছু কিছু জিনিস যা সিদ্ধ হলেও নরম হয়না। কথামৃতে পড়েছিলুম, বিদ্যাসাগর মহাশয় আর রামকৃষ্ণদেবের কথোপকথনে যে কলাই ডাল বেটে সেদ্ধ করলে নাকি নরম না হয়ে শক্ত হয়েই থাকে। তো না হয় শক্ত হয়েই সেদ্ধ হন, ইচ্ছাময়ীর নির্দেশ মেনেই চলুন। আমার কিছুই করার নেই। It's your choice Beta.😁

Saturday, 22 June 2019

ছোট ছোট সুখ

আমি যে খুব খেতে ভালবাসি, এমনটি কিন্তু নয়। একসময় বিরিয়ানি খুব খুব ভালবাসতাম। সারা ভারত ঘুরেই বিরিয়ানি খেয়েছি এমনকি বিদেশেও।  কিন্তু কলকাতার বিরিয়ানি?  ভুভারতে তার জুড়ি নেই। কলকাতায়ও কম দোকানে যাইনি বিরিয়ানির জন্য। সে রয়াল হোক চাই আরসালান কি আলিবাবা কেউ মুখে লাগবে না যদি আপনি খেয়ে থাকেন সিরাজের বিরিয়ানি।  পার্কস্ট্রিটের মোড় আসার আগে থেকেই গন্ধে গন্ধে পাগল করে দেবে, শেষে মোড়ের মুখে এসে নতজানু হয়ে সম্পুর্ণ আত্মসমর্পণ করতেই হবে আপনাকে। মুখে দেবেন এর গন্ধ স্পর্শ স্বাদ আপনার চেতনার স্তরে স্তরে সারেঙ্গীর ছড় বোলাবে। সুরের সাত সংগমে আপনি মোহিত শুধু নয় হবেন বাক্য রহিত। এমনই লা জবাব এই বিরিয়ানি। তবে আজকের এই ছোট সুখের আসরে বিরিয়ানির জায়গা নেই। এ নিতান্তই সাদামাটা সহজ সরল সুখ। কিন্তু এর ব্যাপ্তি অনেকটা জায়গা আর অনেকটাই সময় নিয়ে। এও কিন্তু খাবারেরই কথা। তবে এ খাবার ফরমায়েসীও নয় নিতান্তই আমজনতার নিত্যদিনের খাবার। তবে স্থান সময় বিশেষে তাও হয়ে ওঠে অনন্য।

একসময় আমার কাশ্মীরে ছিল নিত্য  আসাযাওয়া। যেখানেই গেছি ফেরার পথে ঠিক কাশ্মীর ছুয়ে এসেছি, এমনই আমার কাশ্মীর প্রীতি। এ গল্পেও কাশ্মীর আছে কিন্তু নেইও আবার।

আজ থেকে বছর ২৫ হবে দিল্লি এয়ারপোর্টে নেমে আমাদের ট্রাভেল এজেন্টের পাঠানো গাড়ীতে চেপে বসলাম। গন্তব্য কুলু,মানালী, ধরমশালা, চাম্বা ইত্যাদি ইত্যাদি। সঙ্গে সঙ্গীসাথী অনেক মানে আমারই জ্ঞাতিগুষ্টি সব। পরিবার, পরিজন।  মথুরা রোড ধরে যাত্রা হল শুরু মানালীর উদ্দেশ্যে।  আমাদের রথের সারথি ছিল এক ছোকরা। সনু তার নাম৷ ভারী চৌখস, দিল্লিরই ছেলে। সদ্য বিয়ে করেছে৷ নতুন বৌকে ফেলে সেও আমাদের দ্বীপান্তরের সঙ্গী। অবশ্য ওটাই ওর কাজ, আমি দুঃখ পেলেও ওর কোন ভাবান্তর ছিল না। সারা রাত  সুমোর পিঠে চরে চলল আমাদের যাত্রা। আর ক্যাসেটে অনর্গল বাজিয়ে চলল, শোভা মুদগল। ডাকিয়া ডাক লায়া, আলি মেরে সাজনা আর কত কি সব। শোভা মুদগলের এই গান হয়ে গেল আমাদের গোটা ট্যুরের থিম সঙ। পাহাড়ি ব্যাকগ্রাউন্ডে শোভা মুদগলের হাস্কি গলার ফোক সঙ গোটা ট্যুরকেই করে তুলল অতুলনীয়। গোটা রাত ঢুলতে ঢুলতে ভোর ভোর এসে পড়লাম এক ছোট্ট পাহাড়ি চটিতে। একদিকে পাহাড় আর অন্যদিকে খাদ,  আর সেই খাদ ঘেঁসেই একটা ছোট্ট ধাবা। এক অতুলনীয় নিসর্গের পাশে সামান্য একচিলতে একটা ধাবা। কি স্পর্ধা। হজম করতে কষ্ট হলেও ওখানেই ব্রেকফাস্ট।  বাঁধা মেনু। তাই বলা হল। এল আলুপরোটা, তেলে বা ঘিয়ে ভাজা নয়, বেক করেই প্লেটে দিয়ে দিল আর ওপরে এক কিউব মাখন। গরম পরোটার উপর মাখন গলে গলে  ছড়িয়ে পরছে আর ছড়িয়ে পরছে তার মূর্ছনা  সঙ্গে পাঁচমিশেলি সব্জি, গাজর, টমেটো,  বীট, গাজর দিয়ে আর ওপরে শুধু ধনেপাতা ছড়ানো  । না আছে মশলা না অন্য কিছু।  কিন্তু এই দুটো মিলে মিশে যে স্বাদের বিস্ফোরণ  তৈরি করল, তার তুল্য স্বাদ আজ পর্যন্ত আর কিছুতেই পাই নি। ২৫ বছর আগের পাহাড়ি চটিতে ঘুম চোখে বসে সেই যে ছোট্ট সুখের সাথে আমার  আলাপ, তার তুল্য সুখ আর কেউ দিতে পারেনি আমায়, না পাঁচতারায় না সাততারাতেও।

এ কিন্তু গল্পের শুর। পুরো ২১ দিনের ট্যুর।  ট্যুরের গল্প আজকের জন্য নয়। কিন্তু এরপরে যদি চামুন্ডার ঘী চপচপে হালুয়া প্রসাদ নিয়ে বসি আপনাদের ধৈর্যের বড় পরীক্ষা হয়ে যাবে।ফেসবুকের পাঠকের এত অত্যাচার সহ্য করার অভ্যেস তো নেই। তবে একটা কথা জেনে নিন, হিমাচলেই কিন্তু শেষ হয়নি, ফেরার পথে ঠিক শ্রীনগরের দিকে বাঁক নিয়েছি। আর সে পথেও আমার ছোট ছোট সুখের লিষ্টিতে ঢুকে পরেছে, পাঠানকোটের বাটার চিকেন আর জুই ফুলের মত একথালা ভাত। মাঝপথে যদি বানিহালের গুস্তাবা আর গরম গরম রোটির কথা না বলি, তবে তা হবে ভয়ানক অন্যায়। 
আজ সকালে লেক থেকে ফেরার পথে, যোগোদ্যান রামকৃষ্ণ মঠে ঢুঁ মেরে গেলাম। আমার অবশ্য দেব দ্বিজ, গুরু এদের উপর ভক্তিশ্রদ্ধা একেবারেই নেই। তবে রামকৃষ্ণকে মোটের উপর আমার খারাপ লাগে না। দোষগুণ, খ্যাপামি, তার অসুস্থতা সব মিলিয়ে অন্য গুরুদের তুলনায় উনি সহনীয়।

রামকৃষ্ণের কথাকার,শ্রীমর এক নাতি আমার খুবই ঘনিষ্ঠ ছিলেন। এদের মধ্যে রামচন্দ্র গুপ্ত, কর্মক্ষেত্রে আমার সহকর্মী ছিলেন। এত ভাল লোক আমি কমই দেখেছি। কিন্তু শেষজীবনে বড্ড কষ্ট পেয়েছেন। একমাত্র ছেলে আত্মহত্যা করেন। অন্য আরেকজন দীপক গু্প্ত,শ্রীমর প্রপৌত্র এবং আমার সহকর্মীর ভ্রাতুষ্পুত্র । ইনি বিদ্যাসাগর কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ছিলেন। অকৃতদার।  কেন জানিনা উনি আমাকে অসম্ভব স্নেহ করেন,ভালবাসেন। যখনই  কথামৃত ভবনে তার কাছে গিয়েছি, দেশী, বিদেশী ভক্তদের মধ্যে তার অখন্ড মনোযোগ পেয়েছি।  স্টেট ব্যাংকের ম্যানেজার থাকাকালীন উনি প্রায়ই আমার ঘরে এসে দীর্ঘক্ষণ আমার সঙ্গে গল্প করতেন। উনি অবসরের পর কথামৃত পড়ে বেরাতেন বিভিন্ন রামকৃষ্ণ মঠে। আমি তাকে রামকৃষ্ণের অনেক কিছুই যে আমার পছন্দ নয় তা বলতাম। সে সব শুনে তার জবাব, ওইটকু বাদ দিয়েই পড়ুন। আমি তার সাথে কয়েকবার কথামৃত পাঠে গিয়েছি। ঝামাপুকুর রাজবাড়ীতেও থেকেছি তার সাথে। বৃন্দা কারাত কিন্তু এই ঝামাপুকুর রাজবাড়ীর মেয়ে।

বহুদিন দীপকবাবুর খবর নিইনি। আজ বিষ্টু ঘোষের আখড়া থেকে ফেরার পথে, তার খোঁজ নিতে কথামৃত ভবনে যাব। ওখানেই থাকেন তিনি। হাই সুগারের পেশেন্ট। কি জানি কেমন আছেন? আজ আর যোগোদ্যান নিয়ে লেখা হলনা। তবে রামকৃষ্ণ ভক্তদের জন্য ছবি দিলাম কটা।  আজ সকালে তোলা। যোগোদ্যান রামকৃষ্ণ ভক্তদের কাছে খুবই গুরুত্বপুর্ণ তীর্থস্থান। রামকৃষ্ণ অনেকবার এখানে এসেছেন। এখানে তার চিতাভস্ম রক্ষিত আছে। সে ইতিহাস পরে বলব একদিন।

শেষে একটা কথা দিয়ে শেষ করি। রামকৃষ্ণ বারবার বলতেন আমি জিলিপি খাব, বাহ্যে যাব। জিলিপি তার খুব প্রিয় ছিল।  আমারও খুব পছন্দের এবং জিলিপির সাথে বাহ্যের একটা নিবিড় যোগাযোগ আছে। কোষ্টকাঠিন্যের রোগীরা খেয়ে দেখতে পারেন। যোগোদ্যানের কিছু ছবি দিলাম।

Wednesday, 12 June 2019

একদিন একটা আম খেলেই যে আমার সুগার লেভেল, চড়চড়িয়ে উঠবে এমন অবুঝ তিনি মোটেই নন। তাহলে আর ৩৬৫ দিন মর্নিং ওয়াক আর বিষ্টু ঘোষের আখড়ায় যোগাসনের একনিষ্ঠ সাধনা করে কোন ইষ্টলাভ হল। এর সাথে নিয়মনিষ্ঠ জীবন, পরিমিত আহার, চিকিৎসকের নিয়মিত পরামর্শে আমি যথেষ্ট পরিমানে ইমিউনড। সামান্য এক  চিলতে আমের কি এমন শক্তি যে আমাকে কক্ষচ্যুত করে। এখন আসল কথা এই যে কাল একটা নিটোল ও পরিপুষ্ট হিমসাগর আম আমার রসনার যথেষ্ট সন্তোষ বিধান করেছেন। এর জন্য আমি মোটেই লজ্জিত বা অনুতপ্ত নই। তাকে আমি গ্রহণ করেছি যথাযথ যৌতুকের মাধ্যমে। অর্থাৎ আমি সমপরিমাণ ক্যালরি যুক্ত খাবার বর্জন করেছি। এবং এটা এক্কেবারে প্রতিক্রিয়া হীন। এর সাক্ষী আমার গ্লুকোমিটার। আমার আজকের সুগারলেভেল সম্পুর্ন নিরাপদ। নিজেকেই নিজের অভিনন্দন দিতে হচ্ছে। তবে আজকের এই স্থলন আজকের জন্যই।  রোজকার নয়। রোজ রোজ নেপোয় মারবে দই। তা কি ঘটে। তাহলে,সংযম কথাটাই অভিধান থেকে উঠে যেত।
শাহাজাহান কে তো সবাই চেনেন। সারা জাহানের মালিক।  তার শান সৌকত আন,বান,তান সব ছিল লা জবাব। কে না তাকে চেনে? বৈভব আর বিলাসিতার চুড়ান্ত।  তাজমহল, কোহিনূর হীরে, ময়ুর সিংহাসন অফুরন্ত ধনদৌলত আর, নুরজাহান ।  অজস্র হুরী পরীর রুপের ছটায় বেহস্ত নেমে এসেছিল দিল্লি দরবারে। 

আজ কিন্তু অন্য শাজাহানের কথা। সে কেষ্টবিষ্টু কেউ নয়। নিতান্তই এক ছুতোর মিস্ত্রি।  তাও যে খুব কম্মের তাও নয়। একদম রোজগার নেই। গরীব গুবরো ভারী  এক অভাজন। গত দুই ইদেই বাড়ী যেতে পারেনি স্রেফ পয়সা নেই বলেই। আমি বলি, কে তোর নাম দিয়েছিল শাজাহান, তুই তো তার কমিক চরিত্রও হসনি। এর চে বরং নাম পালটে নে দুঃখীরাম বা অন্যকিছু, তাতে যদি তোর ভাগ্য পালটায়। তো তাতেও মেলা ঝামেলা। একে রামনাম তাই নেই সম্রাটের হাতে ফুটোকড়িও। আমি অবশ্য মাঝেমধ্যে  দিই কিছু, কিন্তু তাতে কি গরীবের ক্ষিধে মেটে। মেটে না। আজকের শাহজাহান  তাই দুঃখীরামই থেকে যায়।